সারা বাংলা

ধানের ন্যায্য দাম না পাওয়া যশোরে বাড়ছে পাট ও সবজি আবাদ

মীর কামরুজ্জামান মনি, যশোর: উৎপাদন খরচের তুলনায় ধানের দাম কম হওয়ায় হতাশ কৃষক আমনের বদলে পাট ও সবজি আবাদের দিকে ঝুঁকছেন। ফলে চলতি মৌসুমে যশোরসহ দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে আমন আবাদের লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত না হওয়ার আশঙ্কা করেছেন সংশ্লিষ্টরা। এছাড়া, চাহিদা না থাকায় বিপুল পরিমাণ আমন ধানবীজ অবিক্রিত থাকার আশঙ্কা করা হচ্ছে।
যশোরসহ দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে চলতি বছর বোরোর বাম্পার ফলন হয়েছে। কিন্তু ধানের ন্যায্য দাম না পাওয়ায় হতাশ হয়েছেন কৃষক। বোরো ধান ওঠার সময় বিআর-২৮ শের দাম ছিল ৫০০-৫৩০, মিনিকেট ৫৬০-৬০০ টাকা মণ। তবে বর্তমানে আগের দামের চেয়ে একটু বেড়ে প্রতি মণ ধান বিক্রি হচ্ছে ৭০০ থেকে ৮০০ টাকায়। তবে কৃষকের গোলায় কোনো ধান না থাকায় লাভের সুফল পাচ্ছেন ধান ব্যবসায়ীরা। বোরো আবাদ ঘরে তোলার মূহূর্তেই ঋণ পরিশোধ, শ্রমিকের পারিশ্রমিক মেটাতে কৃষক কম দামে ধান বিক্রি করতে বাধ্য হয়েছেন। প্রতি বিঘায় তারা তিন থেকে চার হাজার টাকা লোকসান গুনছেন।
যশোর জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর সূত্রে জানা গেছে, যশোর জেলায় প্রায় দেড় লাখ হেক্টর জমিতে আমন আবাদের লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে। কিন্তু মাঠে মাঠে বীজতলা তৈরির চিত্র দেখে তার কোনো লক্ষণ পাওয়া হচ্ছে না। গত কয়েক বছর ধরে ধান আবাদে লোকসান করার পর কৃষক পাটসহ সবজি আবাদের দিকে ঝুঁকছেন। যে কারণে গত বছরের তুলনায় চলতি মৌসুমে দুই হাজার হেক্টর জমিতে বেশি পাট আবাদ হয়েছে। পরিসংখ্যানে দেখা গেছে ২০১৮ সালে যশোর জেলায় ১৮ হাজার ২৬৫ হেক্টর জমিতে পাটের আবাদ হয়। সেখানে চলতি ২০১৯ সালে তা বৃদ্ধি পেয়ে পাট আবাদ হয়েছে ২০ হাজার ১৪০ হেক্টর জমিতে। এর একমাত্র কারণ হচ্ছে ধান আবাদে লোকসান। কৃষির সঙ্গে সংযুক্ত লোকজনের ধারণা, এবার আমন চাষ ও উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের কোনো সম্ভাবনা নেই।
এদিকে অন্য বছরে এ সময়ে কৃষক আমন বীজের জন্য বাংলাদেশ এগ্রিকালচার ডেভেলপমেন্ট করপোরেশন (বিএডিসি) বীজ বিতরণ কেন্দ্রে গিয়ে ধরনা দিলেও এবার তার কোনো লক্ষণ নেই। বিএডিসি যশোর বীজ বিতরণ বিভাগ সূত্রে জানা যায়, ন্যায্যমূল্য না পাওয়ায় চাষিদের মধ্যে ধান চাষের আগ্রহ অনেক কমে গেছে। যে কারণে এ বছর আমন বীজের প্রতি কৃষকের চাহিদা অনেক কম। বর্তমান যে পরিস্থিতি বিরাজ করছে তাতে এ বছর অনেক বীজ অবিক্রিত অবস্থায় পড়ে থাকবে।
বিএডিসির ডিলাররা জানান, তাদের কাছ থেকে কৃষকরা বীজ সংগ্রহ করতে আসছে না। প্রত্যেক ডিলারের কাছে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বীজ অবিক্রিত অবস্থায় পড়ে আছে। রবিউল ইসলাম নামে একজন ডিলার জানান, প্রতি বছর এ সময় বিএডিসির বীজ নিয়ে কাড়াকাড়ি পড়ে যেত। বীজ সংগ্রহের জন্য চাষিরা দীর্ঘ লাইনে দাঁড়াতো। আর এবার বীজ বিক্রির জন্য ডিলারকে চাষির পেছনে পেছনে ঘুরতে হচ্ছে। ধানের দাম না পাওয়ায় এর মূল কারণ বলে তিনি দাবি করেন।
কৃষকরা জানান, বর্তমান বাজারদর অনুযায়ী ধান বিক্রি করে উৎপাদন খরচ ওঠানো কোনো মতেই সম্ভব নয়। ধানের এই দর প্রভাব ফেলেছে আমন উৎপাদনের ওপর। যে কারণে কৃষকরা অভিমানি হয়ে উৎসাহ হারিয়েছে আমন আবাদে। তার পরিবর্তে তারা সবজি বা পাট আবাদে আগ্রহী হচ্ছেন।
বাঘারপাড়া উপজেলার শেখেরবাতান এলাকার কৃষক আকরামুজ্জামান জানান, তারা গত কয়েক বছর ধরে ধান চাষ করে লোকশান গুনছেন। প্রতি বছরই লোকসানের মাত্রা বাড়ছে। বীজতলা থেকে শুরু করে ধান রোপণ, পরিচর্যা, সার, কীটনাশক ও সেচসহ ধান উৎপাদনে যে টাকা খরচ হয়েছে, সে তুলনায় দাম পাচ্ছেন না। প্রতি বছর উৎপাদন খরচ বাড়লেও কাক্সিক্ষত দাম মেলে না। ফলে প্রতি মৌসুমেই লোকসান গুনতে হচ্ছে।
অপর কৃষক মো. মনির জানান, শ্রমিক সংকটের কারণে ধান কাটার মজুরিও বেড়ে গেছে। বর্তমানে একজন শ্রমিককে ধান কাটা বাবদ দু’বেলা খাবারসহ দৈনিক দিতে হচ্ছে ৬০০-৭০০ টাকা। সেই সঙ্গে মাড়াইয়ের খরচ তো রয়েছেই। এত কষ্টের পরও লোকসান। তাহলে ধান রোপণ করব কেন?
সদর উপজেলার আবদুলপুর এলাকার কৃষক হযরত আলী জানান, সবজি ও পাট চাষ বেশ লাভজনক। আর ধান চাষ করে লাভ করা যাবে এমন কোনো নিশ্চয়তা নেই। স্বাভাবিক কারণেই কৃষকরা ধান বাদ দিয়ে অন্য আবাদের দিকে ঝুঁকছেন। এ এলাকায় এবার আমন আবাদ হবে খুবই কম। এমনকি আউশ আবাদও কমেছে। এলাকাটির মাঠে মাঠে এখন পাট আর নানা ধরনের সবজি।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের অতিরিক্ত উপপরিচালক সুষান্ত কুমার তরফদার জানান, কৃষক ধান আবাদ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন বলে যে কথা বলা হচ্ছে তা ঠিক নয়। প্রতি বছর ধানের দাম নিয়ে কৃষকের মধ্যে হতাশা থাকলেও ঠিক সময়মতো কৃষক আবার ধান আবাদের দিকে ঝুঁকে পড়েন। এর একমাত্র কারণ হচ্ছে খাদ্যে নিরাপত্তা নিশ্চিতের জন্য তারা ধান আবাদ থেকে সরে আসতে পারেন না। এ বছরও পাট আবাদের পর একই জমিতে আমন আবাদের অনেক কৃষক প্রস্তুত রয়েছেন। যশোরসহ দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে বরাবরই উদ্বৃত্ত খাদ্যশস্য উৎপন্ন হয়। এ অঞ্চলে উৎপাদিত বিপুল পরিমাণ ধান প্রত্যেক মৌসুমে দেশের বিভিন্ন স্থানে পাঠানো হয়। এ অঞ্চলের চাষিরা ধানের আবাদ কমিয়ে দিলে তা দেশের সার্বিক খাদ্য নিরাপত্তার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।

সর্বশেষ..