দেশে ৪১% পরিশোধিত পানিতে ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া

বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদন

নিজস্ব প্রতিবেদক: বাংলাদেশে বিভিন্ন উপায়ে সরবরাহ করা খাবার পানির ৪১ শতাংশই মানব স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া বহন করছে। আর পাইপলাইনের মাধ্যমে সরবরাহ করা পানির ৮০ শতাংশেই রয়েছে ক্ষতিকর জীবাণু এবং ১৩ শতাংশ পানিতে রয়েছে আর্সেনিকের উপস্থিতি। একাধিক পরিবার একই টয়লেট ব্যবহার করছেÑএমন মানুষের সংখ্যা পাঁচ কোটি আট লাখের বেশি। পানি ও স্যানিটেশনে দুর্বলতার কারণে অপুষ্টি ও পেটের পীড়ার মতো স্বাস্থ্যগত বিভিন্ন রোগ ও উপসর্গের প্রকোপ বাড়ছে। ফলে নষ্ট হচ্ছে অর্থনৈতিক সম্ভাবনা। দরিদ্র ও শিশুরা এর শিকার হচ্ছে তুলনামূলক বেশি। বিশ্বব্যাংকের এক প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।
রাজধানীর একটি হোটেলে গতকাল ‘আশাব্যঞ্জক উন্নতি: বাংলাদেশের পানি সরবরাহ, পয়োনিষ্কাশন, স্বাস্থ্য ও দারিদ্র্যের বিশ্লেষণ’ শীর্ষক প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী মুহাম্মদ নজরুল ইসলাম। বক্তব্য রাখেন বিশ্বব্যাংকের ভারপ্রাপ্ত কান্ট্রি ডিরেক্টর সিরিন জোমা ও পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব রোকসানা কাদের।
প্রতিবেদনটিতে বলা হয়, বাংলাদেশে উš§ুক্ত স্থানে মলত্যাগের পরিমাণ উল্লেখযোগ্য হারে কমে এসেছে। তবে এখনও পাঁচ কোটির বেশি মানুষ অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে টয়লেট ব্যবহার করায় স্বাস্থ্যঝুঁকি রয়েই গেছে। মাত্র ২৮ শতাংশ টয়লেটে সাবান ও পর্যাপ্ত পানির ব্যবস্থা রয়েছে। আর শহুরে মানুষদের মাত্র সাত শতাংশ পাইপলাইনের মাধ্যমে পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থায় যুক্ত আছে। শহর এলাকার বস্তিতে স্বাস্থ্যসম্মত পানি ও পয়োনিষ্কাশন পয়ো ব্যবস্থায় চরম সংকট রয়েছে। বড় শহরগুলোর বস্তিতে উন্নত স্যানিটেশনের সুযোগ পাঁচগুণ কম। সারা দেশের তুলনায় পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুর অপুষ্টির হারও বস্তিতে অনেক বেশি।
প্রতিমন্ত্রী মুহাম্মদ নজরুল ইসলাম বলেন, শহর এলাকায় পানি সরবরাহ ব্যবস্থার উন্নয়নে সরকার বেশ কিছু উদ্যোগ বাস্তবায়ন করছে। পানি ও পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থা আরও উন্নত করার পরিকল্পনা সরকারের রয়েছে। তিনি জানান, পানি ব্যবস্থার উন্নয়নে সরকার বদ্বীপ পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। আগামী ১০০ বছরে পানি ব্যবস্থাপনায় করণীয় এ পরিকল্পনায় রয়েছে। নিরাপদ পানি সরবরাহে আরও উন্নতি হবে বলে তিনি আশা করেন।
সেরিন জোমা বলেন, পানি ও সেনিটেশন ব্যবস্থা কাক্সিক্ষত মানে উন্নীত না হওয়ায় অনেক সম্ভাবনা নষ্ট হচ্ছে। এর ক্ষতির শিকার বেশি শিশুরা। শিশু বয়সীদের অপুষ্টির শিকার হওয়ার প্রবণতার সঙ্গে পানি সরবরাহ ও পয়োনিষ্কাশনে দুর্বলতার সরাসরি সংযোগ রয়েছে। তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশে পাঁচ বছরের কম বয়সী এক-তৃতীয়াংশের বেশি শিশু বয়সের তুলনায় খর্বকায়। বিষয়টি শিশুদের শিক্ষা ধারণ করার ক্ষমতায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। এ অবস্থায় নিরাপদ পানি সরবরাহে গুরুত্ব দেওয়ার পরামর্শ দেন তিনি।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শিশুমৃত্যু ও অপুষ্টি ঠেকাতে পানি, স্বাস্থ্য ও পুষ্টি খাতে সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে। পানি ও স্যানিটেশনের আলাদা উদ্যোগে শিশুদের কল্যাণ বাড়বে। নাগরিকদের নিরাপদ ও কার্যকর পানি এবং স্যানিটেশন সেবা নিশ্চিত করতে সরকারগুলোকে অর্থায়নের বিষয়ে দ্রুত উদ্যোগ নেওয়ার সুপারিশ করা হয় প্রতিবেদনটিতে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশের মাত্র অর্ধেক প্রাথমিক বিদ্যালয়ে মেয়েদের জন্য আলাদা টয়লেটের ব্যবস্থা আছে। নারীদের মাত্র ২৫ শতাংশ হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যকেন্দ্রে রয়েছে আলাদা টয়লেট। এক-তৃতীয়াংশ স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নিয়মিত পানির অভাব থাকে বলেও দাবি করা হয়েছে প্রতিবেদনে।
প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, পানি ও পয়োনিষ্কাশন-সংক্রান্ত রোগে ধনী জনগোষ্ঠীর তুলনায় দরিদ্ররা তিনগুণ বেশি ভোগান্তির শিকার হচ্ছে। পানি, স্যানিটেশন ও স্বাস্থ্য (ওয়াশ) খাতে সরকারি বরাদ্দ কয়েক বছরে অর্ধেকের নিচে নেমে এসেছে। ২০২৫ সাল পর্যন্ত এ খাতে বাজেট বরাদ্দের ঘাটতি ৪৭ শতাংশে উন্নীত হবে বলে ধারণা দেওয়া হয়েছে প্রতিবেদনে।
অনুষ্ঠানের দ্বিতীয় পর্যায়ে স্বাস্থ্য প্যানেল আলোচনায় সভাপতিত্ব করেন স্বাস্থ্য অধিদফতরের লাইন ডিরেক্টর অধ্যাপক ডা. আবুল হাশেম। বক্তব্য রাখেন সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ও পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টারের (পিপিআরসি) নির্বাহী পরিচালক ড. হোসেন জিল্লুর রহমান, গণস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদফতরের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী একেএ ইবরাহিম, ইউনিসেফের ওয়াশ বিশেষজ্ঞ মনির আলম, ওয়াটার এইড বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর ড. খাইরুল ইসলাম প্রমুখ।
হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, শহর ও গ্রামের ব্যবধান অনেক কমে আসছে। বাংলাদেশের বড় একটা এলাকা এখন শহর। ব্যাপ্তি বৃদ্ধির সঙ্গে শহরে উন্নত পানি ও পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থা নিশ্চিত করা চ্যালেঞ্জে পরিণত হয়েছে। এ চ্যালেঞ্জ মোকবিলায় বড় ধরনের উদ্যোগ নিতে হবে বলেও তিনি মনে করেন।সংবাদ সম্মেলনে ত্রাণমন্ত্রী
২৫ হাজার রোহিঙ্গার জন্য প্রস্তুত ভাসানচর

নিজস্ব প্রতিবেদক

নিজ দেশে নির্যাতিত হয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া ২৫ হাজার রোহিঙ্গাকে নোয়াখালীর ভাসানচরে স্থানান্তরের মতো ব্যবস্থা হয়ে গেছে বলে জানিয়েছেন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া।
ঘূর্ণিঝড় তিতলি মোকাবিলার প্রস্তুতি তুলে ধরতে বৃহস্পতিবার সচিবালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এ তথ্য দেন।
এক লাখ রোহিঙ্গার জন্য ভাসানচরে অবকাঠামো নির্মাণসহ যে আশ্রয়ণ প্রকল্প সরকার বাস্তবায়ন করছে, ৪ অক্টোবর তার উদ্বোধন করার কথা ছিল প্রধানমন্ত্রীর। কিন্তু সময়স্বল্পতায় তিনি এখনও ভাসানচরে যাননি। এ নিয়ে প্রশ্ন করা হলে মন্ত্রী বলেন, প্রধানমন্ত্রী যেদিন সময় দেবেন, সেদিনই ভাসানচরের উদ্বোধন করা হবে। আমরা প্রস্তুত; সেখানে ২৫ হাজার রোহিঙ্গাকে নেওয়ার মতো সব ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
কয়েক দশক ধরে কক্সবাজারের শরণার্থী শিবির ও তার বাইরে অবস্থান নেওয়া চার লাখের বেশি রোহিঙ্গাকে নিয়ে সামাজিক নানা সমস্যা সৃষ্টির প্রেক্ষাপটে তাদের নোয়াখালীর দ্বীপ উপজেলা হাতিয়ার কাছে মেঘনা মোহনার দ্বীপ ভাসানচরে সরিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা করে সরকার। এর মধ্যে আগস্টের শেষে মিয়ানমারের রাখাইনে নতুন করে সেনা অভিযান শুরু হলে আবারও রোহিঙ্গার ঢল নামে। এ দফায় সাত লাখের বেশি রোহিঙ্গা সীমান্ত পেরিয়ে কক্সবাজারে আশ্রয় নেওয়ায় ভাসানচরকে দ্রুত বসবাসের উপযোগী করার উদ্যোগ নেয় সরকার।
এই প্রেক্ষাপটে গতবছরের শেষদিকে একনেকে দুই হাজার ৩১২ কোটি টাকার প্রকল্প পাস হয়। এর আওতায় মোটামুটি ১০ হাজার একর আয়তনের ওই চরে এক লাখের বেশি মানুষের বসবাসের জন্য ১২০টি গুচ্ছগ্রামে এক হাজার ৪৪০টি ব্যারাক হাউজ ও ১২০টি আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণের কাজ শুরু হয়। হাতিয়া থানাধীন চরঈশ্বর ইউনিয়নের ভাসানচরে এই আশ্রয়ণ প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে বাংলাদেশ নৌবাহিনী। পুরোপুরি সরকারি অর্থায়নের এ প্রকল্পের কাজ ২০১৯ সালের নভেম্বরের মধ্যে শেষ করার লক্ষ্য নির্ধারিত আছে।
সেখানে অল্প সময়ের মধ্যে রোহিঙ্গাদের জন্য অবকাঠামো নির্মাণ করে দেওয়ায় নৌবাহিনীকে ধন্যবাদ জানান ত্রাণমন্ত্রী। ভাসানচরে এক লাখ রোহিঙ্গাকে ‘অস্থায়ীভাবে’ রাখা হবে জানিয়ে তিনি বলেন, তারা মিয়ানমারের নাগরিক। ওই দেশের নাগরিক হিসেবে সম্মানের সঙ্গে দেশে ফিরে যাবেÑএটাই আমরা চাই।
তিনি বলেন, যখন রোহিঙ্গারা আসে, তখন ছিল হাড্ডিসার, কাপড় ছিল না, চেহারা ছিল না। বস্ত্র নেই, কিচ্ছু নেই। এখন ওদের অনেক ভালো অবস্থা।
ভাসানচরের পুরো প্রকল্পের ৮০ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে জানিয়ে এ প্রকল্পের কর্মকর্তারা বলছেন, রোহিঙ্গাদের জন্য থাকার ঘর করা হয়েছে, সাইক্লোন শেল্টার করা হয়েছে, পণ্যদ্রব্য রাখার গোডাউন রয়েছে, বাঁধ নির্মাণ ও সমুদ্র থেকে পণ্যদ্রব্য নামাতে জেটি করা হয়েছে।
জনমানবহীন এ চরটি আগে মূলত গরু-মহিষের চারণভূমি হিসেবে ব্যবহƒত হতো। ২০১৩ সালে এ চরকে সংরক্ষিত বনাঞ্চল এলাকা ঘোষণা করা হয়। ইঞ্জিনচালিত নৌযান ছাড়া সেখানে যাতায়াতের সুযোগ নেই। হাতিয়া থেকে যেতেও তিন থেকে সাড়ে তিন ঘণ্টা সময় লাগে।