মত-বিশ্লেষণ

ধুঁকে ধুঁকে মরছে নারদ নদ

সাধন সরকার: জালের মতো ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা নদনদীগুলো দেশের অভ্যন্তরে পানির প্রবাহ সচল রাখে, প্রাণের সঞ্চার করে। নদীমাতৃক বাংলাদেশের নদনদীই সবচেয়ে বড় সম্পদ। প্রকৃতি, পরিবেশ, যাতায়াত ব্যবস্থা, সংস্কৃতি, জীবনযাত্রা, অর্থনীতি সবই নদীর সঙ্গে সম্পর্কিত। পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে নদীকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে সভ্যতা। আবার নদীবিরোধী তথা প্রকৃতিবিনাশী কর্মকাণ্ডে অনেক সভ্যতা হারিয়েও গেছে! বিভিন্ন কারণে এখন বাংলাদেশের নদীময় ভূমিরূপ ব্যবস্থায় নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। অনেক নদনদী মরে গেছে। অনেক নদনদী ধুঁকছে। বেশিরভাগ নদনদী দখল, দূষণ আর ভরাটকারীদের কবলে পড়েছে। খরস্রোতা ও প্রমত্তা বহু নদনদীর সেই প্রাণশক্তি এখন আর নেই। পলিচাপা পড়ে নদীগুলো যেন হাঁসফাঁস করছে। খালবিল ও নদীনালা শুকিয়ে যাওয়ায় স্থানীয় জনজীবনে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। নদীকেন্দ্রিক জীবনব্যবস্থায় বা নদীর ওপর নির্ভরশীল মানুষ তাদের দীর্ঘদিনের পেশা বদল করতে বাধ্য হচ্ছে। দেশের প্রধান প্রধান নদনদীর পানিপ্রবাহ কমে যাচ্ছে। শাখানদী ও উপনদীগুলোও পলিচাপা পড়ে ধুঁকছে। এমনই একটি নদ হলো নাটোরের নারদ নদ। একসময় এই নারদ নদটি ছিল খরস্রোতা, বর্তমানে মৃতপ্রায়।
দখল, দূষণ আর ভরাটকারীদের কবলে পড়ে নারদ নদটি যেন সরু খালে পরিণত হয়েছে। ইতিহাস থেকে জানা যায়, নারদ বাংলাদেশের প্রাচীনতম নদের একটি। এ নদকে ঘিরে প্রায় ৩০০ বছর আগে নাটোর শহরের গোড়াপত্তন হয়। নাটোরের রাজা রামজীবন ও রঘুনাথ ১৮ শতকের প্রথম দিকে এখানে তাদের রাজধানী স্থাপন করেন। সেই সময়ে বাংলার রাজধানী মুর্শিদাবাদের সঙ্গে গড়ে ওঠে নাটোরের যোগাযোগ। তখন ব্যবসা-বাণিজ্য ও যোগাযোগের অন্যতম মাধ্যম ছিল খরস্রোতা এই নারদ নদ। এরপর ধীরে ধীরে নারদ নদের চারপাশের উর্বর ভূমিকে কেন্দ্র করে বসতি গড়ে উঠতে থাকে। পদ্মার চারঘাট হয়ে বড়াল ও মুসাখান নদের পানিপ্রবাহ মূলত নারদ নদের পানির অন্যতম উৎস। বড়াল নদের জন্ম রাজশাহীর চারঘাটের পদ্মা নদী থেকে। আর বড়াল থেকে জন্ম হয় মুসাখান নদের। আবার মুসাখান নদ থেকে নাটোরের সদর উপজেলার পাইকপাড়ায় নারদ পদ্মার সঙ্গে যুক্ত হয়। ১৯ শতকের শেষের দিকে চারঘাটে সøুইস গেট নির্মাণের ফলে নারদ নদের ওপর অভিশাপ নেমে আসে! এর ফলে নারদ নদের পানির প্রবাহ কমতে থাকে। পাশাপাশি মুসাখান নদের পানির প্রবাহ কমে যাওয়ায় নারদ নদে তার প্রভাব পড়তে শুরু করে। শুষ্ক মৌসুমে নারদ নদে পানি কমে যাওয়ার সুযোগে প্রভাবশালী অনেকে নদীতীরের জায়গা দখল করতে শুরু করে। এ ছাড়া নারদ নদের দুই তীরঘেঁষে বিভিন্ন সময় স্থায়ী-অস্থায়ী অবকাঠামো গড়ে তোলা হয়। এর ফলে নদটি ধীরে ধীরে ছোট হয়ে গেছে। নদের ওপর বিভিন্ন সময় বাঁধ দিয়ে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করা হয়েছে। আবার বিভিন্ন সময় আশপাশের শিল্পকারখানার দূষিত বর্জ্য ফেলা হয়েছে এই নদে। বিভিন্ন ধরনের বর্জ্য ফেলায় এখন নদের পানি বিষাক্ত হয়ে গেছে। দূষিত বর্জ্যরে দুর্গন্ধে নদপারের মানুষের জীবন অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে। দীর্ঘদিন ধরে এ অবস্থা চলতে চলতে নদটি মশামাছি ও কীটপতঙ্গ উৎপাদনের আবাসস্থলে পরিণত হয়েছে।
নদটির খননকাজে বিভিন্ন সময় অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হলেও সেসব অর্থের যথার্থ ব্যবহার নিয়ে যথেষ্ট প্রশ্ন আছে। নদটি পরিকল্পিতভাবে খনন ও সংস্কার করা হয়নি। দেখা গেছে, খননের কয়েক মাস পরে খনন করা মাটি আবার নদটিতে গিয়ে নদটি ভরাট হয়ে গেছে। বলতে গেলে নারদ নদের দুই তীরের কোনো জায়গা ফাঁকা নেই, প্রায় সবটাই চলে গেছে প্রভাবশালীদের দখলে। নাটোর শহরের পানি নিষ্কাশনসহ স্থানীয় জীবনযাত্রায় নারদ নদের গুরুত্ব অনেক। একটি নদ মরে যাওয়া মানে ওই নদসংশ্লিষ্ট এলাকায় জীবনযাত্রার ওপর নেতিবাচক প্রভাবের শুরু হওয়া। মনে রাখা দরকার, একেকটি নদনদী একেকটি ‘জীবন্ত সত্তা’। নদনদী মরে যাওয়া মানে জীববৈচিত্র্য ও সার্বিক প্রতিবেশ ব্যবস্থার ওপর বিরূপ প্রভাব পড়া। কিছু লোভী নদীখেকো মানুষের হাতে নদনদী জিম্মি থাকতে পারে না। নদীকে আপন বেগে চলতে দিতে হবে। নদীখেকোদের শাস্তির আওতায় আনতে হবে। নারদ নদ রক্ষার্থে নদটি পরিকল্পিতভাবে খনন করতে হবে। দুই তীর থেকে দখলদারদের উচ্ছেদ করে সীমানা নির্ধারণ করে দেয়াল তৈরি করে দিলে নদটি সুরক্ষিত থাকবে বলে মনে করি। এ ছাড়া স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে নদটি রক্ষায় আরও সচেতন করে তুলতে হবে।

কলাম লেখক ও পরিবেশকর্মী
[email protected]

সর্বশেষ..