ধানের যৌক্তিক দাম না পেলে সামাজিক অসন্তোষ দেখা দিতে পারে

ফরহাদ হোসেন: গত বছর বন্যায় ফসলের ক্ষতি হওয়ায় কিছু চাষি ধানের ভালো দাম পেয়েছিলেন। মে মাসের শেষ দিকে মণপ্রতি ধান বিক্রি হয়েছিল এক হাজার থেকে এক হাজার ২০০ টাকায়। এবারের বোরো মৌসুমে ভালো দামের আশায় বাড়তি বিনিয়োগ করে ধানের উৎপাদন বাড়িয়েছেন কৃষক। গত বছরের চেয়ে দুই লাখ হেক্টর বেশি জমিতে ধানের আবাদ হয়েছে। এতে উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা এক কোটি ৯০ লাখ টন ছাড়িয়ে যাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ভালো উৎপাদনের পাশাপাশি ভালো দামের আশা করলেও তা ফিকে হয়ে গেছে। লাভ তো দূরে থাক উৎপাদন খরচই তুলতে পারছেন না কৃষক। এক মণ ধান উৎপাদনে ৯০০ টাকা খরচ হলেও বিক্রি করতে হচ্ছে ৬০০ থেকে ৮৫০ টাকায়। মোটা ধানের দাম পাওয়া যাচ্ছে মণপ্রতি ৬০০ থেকে ৭০০ টাকা এবং সরু ও মাঝারি ধান ৭৫০ থেকে ৮৫০ টাকা।
চাহিদার চেয়ে অনেক বেশি পরিমাণে চাল ও আমদানির অপেক্ষায় থাকায় ধানের দাম বাড়ার সম্ভাবনাও দেখা যাচ্ছে না। গত বছর তিন দফা বন্যায় ১০ লাখ টন ধান নষ্ট হওয়ায় ঘাটতি মেটাতে চাল আমদানির সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। আমদানি শুল্ক ২৭ শতাংশ থেকে নামিয়ে আনার পাশাপাশি আমদানিকারকদের দেওয়া হয় সহজশর্তের ব্যাংক ঋণের সুবিধা। এই সুবিধা নিয়ে গত এক বছরে দেশে চাল আমদানি হয়েছে ৩৭ লাখ টন।
বর্তমানে আমদানির অপেক্ষায় আছে আরও ৪৫ লাখ টন চল। দেশের শীর্ষস্থানীয় ১০ থেকে ১২টি শিল্পগোষ্ঠী এই চাল আমদানি করবে। সরকারের নীতিনির্ধারণী মহল থেকে এই মুহূর্তে চালের আমদানি শুল্ক বাড়ানোর কোনো সিদ্ধান্তও নেই। সেক্ষেত্রে ৪৫ লাখ টন চাল আমদানি হলে এবং তা দেশের বাজারে যোগ হলে কৃষক যে ধানের দাম ওঠাতে পারবেন না, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। তাই দুশ্চিন্তায় আছেন দেশের এক কোটি বোরো চাষি।
বাংলাদেশের কৃষকরা সাধারণত বেশিরভাগ বর্গাচাষি। প্রান্তিক পর্যায়ের কিছু কৃষক আছেন, যাদের নিজস্ব জমির পরিমাণও কম। বড় কৃষক বলতে যাদের বোঝায় তেমন সংখ্যা উল্লেখ করার মতো নয়। বিশ্বের উন্নত দেশগুলোর মতো ফার্মভিত্তিক কৃষি ব্যবস্থা গড়ে না ওঠায় উৎপাদিত ফসলের দাম নিয়ন্ত্রণে আমাদের কৃষকদের কোনো ভূমিকা থাকে না। এখানে মূলত ভূমিকা রাখে মধ্যস্বত্বভোগীরা। যারা বাজার থেকে ধান কিনে চাল উৎপাদন করে বিক্রি করেন, মূলত তারাই প্রশাসনের সঙ্গে যোগসাজশ করে ধান ও চালের দাম নিয়ন্ত্রণ করে থাকেন বলে অভিযোগ আছে। গত বছর তাদের অনেককেই অবৈধ মজুদের কারণে গ্রেফতারও করেছিল আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। এদিকে সরকার প্রতি বছর ধান ও চাল সংগ্রহ করলেও প্রায়ই তা বাজারমূল্যের চেয়ে কম হওয়ায় তাতে আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন কৃষক।
ধান ও চালের ন্যায্যমূল্য নিয়ে কৃষক যে দুশ্চিন্তায় আছে এর সামাজিক প্রতিক্রিয়া কী হতে পারে তা আমাদেও ভাবতে হবে। মোট জনসংখ্যা হিসেবে এখনও কৃষির ওপর নির্ভরশীল মানুষের সংখ্যাই বেশি। গত বছরের বন্যায় কৃষক যে ক্ষতির মুখে পড়েছিলেন এবারে সেই ক্ষতি কাটিয়ে ওঠার আশা ছিল সবার চোখে-মুখে।
মধ্যস্বত্বভোগীরা আমদানি করা চাল বিক্রি করে লাভের টাকায় যখন পরিবার নিয়ে ঈদ আনন্দ উদযাপন করবেন, তখন হয়তো কৃষকরা বিষণœ মুখে মাথায় হাত দিয়ে লোকসান পুষিয়ে নেওয়ার কথা ভাববেন। তাদের সন্তানরা হয়তো পাবে না ঈদের নতুন জামা, ঘরে হয়তো তৈরি হবে না সুস্বাদু খাবার। নীতিনির্ধারকরা কি এ পরিস্থিতির কথা একবারও ভেবে থাকবেন?
অনেক কৃষক এবারে ধানের উৎপাদন বাড়াতে ঋণ নিয়েছে। আশা ছিল ভালো দাম পেয়ে আগের লোকসান কাটানোর পাশাপাশি ঋণ পরিশোধ করে ভারমুক্ত হবেন। তাকে সেই সুযোগ দিচ্ছে কি দেওয়া হচ্ছে? বরং ‘আমদানি লবির’ কাছে নতি স্বীকার করে চাহিদা না থাকলেও কয়েকটি শিল্পগ্রুপকে চাল আমদানির সুযোগ দিয়ে একটি গোষ্ঠীর স্বার্থ রক্ষার সুযোগ করে দিচ্ছেন নীতিনির্ধারকরা। তাদের ভাবা উচিত প্রান্তিক পর্যায়ের কৃষকদের প্রকৃত পরিস্থিতি। সম্প্রতি পরিসংখ্যান ব্যুরোর হিসেবে দেখা গেছে, কুড়িগ্রাম, রংপুর, গাইবান্ধা, দিনাজপুরসহ উত্তরের জেলাগুলোতে দরিদ্র মানুষের সংখ্যা বাড়ছে। যেখানে সার্বিকভাবে দেশের গড় দারিদ্র্যের হার কমছে, সেখানে উল্টোপথে হাঁটছে উত্তরের জেলাগুলো। সবচেয়ে দারিদ্র্যপীড়িত জেলা কুড়িগ্রামে ২০১০ সালে দারিদ্র্যের হার ৬০.৭১ শতাংশ থাকলেও ২০১৬ সালে তা বেড়ে হয়েছে ৭০.৮ শতাংশ।
গত বছরের বন্যায় ফসলের ক্ষতি হওয়ায় এই দারিদ্র্যের হার আরও বেড়েছে বলে ধারণা করছেন কৃষি অর্থনীতিবিদরা। তারা বলছেন, এভাবে যদি কৃষকরা বছরের পর বছর তাদের উৎপাদিত ফসলের ন্যায্য দাম না পান তাহলে দারিদ্র্যের হার আরও বাড়বে। বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতি সম্প্রতি তাদের বাজেট প্রস্তাবনা নিয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে বলেছে, দেশের ১০ শতাংশ সুপার ধনীরা ৯০ শতাংশ সম্পদ নিয়ন্ত্রণ করছেন। এই ১০ শতাংশের সুবিধার কথা বিবেচনা করে সংখ্যাগরিষ্ঠ ৯০ শতাংশের সুখ, দুঃখ, সুবিধা ও অসুবিধার দিকে নজর দিতে না পারলে সামাজিক অসন্তোষ অসম্ভাবী হয়ে উঠতে পারে। এক্ষেত্রে হয়তো বিস্ফোরণ শুরু হতে পারে কৃষকসমাজ থেকেই।
এক সময়ের কৃষিনির্ভর অর্থনীতির বাংলাদেশে এখন কৃষির অংশগ্রহণ কমে আসছে। মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) এখন কৃষির অংশগ্রহণ ১৫ শতাংশের নিচে। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে জিডিপিতে কৃষির অবদান ছিল ১৪.৭৯ শতাংশ। অথচ ১৯৮০-৮১ অর্থবছরে এই হার ছিল ৩৩.০৭ শতাংশ। অর্থনীতিতে কৃষির অবদান কমে এলেও এই খাতে এখনও বাংলাদেশের সবচেয়ে বেশি শ্রমিক কাজ করে। দেশের শ্রমশক্তির ৪৫ শতাংশ কৃষিতে নিয়োজিত। অন্যদিকে ১৬ কোটি মানুষের খাদ্যনিরাপত্তার কথা মাথায় রাখলে কৃষিকে কোনোভাবেই গুরুত্বহীন খাত বিবেচনা করা যাবে না।
নিউজিল্যান্ড ও হল্যান্ডের দিকে তাকালে আমরা দেখতে পাই, এসব দেশ কৃষিকে পুঁজি করেই উন্নত অর্থনীতির দেশে পরিণত হয়েছে। অথচ বাংলাদেশে কৃষির অপার সম্ভাবনা থাকলেও এখানে কার্যকর কোনো ব্যবস্থা গড়ে উঠছে না। এখনও কৃষি খাত সনাতনী পদ্ধতি অনুসরণ করে থাকেÑসেটা যেমন উৎপাদন, তেমনি বাজার ব্যবস্থাপনাতেও। আমরা সবাই জানি, ব্রিটিশ বেনিয়ারা বাংলার চাষিদের জোর করে নীল চাষ করাতো, বিপরীতে দিত না ন্যায্য দাম। ব্রিটিশ শৃঙ্খলমুক্ত হয়ে পাকিস্তান রাষ্ট্র হলেও কৃষকের ভাগ্যে তেমন পরিবর্তন আসেনি। স্বপ্ন ছিল লাখো মানুষের রক্তের বিনিময়ে জয় করা স্বাধীন বাংলায় কৃষকরা তাদের অধিকার ফিরে পাবে। দুঃখজনক হলেও সত্যি, গত ৪৬ বছরেও সেই স্বপ্ন পূরণ হয়নি।
এই দীর্ঘ সময়ে কোনো সরকারই কৃষকের উৎপাদিত ফসলের ন্যায্য মূল নিশ্চিত করতে পারেনি, কোনো কার্যকর বাজার ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারেনি। এই চার দশকের বেশি সময়ে প্রযুক্তি, শিল্প, সেবা, শিক্ষাসহ প্রায় সব খাতে অগ্রগতি হলেও একটিমাত্র খাত কৃষি, যেখানে সেচের সুবিধা তৈরি হওয়া ছাড়া আর কিছু পাওয়া যায়নি। স্বাধীন দেশের মাটিতে এই দেশের কৃষককে জীবন দিতে হয়েছে সারের মূল্যের জন্য। সময়মতো বীজ না পাওয়ায় ফসল উৎপাদন করতে পারেন না অনেক কৃষক। বর্গাচাষিরা তাদের ন্যায্য ভাগ নিশ্চিত করতে পারেন না।
চরের চাষিরা ফসল করলেও প্রভাবশালীদের চাপে ফসল ঘরে তুলতে পারেন না। ঋণের ভারে পথে বসেছেন অনেক কৃষক। এতে এত সমস্যা দেখে ছোট চাষিদের অনেকে এখন ধানের আবাদ ছেড়ে দিয়েছেন, কেউ কেউ ছেড়ে দিচ্ছেন।
এই পরিস্থিতি চলতে থাকলে কৃষকরা যাবেন কোথায়? তাদের পিঠ তো দেয়ালে ঠেকে যাচ্ছে। পরিস্থিতি আরও খারাপ হওয়ার আগে নীতিনির্ধারকদের বাস্তবতা উপলব্ধি করতে হবে। মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য বন্ধ করে কার্যকর বাজার ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে কৃষককে ন্যায্য দাম দেওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে। শিল্প ও সেবা খাতে দেশ এগিয়ে গেলেও কৃষিকে অবহেলা করার কোনো সুযোগ নেই। যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে তৈরি পোশাক রফতানিতে ভিয়েতনাম আমাদের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী। দেশটি শিল্প খাতে এগিয়ে গেলেও কৃষিকে অবহেলা করেনি, যে কারণে বাংলাদেশের চাল আমদানির অন্যতম উৎস ভিয়েতনাম।
সময় এসেছে কৃষি নিয়ে নতুন করে ভাবার। সবার আগে ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করার পাশাপাশি কৃষিতে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। এজন্য কৃষকদের দিতে হবে সহজ শর্তের ঋণ। বর্গা চাষকে একটি আইনি ভিত্তির মধ্যে এনে মহাজনদের হাত থেকে রক্ষা করতে হবে। কৃষি খাতে দেওয়া ভর্তুকি সত্যিকার অর্থেই প্রকৃত কৃষক পায় কি না, তা নিশ্চিত করতে হবে। চলতি বাজেটে ৯ হাজার কোটি টাকার ভর্তুকি আগামী অর্থবছরে বাড়িয়ে সাড়ে ৯ হাজার কোটি টাকা করা হতে পারে বলে শোনা যাচ্ছে। এই ভর্তুকির অর্থ চালকল মালিক ও চাল আমদানিকারকদের মতো ধনীদের সুবিধার্থে ব্যবহার করা হচ্ছে কি না, তা খতিয়ে দেখতে হবে। প্রকৃতিগতভাবেই উর্বর ভূমির এই বাংলাদেশে কৃষির চাহিদা থাকবে শতাব্দীর পর শতাব্দী। এই বিবেচনায় হলেও কৃষিকে গুরুত্ব দিয়ে তার আধুনিকায়নে মনোযোগী হতে হবে।

গণমাধ্যমকর্মী

[email protected]