বাণিজ্য সংবাদ

নতুন সম্ভাবনা বড় উদ্যোক্তাদের শঙ্কায় ক্ষুদ্র কারখানা মালিকরা

ইস্পাত খাতে প্রযুক্তিগত পরিবর্তন

সাইফুল আলম, চট্টগ্রাম: একসময় আমদানিনির্ভর ছিল দেশের ইস্পাত খাত। সময়ের সঙ্গে দেশীয় উদ্যোক্তারা সক্ষমতা বাড়াতে গিয়ে এনেছেন বহুমাত্রিক বৈচিত্র্য। এর অংশ হিসেবে ম্যানুয়াল থেকে অটোমেটিক মিল, অটো থেকে ইলেকট্রিক আর্ক ফার্নেস, কোয়ান্টাম আর্ক ফার্নেস ইত্যাদির সংযোজন হয়েছে। এসব সংযোজন ইস্পাত খাতে উৎপাদন বাড়িয়েছে জ্যামিতিক হারে এবং কমেছে উৎপাদন ব্যয়ও। সাম্প্রতিক সময়ে দেশের ইস্পাত খাতে আসছে প্রযুক্তিগত পরিবর্তন। আর এ পরিবর্তনে একদিকে বড় কোম্পানিগুলোর মুনাফার সম্ভাবনা বাড়ছে। অন্যদিকে অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখা নিয়ে শঙ্কিত ম্যানুয়াল ও সেমি অটো এবং রি-রোলিং মিলগুলো।
বাংলাদেশ স্টিল রি-রোলিং মিলস অ্যাসোসিয়েশন সূত্রে জানা যায়, ২০০৮ সালে দেশে ইস্পাত উৎপাদন ছিল মাত্র ১৬ লাখ টন। এজন্য বিলেট আমদানি করা হতো ১২ লাখ টন। তখন এ খাতে কর্মসংস্থান ছিল ৬০ হাজার মানুষের। বর্তমানে বছরে ইস্পাত উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ৫৫ লাখ টন। এখন দেশে উৎপাদিত বিলেট দিয়েই প্রয়োজন মেটানো সম্ভব হচ্ছে। পাশাপাশি কর্মসংস্থান হয়েছে দুই লাখ ৫০ হাজার মানুষের। এক দশকের ব্যবধানে উৎপাদন সক্ষমতা বেড়েছে ৩৯ লাখ টন। পাশাপাশি বিলেট উৎপাদন সক্ষমতা বেড়েছে ৪০ লাখ টন।
এ সক্ষমতা বাড়াতে গিয়ে বড় বড় ইস্পাত খাতে প্রতিষ্ঠানগুলো মানসম্মত ইস্পাত পণ্য উৎপাদনে মনোযোগী ছিল। এ বিপুল রূপান্তরের পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে প্রযুক্তির উৎকর্ষ। এসব প্রযুক্তিগত উন্নয়নের ফলে ইস্পাত খাতে জ্বালানি ব্যবহার কমেছে। পাশাপাশি কমছে উৎপাদন ব্যয়, বাড়ছে উৎপাদন।
ইস্পাত খাতের মার্কেট লিডার আবুল খায়ের স্টিল (একেএস স্টিল) ইস্পাত উৎপাদন প্রক্রিয়ায় ২০১৫ সালে ইলেকট্রিক আর্ক ফার্নেস প্রযুক্তির ব্যবহার নিয়ে আসে। এরপর সর্বশেষ ইস্পাত খাতে অত্যাধুনিক প্রযুক্তির সংযোজন করেছে জিপিএইচ। প্রতিষ্ঠানটির বিক্রয় ও বিপণন বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, কোয়ান্টাম আর্ক ফার্নেস প্রযুক্তির সমন্বিত ইস্পাত প্লান্টে একসঙ্গে এবং একই ছাদের নিচে সর্বাধুনিক কাঁচামাল হেন্ডলিং, মেল্টিং, রিফাইনিং, কাস্টিং ও রোলিং করা যায়। এই প্রযুক্তি ব্যবহারের ফলে বিশ্বব্যাংকের নির্ধারিত কার্বন নির্গমন ৯০ শতাংশের কম এবং বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ড ৯৬ শতাংশের কম হবে, যা বিদ্যামান রি-রোলিং মিলগুলোয় নেই। পাশাপাশি প্লান্টে গ্যাস ও বিদ্যুৎ ব্যবহার কমবে ৫০ শতাংশেরও বেশি। তারা আরও বলেন, নতুন প্লান্টে বছরে এমএস বিলেটের বার্ষিক উৎপাদন ক্ষমতা আট লাখ ৪০ হাজার টন এবং এমএস রড ও মিডিয়াম সেকশন প্রোডাক্টের বার্ষিক উৎপাদন ক্ষমতা ছয় লাখ ৪০ হাজার টন বাড়বে। ফলে প্রতিষ্ঠানের বর্তমান উৎপাদন ক্ষমতাসহ এমএস বিলেটের মোট বার্ষিক উৎপাদন ক্ষমতা হবে ১০ লাখ আট হাজার টন এবং এমএস রড ও মিডিয়াম সেকশন প্রোডাক্টের মোট বার্ষিক উৎপাদন ক্ষমতা সাত লাখ ৬০ হাজার টনে দাঁড়াবে।
এদিকে প্রযুক্তি বড় উদ্যোক্তাদের জন্য যতটা সুখকর, ক্ষুদ্র কারখানা মালিকদের জন্য ততটা নয়। কারণ এসব প্রযুক্তি গ্রহণ করার মতো আর্থিক সংগতি তাদের নেই। ফলে ক্ষুদ্র কারখানার উদ্যোক্তারা অস্তিত্ব সংকটের মুখোমুখি হতে চলেছেন।
ইস্পাত খাতে ছোট ম্যানুয়াল ও অটোমেটিক একাধিক মিল মালিকরা উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, যেভাবে বড় কোম্পানিগুলো উৎপাদন বাড়াচ্ছে, তাতে আমাদের মিল পরিচালনা কঠিন হয়ে পড়ছে। এতে গত কয়েক বছরে অনেক ছোট ইস্পাত কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। এছাড়া কেউ কেউ ম্যানুয়াল থেকে অটোমেটিক বা রি-রোলিং মিলে রূপান্তরে গেছে। কিন্তু বড় কোম্পানির তুলনায় কম বিনিয়োগের কারণে অনেকেই লোকসানে পড়েন। আবার প্রতিযোগিতায় টিকতে না পেরে অনেক সময় ছোট প্রতিষ্ঠান তাদের কাছে কারখানা বিক্রি করে দিচ্ছে, কিংবা ভাড়া দিয়েছে।
বাজার সম্ভাবনা থাকায় ইস্পাত খাতে কয়েকটি ছোট কোম্পানি বিনিয়োগ নিয়ে আসতে আগ্রহী ছিল। কিন্তু প্রযুক্তিগত পরিবর্তনে বিনিয়োগ ঝুঁকিতে পড়তে পারে, এ আশঙ্কায় সিদ্ধান্তহীনতা পড়েন অনেক নতুন উদ্যোক্তা। এমন এক উদ্যোক্তা চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের ভাটিয়ারীর জাহাজ ভাঙা ব্যবসায়ী মোহাম্মদ লোকমান। তিনি ২২০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করে এসএল অটো রি-রোলিং মিলস নামে স্টিল রি-রোলিং কারখানা স্থাপনে আগ্রহী। এ ব্যবসায়ী শেয়ার বিজকে বলেন, ইস্পাত খাতে সম্ভাবনা আছে। এ কারণে আমরা বিনিয়োগ করার জন্য একটি প্রস্তাবনা নিবন্ধন করেছি। কিন্তু এখনও তা চিন্তাভাবনার পর্যায়ে আছে। এর মধ্যে বেশকিছু প্রতিষ্ঠান তাদের উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধি করেছে এবং নতুন করে বড় বড় বিনিয়োগও আসছে। ফলে বুঝে-শুনে এগিয়ে যাওয়াটা ভালো হবে।
এ বিষয়ে কোম্পানিটির অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ আলমাস শিমুল শেয়ার বিজকে বলেন, দেশে নির্মাণ খাতে মানসম্মত ইস্পাতের চাহিদা ও ব্যবহার বাড়ছে। আর এ মানসম্মত ইস্পাত পণ্যের চাহিদা পূরণে সর্বাধুনিক প্রযুক্তি কোয়ান্টাম আর্ক ফার্নেস টেকনোলজি দিয়ে আমরা সম্প্রসারিত প্লান্ট বাস্তবায়ন করছি, যা দ্রুত সময়ের মধ্যে উৎপাদনে আসবে এবং অধিক উৎপাদন ক্ষমতা বৃদ্ধির পাশাপাশি উচ্চ মানসম্পন্ন পণ্য উৎপাদন করতে সক্ষমতা নিশ্চিত করবে। তবে এতে অন্যান্য কোম্পানির আতঙ্কিত হওয়া কিছু নেই। সব ধরনের পণ্যের আলাদা আলাদা বাজার রয়েছে, কারণ দেশে ইস্পাত পণ্যের চাহিদা আগামী ২০৫০ সাল পর্যন্ত থাকবে।

ট্যাগ »

সর্বশেষ..