‘দেশ ফাইন্যান্স’পাচ্ছে সংস্কৃতিমন্ত্রীর পরিবার

নিজস্ব প্রতিবেদক: দেশ ফাইন্যান্স লিমিটেড নামে নতুন একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান অনুমোদন দিতে তোড়জোড় শুরু হয়েছে। সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূরের ছেলে সুদীপ্ত আরিকুজ্জামান ও মেয়ে সুপ্রভা তাসনিম প্রতিষ্ঠানটির উদ্যোক্তা। প্রতিষ্ঠানটির অনুমোদন পেতে তারা বাংলাদেশ ব্যাংকে আবেদন করেছেন। বাংলাদেশ ব্যাংক বিষয়টি ইতিবাচকভাবে দেখছে বলে জানা গেছে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ সূত্রেও বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া গেছে।

সূত্র জানায়, নীতিগতভাবে ‘দেশ ফাইন্যান্স’-এর লাইসেন্স দেওয়ার ব্যাপারে সরকারের পক্ষ থেকে আপত্তি নেই। প্রক্রিয়া শেষে বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ এর অনুমোদন প্রদান করবে। দেশ ফাইন্যান্স লাইসেন্স পেলে দেশে আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ৩৫টিতে দাঁড়াবে।

এদিকে দেশ ফাইন্যান্স নামে আর্থিক প্রতিষ্ঠান আবেদনের বিষয়টি স্বীকার করেছেন সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর। দেশ টেলিভিশনের কর্তাব্যক্তিরা এ উদ্যোগের সঙ্গে জড়িত বলে জানিয়েছেন সংস্কৃতিমন্ত্রী। তিনি শেয়ার বিজকে জানান, ‘দেশ ফাইন্যান্সের সঙ্গে আমি ব্যক্তিগতভাবে জড়িত নই। আমার এখন ব্যবসা করার কোনো ই”ছা নেই।’

দেশে আর্থিক প্রতিষ্ঠানের পেশাদারিত্ব নিয়ে হতাশা প্রকাশ করে সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর আরও বলেন, ‘আমি একটা কথাই বলতে পারি, যতগুলো লিজিং কোম্পানি বাংলাদেশে আছে সবাই খুব পেশাদারি মনোভাব নিয়ে এগুলো পরিচালনা করে না। এটা আমার ধারণা। সবগুলো না, অনেকগুলো আছে যাদের খুবই উঁচুমানের পেশাদারিত্ব আছে। পেশাদারি মনোভাব নিয়ে আর্থিক প্রতিষ্ঠান চালাতে পারলে, যারা চালান তারাও যেমন লাভবান হন, এখান থেকে যারা সহায়তা নেন, তারাও লাভবান হন এবং এটি অর্থনীতিকেও বাড়িয়ে তোলে। পেশাদার, সৎ, দায়িত্বশীল ফাইন্যান্স কোম্পানি হিসেবে আত্মপ্রকাশ না করলে এগুলোর কোনো মানে নেই।’

জানা গেছে, গত তিন বছরে তিনটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের অনুমোদন দিয়েছে সরকার। ২০১৫ সালে ‘সিএপিএম ভেঞ্চার ক্যাপিটাল অ্যান্ড ফাইন্যান্স লিমিটেড’ ও ‘মেরিডিয়ান ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেড’ নামে দুটি প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স দেয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক। চলতি বছর অ্যালায়েন্স লিজিং অ্যান্ড ফিন্যান্স কোম্পানি নামে আরেকটি নতুন আর্থিক প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। আর্থিক প্রতিষ্ঠান আইন, ১৯৯৩-এর ৪(১) ধারায় প্রদত্ত ক্ষমতাবলে বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক এ লাইসেন্স দেওয়া হয়। বর্তমান সরকারের গত মেয়াদের শেষ সময়ে ৯টি ব্যাংক ও ১১টি বিমা কোম্পানির অনুমোদন দেওয়া হয়।

নতুন আরও একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স প্রসঙ্গে খাতসংশিষ্টরা বলেন, বিদ্যমান আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোই বর্তমানে খারাপ অবস্থায় আছে। বিনিয়োগ ‘বিরতায় বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠানই অস্তিত্ব রক্ষার সংগ্রামে আছে। এ অবস্থায় নতুন একটি প্রতিষ্ঠানের অনুমোদন দেওয়া হলে এ খাতের অ¯ি’রতা আরও বেড়ে যাবে।

জিএসপি ফাইন্যান্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মামুন মাহমুদ শাহ এ সম্পর্কে তার মতামত প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, ‘আমাদের অর্থনীতি তত বড় মাপের নয় যে, এখানে এত বেশি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজন রয়েছে। সুতরাং স্বাভাবিকভাবেই নতুন আর্থিক প্রতিষ্ঠান প্রতিযোগিতা বাড়াবে। বর্তমানে বিনিয়োগের পরিবেশ অনুকূলে নেই। প্রচুর তারল্য রয়ে গেছে। ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো বিনিয়োগের জন্য চেষ্টা করে যা্ছ। এ অবস্থায় আবার একটা নতুন প্রতিষ্ঠান ঢুকলে তাদের কঠিন প্রতিযোগিতা করতে হবে। অন্যদের জন্যও তা কঠিন পরি¯ি’তি বয়ে আনবে। ব্যক্তিগতভাবে আমি মনে করি না আর নতুন কোনো আর্থিক প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজন আছে।’

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রাপ্ত তথ্যে দেখা গেছে, দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৯৬ সালের আগ পর্যন্ত ২৫ বছরে দেশে বেসরকারি ব্যাংক ছিল ১৭টি। অন্যদিকে জেনারেল ও লাইফ মিলে ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি ছিল ৩২টি। গত ১৯৯৬-২০০০ সালের মধ্যে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার ১৩টি নতুন ব্যাংকের লাইসেন্স দেয়। আর ইন্স্যুরেন্সের লাইসেন্স দেওয়া হয় ২৮টির। ইন্স্যুরেন্সগুলোর মধ্যে জেনারেল ১৯টি ও লাইফ ৯টি। গত ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত চারদলীয় জোট সরকারের পাঁচ বছর এবং পরবর্তী তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দুই বছর মোট সাত বছরে কোনো নতুন ব্যাংকের লাইসেন্স দেওয়া হয়নি। গত আওয়ামী লীগ সরকারের শেষ সময়ে ২০১২ সালে ৯টি ব্যাংক ও ১১টি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স দেওয়া হয়। আর বর্তমান সরকারের চলতি মেয়াদে আরও একটি ব্যাংক ও তিনটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স দেওয়া হয়।

বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, বর্তমান দেশের অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটের বিবেচনায় ৫৭টি ব্যাংক, ৩৪টি আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও ৭৩টি বিমা কোম্পানিই অর্থনীতির জন্য বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর ওপর আরও একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স দেওয়ায় আর্থিক খাতের চাপ আরও বেড়ে যাবে বলে তিনি আশঙ্কা করেছেন।দেশের যে ৩৪টি আর্থিক প্রতিষ্ঠান রয়েছে তার বেশিরভাগই ভালোভাবে চলছে না। ফলে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোয় গত মার্চ শেষে খেলাপি ঋণ বেড়ে হয়েছে চার হাজার ৫০০ কোটি টাকা। গত ডিসেম্বরে প্রতিষ্ঠানগুলোয় খেলাপি ঋণ ছিল তিন হাজার ৯৩০ কোটি টাকা।

খেলাপির শীর্ষে থাকা আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো হলো বাংলাদেশ ইন্ডাস্ট্রিয়াল ফাইন্যান্স কোম্পানি ও ফার্স্ট ফাইন্যান্স লিমিটেড। অনিয়ম দুর্নীতির কারণে এসব প্রতিষ্ঠানে পর্যবেক্ষক বসিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এর মধ্যে তথ্য গোপন করে বাংলাদেশ ইন্ডাস্ট্রিয়াল ফাইন্যান্স কোম্পানি থেকে ৭০৯ কোটি টাকা ঋণ নেন মেজর (অব.) আবদুল মান্নান। ফার্স্ট ফাইন্যান্স লিমিটেড থেকেও প্রতিষ্ঠানটির পরিচালকরা অর্থ বের করে নেন।