দেড় বছর ধরে ব্যবসায় নেই মাবিয়া গ্রুপ

জাহাজ ভাঙা ও ইস্পাত উৎপাদন

সাইফুল আলম, চট্টগ্রাম: চট্টগ্রামের জাহাজ ভাঙা ও ইস্পাত খাতের আলোচিত গ্রুপ মাবিয়া। এ গ্রুপের প্রধান ব্যবসা ছিল জাহাজ আমদানি, জাহাজ ভাঙা ও ইস্পাত উৎপাদন। জাহাজ ভাঙা ও ইস্পাত শিল্পের সুসময় দেখিয়ে ব্যাংক ঋণ নেন উদ্যোক্তারা। গত দেড় বছরে ভাঙার জন্য তারা কোনো জাহাজ আমদানি করেননি। ফলে ইস্পাত উৎপাদন বন্ধ আছে। এ সময় কোম্পানিটির উদ্যোক্তারা আড়ালে চলে যান। এতে বাড়তে থাকে ব্যাংকের দেনা।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ড সূত্রে জানা যায়, মাবিয়া গ্রুপ গত ২০১৭-১৮ অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে ও ২০১৬-১৭ অর্থবছরে জাহাজ ভাঙার জন্য কোনো জাহাজ আমদানি করেনি। তবে ২০১৫-১৬ অর্থবছরের মাবিয়া গ্রুপের সহযোগী প্রতিষ্ঠান মাবিয়া শিপ ব্রেকার্স ৮৭ কোটি ৬৩ লাখ টাকায় একটি জাহাজ আমদানি করেছিল। পাশাপাশি জাহাজ ভাঙা ও ইস্পাত খাতের ব্যবসায়ীরা জানান, কয়েক বছর আগে ব্যবসা করলেও বর্তমানে তাদের কোনো ধরনের ব্যবসা চালু নেই। ব্যাংক ঋণের দায়ে নতুন করে ব্যবসা চালু করতে পারছেন না।

সংশ্লিষ্ট ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান সূত্রে জাহাঙ্গীর আলম, ফরিদুল আলম ও খোরশেদ আলমÑএ তিন সহোদর ২০০৮ সালে পর একে একে গড়ে তোলেন মেসার্স জিলানী ট্রেডার্স, মাহিম স্টিল রি-রোলিং মিল, মাবিয়া শিপ ব্রেকার্স, মাবিয়া শিপ ব্রেকার্স ইউনিট-২, এফএমএস ইস্পাত শিপ ব্রেকিং, আলী স্টিল এন্টারপ্রাইজ এবং মেসার্স খাজা আজমীর করপোরেশন। এগুলোর সমন্বয়ে গড়ে তোলা হয় মাবিয়া গ্রুপ। সময়ের সঙ্গে আস্তে আস্তে ব্যবসার পরিধি বাড়তে থাকে। কিন্তু তাদের অদূরদর্শী প্রকল্প গ্রহণ, প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা ও ব্যবসায়িক অনভিজ্ঞতার ইত্যাদি বিবেচনা না করে দি সিটি ব্যাংক, এবি ব্যাংক, মাকেন্টাইল ব্যাংক, স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, যমুনা ব্যাংকসহ আরও কয়েকটি ব্যাংকের পাওনা প্রায় চারশ কোটি টাকা।

গ্রুপটিতে সবচেয়ে বেশি অর্থায়ন করে সিটি ব্যাংক। বর্তমানে মাবিয়া গ্রুপের কাছে ব্যাংকটির পাওনা প্রায় ১৬১ কোটি টাকা। এর মধ্যে মাবিয়া স্টিলের কাছে ব্যাংকটির আগ্রাবাদ শাখার পাওনা ৮৫ কোটি ৯৮ লাখ ও মাবিয়া শিপ ব্রেকিংয়ের কাছে ৬৪ কোটি ৩৩ লাখ টাকা। এছাড়া ব্যাংকটির ভাটিয়ারি শাখার মাবিয়া স্টিলের কাছে ১১ কোটি ২৬ লাখ টাকা পাওনা রয়েছে। একইভাবে বড় অঙ্কের পাওনা রয়েছে বেসরকারি এবি ব্যাংকেরও। প্রতিষ্ঠানটির কাছে এখন ব্যাংকটির পাওনা দাঁড়িয়েছে ১১৭ কোটি ২১ লাখ টাকা। মাবিয়া শিপ ব্রেকিং ইউনিট-২’কে ব্যাংকটির সিডিএ এভিনিউ শাখা থেকে ওই ঋণ বিতরণ করা হয়। ঋণের টাকা ফেরত পেতে এবি ব্যাংকও প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে গত নভেম্বর অর্থঋণ আদালতে মামলা করে।

এর বাইরে মার্কেন্টাইল ব্যাংকের মাদামবিবিরহাট শাখা থেকেও এ গ্রুপের তিন সহযোগী প্রতিষ্ঠানের মেসার্স জিলানী ট্রেডার্স, মাহিম স্টীল রি-রোলিং মিল এবং মাবিয়া শিপ ব্রেকার্সের নামে ১০৩ কোটি ৪৮ লাখ ৪৫ হাজার ৯৯২ টাকা ঋণ সুবিধা গ্রহণ করা হয়। এ গ্রুপে রয়েছেন জাহাঙ্গীর আলম ও খোরশেদ আলম। আর খেলাপি ঋণের দায়ে এ ভাইয়ের বিরুদ্ধে মামলা করে ব্যাংকটি। এছাড়া মাবিয়া শিপ ব্রেকিংয়ের কাছে ফিনিক্স ফিন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্টেরও ৯ কোটি টাকার বেশি খেলাপি ঋণ রয়েছে। গত বছর এ আর্থিক প্রতিষ্ঠানটিও গ্রুপটির বিরুদ্ধে মামলা করেছে। এর বাইরে স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, যমুনা ব্যাংকসহ আরো কয়েকটি ব্যাংকের অর্থও মাবিয়া গ্রুপের কাছে আটকে আছে বলে জানা যায়।

চট্টগ্রামের বিভিন্ন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যবস্থাপকরা শেয়ার বিজকে বলেন, বারবার তাগাদা দিয়েও অর্থ আদায় করতে না পেরে মাবিয়া গ্রুপের বিরুদ্ধে চেক প্রত্যাখ্যান ও অর্থঋণ আদালতে মামলা করেছে গ্রুপটির সঙ্গে থাকা প্রায় সব ব্যাংক। ঋণের বিপরীতে পর্যাপ্ত জামানত না থাকায় আইনি প্রক্রিয়ায়ও প্রতিষ্ঠানটির কাছ থেকে ঋণের সমুদয় অর্থ আদায় সম্ভব হবে না বলে মনে করছেন বেশ কিছু ব্যাংক কর্মকর্তা।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে সিটি ব্যাংকের এক কর্মকর্তা বলেন, মাবিয়া গ্রুপের ঋণের বিপরীতে যে জামানত রয়েছে, তা দিয়ে ঋণের অর্থ আদায় করা সম্ভব হবে। তবে এ বিষয়ে আমাদের স্পেশাল ডিভিশন কাজ করছে।

মার্কেন্টাইল ব্যাংক মাদামবিরিহাট শাখার ব্যবস্থাপক আনোয়ার হোসেন শেয়ার বিজকে বলেন, মাবিয়া গ্রুপের কাছে আমাদের ১০৩ কোটি টাকারও বেশি পাওনা আছে। এ গ্রুপের মেসার্স জিলানী ট্রেডার্স, মাহিম স্টীল রি-রোলিং মিল ও মাবিয়া শিপ ব্রেকার্স নামের তিন সহযোগী প্রতিষ্ঠানকে এ ঋণ দেওয়া হয়। ঋণের কিছু কিস্তিও প্রথম দিকে পরিশোধ করেন প্রতিষ্ঠানের কর্ণধাররা। এরপর কয়েক বছর ধরে আর কোনো অর্থ পরিশোধ করছে না প্রতিষ্ঠানটি। এক্ষেত্রে চেক প্রত্যাখানের মামলা এবং বন্ধকী সম্পত্তি নিলামে বিক্রি উদ্যোগ নেওয়া হলেও বর্তমানে স্থগিত আছে উচ্চ আদালতের এক আদেশে। এমনকি টাকা ফেরত দেওয়ার কোনো ইচ্ছাও উদ্যোক্তাদের নেই।

মাবিয়া গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক জাহাঙ্গীর আলমের সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ করা হলে ফোন বন্ধ পাওয়া যায়। পরে এ গ্রুপের আরেক পরিচালক ফরিদুল আলমের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি সাংবাদিক পরিচয় পেয়ে ফোন সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন। পরে একাধিকবার ফোন করা হলে তিনি ফোন রিসিভ করেননি। গ্রুপটির অফিসেও দায়িত্বশীল কাউকে পাওয়া যায়নি।