নতুন বছর আনুক সমৃদ্ধির বার্তা

আজ বাংলা ১৪২৫ সালের প্রথম দিন। নতুন বছরে পদার্পণের এ দিনে প্রত্যাশা থাকবে, পুরাতন বছরের জরা ও গ্লানি ঘুচিয়ে নতুন বছর সমৃদ্ধির বার্তা বয়ে আনবে সবার জীবনে। এজন্য অর্থনৈতিক উন্নয়নে ধারাবাহিকতা রক্ষার বিকল্প নেই। রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকরা সে লক্ষ্যে সচেষ্ট বলেই মনে হয়। এর প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে তৃণমূল পর্যায়েও। গ্রাম-বাংলার মানুষ এখন সচেষ্ট নিজেদের ভাগ্য ও জীবনযাত্রার মানোন্নয়নে। আমরা চাইব, নতুন বছরে এর গতি আরও বাড়বে। মানুষের জীবনে সচ্ছলতা থাকলে তাদের পক্ষে এগিয়ে যাওয়া সম্ভব উন্নততর জীবনের দিকে। এ ধারায় বাংলাদেশকে ক্রমে গড়ে তোলা সম্ভব একটি ‘উন্নত’ দেশ হিসেবে। কিছুদিন আগে স্বল্পোন্নত থেকে উন্নয়নশীল দেশে উন্নীত হওয়ার মানদণ্ড পূরণে প্রথমবারের মতো সক্ষম হওয়ার স্বীকৃতি পেয়েছি আমরা। আশা করব, নতুন বছরে আর সবকিছুর সঙ্গে কাক্সিক্ষত সময়ে উন্নত দেশে পরিণত হওয়ার লক্ষ্যে তার অঙ্গীকার নবায়ন করবে জাতি। এ ক্ষেত্রে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা নির্ধারিত মানদণ্ডে উত্তীর্ণ হওয়ার প্রচেষ্টাও আমরা দেখতে চাইব সবার মধ্যে।

পয়লা বৈশাখ এবার এমন সময়ে উপস্থিত, যখন সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কার আন্দোলনে সাধারণ ছাত্ররা উত্তাল। গত কয়েক দিন দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ছিল শিক্ষার্থীদের স্লোগানে মুখর। প্রধানমন্ত্রীর এ-সংক্রান্ত ঘোষণায় পরিস্থিতি অবশ্য শান্ত হয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো স্থানে নববর্ষ উদ্যাপনের প্রস্তুতি বিঘিœত হওয়ায় অনেকের মনে শঙ্কাও জেগেছিল এবারের আয়োজন উৎসবমুখর হবে কিনা, তা নিয়ে। উদ্ভূত পরিস্থিতি কেটে যাওয়ায় বৈশাখ ঘিরে বিশেষত বিভিন্ন ক্যাম্পাসের আয়োজনে শিক্ষার্থীদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণই দেখতে চাইব আমরা। চাকরিতে কোটা পদ্ধতি সংস্কারে একটি আন্দোলন সমাপ্তির অব্যবহিত পর আগত বৈশাখে মেধার ক্ষেত্রে দেশকে এগিয়ে নেওয়ার দৃপ্ত শপথও দেখতে চাইব আমরা।

এই সাংস্কৃতিক উৎসব সব মানুষের। কোনো উৎসব যত বিস্তৃত হয়, তাতে মানুষের অংশগ্রহণ যত বাড়ে; এর মধ্য দিয়ে সহজতর হয় সাংস্কৃতিক চেতনার নবায়ন। বস্তুত বাংলা বর্ষবরণ অনুষ্ঠানে তুলে ধরা হয় আমাদের জাতিসত্তার বহু বছরের সুমহান ঐতিহ্য। অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণকারী নতুন প্রজš§ যদি এখান থেকে সঠিক বার্তা নেয় এবং নিজেদের মননে তা ধারণ করতে শেখে, তাহলেই সার্থক হবে এ আয়োজন। এটা আমাদের সাংস্কৃতিক চেতনা সুসংহত করার ক্ষেত্রেও রাখবে ভূমিকা। বাংলা নববর্ষের উৎসব ঘিরে একধরনের সাংস্কৃতিক জাগরণ দেখা যায় মানুষের মধ্যে। বছরজুড়ে এর ধারাবাহিকতা আমাদের সাংস্কৃতিক মুক্তির পথকে প্রশস্ত করবে বলেই ধারণা। মানুষের মধ্যে সেই সচেতনতা সৃষ্টির উদ্যোগও নিতে হবে নীতিনির্ধারণী পর্যায় থেকে।

নববর্ষ ও এর উদযাপন ঘিরে গতি আসে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে। সংবাদপত্রের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে রাজধানীর একাংশে ব্যবসা-বাণিজ্যে স্থবিরতা নেমে এলেও অন্যান্য এলাকার বিপণিবিতানে ঠিকই ভিড় জমিয়েছে ক্রেতারা। একই ধারা দেশের অন্যান্য স্থানেও। এ উপলক্ষে চাকরিজীবীদের উৎসব ভাতা প্রদান কেনাকাটায় জোগাচ্ছে উৎসাহ। বৈশাখের আমেজ শেষ না হতেই শুরু হবে ঈদের কেনাকাটা। সব মিলিয়ে সামনের দুই মাস ব্যস্ত সময় কাটবে ব্যবসায়ীদের। উৎসব ঘিরে অতিমুনাফা শিকারের প্রবণতা অবশ্য রয়েছে তাদের একটি শ্রেণির মধ্যে। এর পরিবর্তে তারা যদি ক্রেতাবান্ধব নীতি অবলম্বন করেন, তাহলেও এ সময়ে ব্যবসায় গতিশীলতা বজায় থাকবে। তাতে হাসি থাকবে ক্রেতা ও বিক্রেতা উভয়ের মুখে। বৈশাখ উপলক্ষে গ্রামগঞ্জে নিয়ম করে মেলার আয়োজন হতো একসময়। পয়লা বৈশাখ ঘিরে এখন বেশিরভাগ আয়োজন হচ্ছে শহরকেন্দ্রিক। গ্রামের পরিবর্তে বৈশাখী উৎসবের শহরমুখী যাত্রা প্রমাণ করে, এটি এখন কৃষিভিত্তিক নি¤œমধ্যবিত্তের নাগালে নেই। বৈশাখের আগমন যাতে গ্রামের এ জনগোষ্ঠীর জীবনেও আনন্দ বয়ে আনে এবং গ্রামীণ অর্থনীতিতে ভূমিকা রাখে, সেটি নিশ্চিতেও তাই সচেষ্ট হতে হবে আমাদের।