ধস-পরবর্তী পুঁজিবাজার থেকে আইসিবির সর্বোচ্চ মুনাফা

নিয়াজ মাহমুদ: রাষ্ট্রায়ত্ত সবচেয়ে বড় বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশ (আইসিবি)। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ করে এর মূলধনি মুনাফা (ক্যাপিটাল গেইন) বেড়েছে ৩৩০ কোটি ৭০ লাখ টাকা। ২০১০ সালের ভয়াবহ ধস-পরবর্তী সময়ে এটি সর্বোচ্চ মুনাফা বৃদ্ধি। বিদায়ী অর্থবছরে পুঁজিবাজার স্থিতিশীল থাকায় আইসিবির ক্যাপিটাল গেইনের পরিমাণ বাড়ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত আইসিবি ২০১৬-১৭ অর্থবছরে এ বাজারে বিনিয়োগ করে মুনাফা করেছে ৭৭৬ কোটি পাঁচ লাখ টাকা, যা গত ছয় অর্থবছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। ২০১৫-১৬ অর্থবছরে প্রতিষ্ঠানটি পুঁজিবাজার থেকে ক্যাপিটাল গেইন করেছিল ৪৪৫ কোটি ৩৫ লাখ টাকা, যা আগের অর্থবছরের চেয়ে ৭৪.২৬ শতাংশ বেশি।

এদিকে ২০১৪-১৫ অর্থবছরে পুঁজিবাজার থেকে আইসিবি মুনাফা করে ৪৭২ কোটি ৮১ লাখ টাকা। ২০১৩-১৪ অর্থবছরে এ খাত থেকে ৪৪১ কোটি ৭২ লাখ টাকা মুনাফা করে প্রতিষ্ঠানটি। আর ২০১২-১৩ অর্থবছরে পুঁজিবাজার থেকে আইসিবি মুনাফা করেছিল ৩৫৩ কোটি ৯৪ লাখ টাকা। এর আগের অর্থবছর অর্থাৎ পুঁজিবাজারে সূচকের ভয়াবহ ধস-পরবর্তী বছরে মুনাফা করেছিল ৪৯৪ কোটি ৭০ লাখ টাকা।

আইসিবির সদ্য প্রকাশিত বার্ষিক প্রতিবেদন বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০১৬-১৭ অর্থবছরে প্রতিষ্ঠানটির প্রভিশন এবং কর-পূর্ববর্তী মোট মুনাফার পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫৩৫ কোটি ৬৬ লাখ টাকা। ২০১৫-১৬ অর্থবছরে এর পরিমাণ ছিল ৩৮৫ কোটি ২৬ লাখ টাকা। আর বিদায়ী অর্থবছরে আইসিবির কর পরবর্তী নিট মুনাফা হয়েছে ৩৬৮ কোটি ১৭ লাখ টাকা। এর আগের বছর (২০১৫-১৬) নিট মুনাফা করেছিল ৩১৩ কোটি ৬৯ লাখ টাকা।

গত অর্ধ যুগের মধ্যে ২০১৬-১৭ অর্থবছরে পুঁজিবাজার থেকে আইসিবির সর্বোচ্চ মুনাফা প্রসঙ্গে কথা হয় প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান ড. মজিব উদ্দিন আহমেদের সঙ্গে। তিনি শেয়ার বিজকে বলেন, দীর্ঘদিন পরে গত অর্থবছর পুঁজিবাজার বেশ স্থিতিশীল ছিল। এ কারণে বিভিন্ন কোম্পানির শেয়ারে আইসিবির বিনিয়োগ বেড়েছে। একই সময়ে ক্রয়-বিক্রয় বেড়েছে বেশ। ফলে পুঁজিবাজার থেকে আমাদের মুনাফা বেড়েছে। এছাড়া ক্যাপিটাল মার্কেটে বিনিয়োগের জন্য আইসিবির গবেষণা আরও সমৃদ্ধ হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।

২০১৬-১৭ অর্থবছরে আয়ের প্রধান খাতগুলোর মধ্যে অধিকাংশ খাত থেকেই আইসিবির মুনাফা বেড়েছে। এ সময়ে সুদ বাবদ কোম্পানিটির মুনাফা হয়েছে ২০৩ কোটি ৪২ লাখ টাকা, যা আগের অর্থবছরে সুদ আয় হয়েছিল ১৮৯ কোটি ৪৫ লাখ টাকা। এছাড়া এফডিআরের গড় পরিমাণ বৃদ্ধি, শ্রেণীকৃত মার্জিন ঋণ হ্রাস এবং বন্ড-ডিভেঞ্চার  ক্রয়ের ওপর সুদ আয় বৃদ্ধি পাওয়ায় পূর্ববর্তী অর্থবছরের তুলনায় সুদ বাবদ আইসিবির আয় বৃদ্ধি পেয়েছে বলে জানা গেছে।

গত অর্থবছরে রাষ্ট্রায়ত্ত এ প্রতিষ্ঠানটির লভ্যাংশ ও ডিবেঞ্চার সুদ খাতে আয় হয়েছে ৩৩৮ কোটি ৭৫ লাখ টাকা। এর আগের অর্থবছর (২০১৫-১৬) আয় হয়েছিল ২৮২ কোটি ৬২ লাখ টাকা। অর্থাৎ ওই অর্থবছর ১৯ দশমিক ৮৬ শতাংশ বেশি আয় করেছে। পত্রকোষ বিনিয়োগের পরিমাণ বৃদ্ধি পাওয়ায় পত্রকোষ হতে প্রাপ্ত লভ্যাংশের পরিমাণ ও বাংলাদেশ ফান্ড হতে প্রাপ্ত লভ্যাংশের পরিমাণ বৃদ্ধি পাওয়ায় পূর্ববর্তী বছরের তুলনায় এ খাতে আয় বৃদ্ধি পেয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

অন্যদিকে ২০১৬-১৭ অর্থবছরে আইসিবি ফি ও কমিশন খাতে আয় গত বছরের তুলনায় কমেছে। এক কোটি ৭২ লাখ টাকা এ খাতে আয় কমেছে। আইসিবি পরিচালিত আটটি মিউচুয়াল ফান্ড বে-মেয়াদি মিউচুয়াল ফান্ডে রূপান্তর করায় ম্যানেজমেন্ট ফি ও কাস্টডিয়ান ফি বাবদ আয় কিছুটা কমেছে। এর ফলে প্রতিষ্ঠানটির ফি ও কমিশন খাতে আয় আগের অর্থবছরের তুলনায় কেমেছে বলে দাবি আইসিবির।

এদিকে বিদায়ী অর্থবছরে গত বছরের একই সময়ের তুলনায় বেতন ও ভাতাদি খাতে ব্যয় বৃদ্ধি পেয়েছে ১৫১ দশমিক ৯৮ শতাংশ। জাতীয় পে-স্কেল ২০১৫ সম্পূর্ণরূপে বাস্তবায়িত হওয়ায় পূর্ববর্তী বছরের তুলনায় এ খাতে খরচ বেড়েছে। এছাড়া ২০১৬-১৭ অর্থবছরে সুদ-ব্যয়ের পরিমাণ গত বছরের তুলনায় ২৫ দশমিক ৫৪ শতাংশ বেড়েছে।

৩০ জুন ২০১৭ হিসাববছরের জন্য আইসিবির পরিচালনা পর্ষদ শেয়ারহোল্ডারদের জন্য ৩৫ শতাংশ লভ্যাংশ ঘোষণা করেছে। এর মধ্যে ৩০ শতাংশ নগদ ও পাঁচ শতাংশ বোনাস লভ্যাংশ। এ সময় কোম্পানিটির শেয়ারপ্রতি সমন্বিত আয় হয়েছে সাত টাকা ২৯ পয়সা। গত বছরের একই সময়ে ছিল পাঁচ টাকা ২৫ পয়সা। একই সময়ে এককভাবে ইপিএস হয়েছে পাঁচ টাকা ৮২ পয়সা। গত বছরের একই সময়ে ছিল চার টাকা ৯৬ পয়সা।

এদিকে একই সময়ে কোম্পানিটির শেয়ারপ্রতি সমন্বিত সম্পদমূল্য হয়েছে ৭৭ টাকা ৮৬ পয়সা। গত বছরের একই সময়ে ছিল ৫৯ টাকা ৩০ পয়সা। একই সময়ে এককভাবে এনএভি হয়েছে ৬৬ টাকা ৯৭ পয়সা। গত বছরের একই সময়ে ছিল ৫১ টাকা ছয় পয়সা। ২৩ ডিসেম্বর কোম্পানিটির বার্ষিক সাধারণ সভা অনুষ্ঠিত হবে। এজন্য রেকর্ড ডেট নির্ধারণ করা ছিল ২৬ নভেম্বর।

এর আগের অর্থবছরে (২০১৫-১৬) আইসিবি শেয়ারহোল্ডারদের জন্য ৩০ শতাংশ নগদ লভ্যাংশ দেয়। এ সময়ে কোম্পানির শেয়ার ইপিএস হয় চার টাকা ৯৬ পয়সা। সমন্বিত ইপিএস ছিল পাঁচ টাকা ২৪ পয়সা। একই সময়ে এনএভি হয়েছিল ৫১ টাকা ছয় পয়সা। সমন্বিত এনএভি হয় ৫৯ টাকা ৩০ পয়সা।