প্রচ্ছদ প্রথম পাতা

নতুনের চ্যালেঞ্জ নাকি গতানুগতিক ধারা?

নিজস্ব প্রতিবেদক: আজ জাতীয় সংসদে উপস্থাপন করা হবে ২০১৯-২০ অর্থবছরের বাজেট। এটি বর্তমান সরকারের তৃতীয় মেয়াদের প্রথম ও আওয়ামী লীগ সরকারের ২০তম বাজেট। সে সঙ্গে আ হ ম মুস্তফা কামালের অর্থমন্ত্রী হিসেবে প্রথম বাজেট। এর আগে রেকর্ড টানা ১০ বার বাজেট পেশ করেন আবুল মাল আবদুল মুহিত। তাই নতুন বাজেটে নতুন কোনো কৌশল থাকছে, নাকি পুরোনো অর্থমন্ত্রীর গতানুগতিক পথেই হাঁটবেন মুস্তফা কামাল সে নিয়ে ব্যবসায়ী, অর্থনীতিবিদ সব পক্ষই অপেক্ষায় রয়েছে।
এদিকে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) মতে, গত ১০ বছরের মধ্যে সবচেয়ে চাপে রয়েছে দেশের সামষ্টিক অর্থনীতি। পাশাপাশি দায়িত্ব নিয়ে প্রথম বাজেটের প্রাক্কালে নতুন অর্থমন্ত্রীর জন্য সবচেয়ে চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায় নতুন ভ্যাট আইন বাস্তবায়ন। ব্যবসায়ীদের দাবির মুখে এরই মধ্যে ভ্যাটের পাঁচটি স্তর হবে বলে ঘোষণা দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী। তাই চলতি অর্থবছর রেকর্ড ঘাটতির পর রাজস্ব আদায়ে গতি আনতে নতুন অর্থমন্ত্রীর জন্য চ্যালেঞ্জ রয়েই গেছে। এ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় তিনি কি কৌশল অবলম্বন করবেন, তা আজ বিকালেই জানা যাবে।
বাজেটের সম্ভাব্য আকার হবে পাঁচ লাখ ২৩ হাজার ১৯১ কোটি টাকা, যা চলতি অর্থবছরের মূল বাজেটের চেয়ে ১২ দশমিক ৬১ ও সংশোধিত বাজেটের চেয়ে ১৮ দশমিক ২২ শতাংশ বড়। আগামী ৩০ জুন এ বাজেট পাস হবে। আকারের দিক থেকে বাজেট বড় হলেও বাস্তবায়নে চ্যালেঞ্জ রয়েছে।
সূত্রমতে, প্রস্তাবিত বাজেটে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর) এবারের চেয়ে প্রায় ৪৬ হাজার কোটি টাকা বাড়িয়ে তিন লাখ ২৫ হাজার ৬০০ কোটি টাকার রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা দেওয়া হচ্ছে, যা চলতি অর্থবছরের সংশোধিত লক্ষ্যের চেয়ে ১৭ শতাংশ বা প্রায় ৪৬ হাজার কোটি টাকা বেশি। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ভ্যাট খাতে এক লাখ ১৭ হাজার ৬৭২ কোটি টাকা আদায় করতে হবে, যা চলতি অর্থবছরের চেয়ে সাড়ে ১৩ হাজার কোটি টাকা বেশি। এছাড়া এ বাজেটে নতুন ভ্যাট আইন বাস্তবায়নের ঘোষণাও হতে পারে। অনলাইনভিত্তিক এ আইন বাস্তবায়ন হলে রাজস্ব খাতে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
অপরদিকে, আয়কর খাতে এক লাখ ১৫ হাজার ৫৮৮ কোটি টাকা আদায় করতে হবে এনবিআরকে, যা চলতি অর্থবছরের সংশোধিত লক্ষ্য থেকে ১৯ হাজার কোটি টাকা বেশি। এবার আয়করের সংশোধিত লক্ষ্য হলো ৯৬ হাজার ৬৩২ কোটি টাকা। আর শুল্ক খাতে লক্ষ্যমাত্রা ১৩ হাজার কোটি টাকা বেড়ে হচ্ছে ৯২ হাজার ৩৪০ কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরে শুল্ক খাতে সংশোধিত লক্ষ্য হলো ৭৯ হাজার ৪২৫ কোটি টাকা।
সূত্রমতে, বাজেটের এক-তৃতীয়াংশ এনবিআরের আদায় থেকে পূরণ হবে। অর্থাৎ প্রস্তাবিত বাজেটের রাজস্ব খাত থেকে আসবে তিন লাখ ৭৭ হাজার ৮১০ কোটি টাকা। যা চলতি অর্থবছরের লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ৩৮ হাজার ৫৩০ কোটি টাকা বেশি। এর মধ্যে এনবিআর নিয়ন্ত্রিত রাজস্ব তিন লাখ ২৫ হাজার ৬০০ কোটি টাকা। এনবিআর-বহির্ভূত রাজস্ব ১৪ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। কর ব্যতীত প্রাপ্তি ৩৭ হাজার ৭১০ কোটি টাকা এবং বৈদেশিক অনুদানের পরিমাণ ধরা হচ্ছে চার হাজার ১৬৮ কোটি টাকা।
বাজেটে পরিচালন ব্যয় ধরা হচ্ছে তিন লাখ ১০ হাজার ২৬২ কোটি টাকা। উন্নয়ন ব্যয় ধরা হচ্ছে দুই লাখ ১১ হাজার ৬৮৩ কোটি টাকা। এর মধ্যে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) আকার দুই লাখ দুই হাজার ৭২১ কোটি টাকা। অনুদান ছাড়া বাজেট ঘাটতি হতে পারে এক লাখ ৪৫ হাজার ৩৮০ কোটি টাকা, যা চলতি অর্থবছরের বাজেটে ছিল এক লাখ ২৫ হাজার ২৯৩ কোটি টাকা। এ হিসেবে প্রস্তাবিত বাজেটে ঘাটতির পরিমাণ বাড়ছে ২০ হাজার ৮৭ কোটি টাকা। ঘাটতি মেটাতে বিদেশ থেকে ঋণ নেওয়ার পরিকল্পনা করা হচ্ছে ৬৩ হাজার ৮৪৮ কোটি টাকার। চলতি অর্থবছরে রয়েছে ৫০ হাজার ১৬ কোটি টাকা।
বাজেট ঘাটতি মেটাতে অভ্যন্তরীণ খাত থেকে নেওয়া হবে ৭৭ হাজার ৩৬৩ কোটি টাকা। এর মধ্যে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে ৪৭ হাজার ৩৬৪ কোটি টাকা এবং জাতীয় সঞ্চয়পত্র থেকে ২৭ হাজার কোটি টাকা নেওয়া হবে। বাজেটে জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য ধরা হচ্ছে আট দশমিক দুই শতাংশ ও মূল্যস্ফীতি পাঁচ দশমিক পাঁচ শতাংশ।
অপরদিকে, বাজেটে সোয়া তিন লাখ কোটি টাকা রাজস্বের জোগান দিতে আয়কর ও মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) খাতে মূল নজর থাকবে। করদাতা ৪০ লাখ থেকে বাড়িয়ে এক কোটি করার ঘোষণা থাকবে। থাকবে ভ্যাট আইন বাস্তবায়নের রূপরেখা। ব্যবসায়ীদের দাবি মেনে ভ্যাট হার ১৫ শতাংশ ছাড়াও ১০ শতাংশ, সাড়ে সাত, পাঁচ ও দুই শতাংশ ঘোষণা করা হবে। পাঁচ শতাংশ ভ্যাটের আওতায় মোট পণ্য ও সেবা থাকছে ৯১টি। ১২টি পণ্যে সাড়ে সাত শতাংশ হারে, ২০টি পণ্য ও সেবায় ১০ শতাংশ। ১৫ শতাংশ ভ্যাট প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান রেয়াত নিতে পারলেও অন্যদের জন্য সে সুযোগ থাকছে না। বিশেষ কিছু পণ্যের জন্য থাকছে দুই শতাংশের ভ্যাট। এছাড়া যেসব পণ্য বর্তমানে ট্যারিফ পদ্ধতিতে ভ্যাট দিচ্ছে, এমন বিশেষ কিছু পণ্যের ক্ষেত্রে (ওজনে পরিমাপ হওয়া পণ্য) ‘স্পেসিফিক ভ্যাট’ নামে নির্দিষ্ট পরিমাণ ভ্যাট আদায় হবে।
বর্তমানে ১৯৯১ সালের আইনে নির্দিষ্ট খাতে (৩৯টি) প্রযোজ্য হারে ‘উৎসে’ ভ্যাট আদায় করা হয়। নতুন আইনে উৎসে ভ্যাট কর্তনের পরিধি ব্যাপক বাড়ানো হবে। এখন শুধু আমদানি পর্যায়ে বাণিজ্যিক পণ্যে (কমার্শিয়াল ইমপোর্টার) ‘অগ্রিম’ ভ্যাট (এটিভি) আদায় করা হয়। নতুন আইনে বাণিজ্যিকসহ সব পণ্যে অগ্রিম ভ্যাট দিতে হবে। ফলে ভ্যাটের আওতা ব্যাপকভাবে বাড়বে। এটিভি আদায় হবে অগ্রিম কর নামে। বর্তমানে কেবল বাণিজ্যিক পণ্যের আমদানিতে পাঁচ শতাংশ অগ্রিম ভ্যাট আদায় হলেও বন্ডেড সুবিধায় আনা পণ্য বাদে অন্য সব ধরনের পণ্যের ক্ষেত্রে এডভান্স ট্যাক্স দিতে হবে। এছাড়া ধীরে ধীরে সম্পূরক শুল্ক উঠিয়ে দেওয়ার কথা থাকলেও শেষ পর্যন্ত স্থানীয় শিল্পের কথা বিবেচনা করে এক হাজার ১৯৬টি পণ্যে বিদ্যমান সম্পূরক শুল্ক কাঠামোয় বড় ধরনের পরিবর্তন আসছে না। বছরে ৫০ লাখ টাকা পর্যন্ত বিক্রি (টার্নওভার) ভ্যাটমুক্ত থাকছে। পরবর্তী তিন কোটি টাকা পর্যন্ত বিক্রিতে চার শতাংশ হারে টার্নওভার ট্যাক্স আদায় করতে হবে। বর্তমানে এ হার তিন শতাংশ।
অপরদিকে, স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের প্রথম বাজেট ঘোষণা করা হয় ১৯৭২ সালের ৩০ জুন। তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের অর্থমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ ঘোষিত দেশের প্রথম বাজেটের আকার ছিল মাত্র ৭৮৬ কোটি টাকা। ৪৮ বছরের ব্যবধানে দেশে বাজেটের আকার বেড়েছে ৬৬৬ গুণ। সর্বশেষ গত ১০ বছরে অর্থাৎ আওয়ামী লীগ সরকারের টানা দুই মেয়াদ ও তৃতীয় মেয়াদের প্রথম বাজেট পর্যন্ত আকার বেড়েছে পাঁচগুণেরও বেশি। ২০০৯ সালে দলটি ক্ষমতায় আসার পর ওই বছরের ১১ জুন (৩৯তম) ২০০৯-১০ অর্থবছরের এক লাখ ১৩ হাজার ১৭০ কোটি টাকার বাজেট উত্থাপন করে। এ বাজেটটি বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো এক লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যায়। এরপর ২০১৩-১৪ অর্থবছরে দুই লাখ ২২ হাজার ৪৯১ কোটি টাকা, ২০১৬-১৭ অর্থবছরে তিন লাখ ৪০ হাজার ৬০৫ কোটি টাকা, ২০১৭-১৮ অর্থবছরে চার লাখ ২৬৬ কোটি টাকার বাজেট ঘোষণা করা হয়। আজ ১৩ জুন উপস্থাপন করা হবে পাঁচ লাখ ২৩ হাজার ১৯০ কোটি টাকার বাজেট। বর্তমান সরকারের ১১ বছরের ব্যবধানে বাজেটের আকার বেড়েছে পাঁচগুণেরও বেশি।

সর্বশেষ..