নতুন সেতু নির্মাণ হয়ে উঠুক নিখুঁত ও টেকসই

ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব : পলিগঠিত ও সম্ভাব্য কাদার স্তর থাকা নদীতে নির্মীয়মাণ সেতুর নকশা বানানোর সঠিক নিয়ম হলো প্রতিটি পিলারের তলদেশে মাটির গুণাগুণ নির্ণয়ে টেস্ট পাইলিং হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রাথমিক নকশা (ড্রাফট ডিজাইন) এগিয়ে যাবে। সব পিলারে টেস্ট পাইলিং শেষ হলে এ থেকে উদ্ভূত সব রিভিউ ইস্যু সমাধান করার পর মূল নকশা চূড়ান্ত বলে বিবেচ্য হবে। সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ভাষায় এটাকে সম্ভবত ‘বিল্ড ইন ডিজাইন’ বলা হয়। অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় এই যে, পদ্মা সেতুর মতো অত্যন্ত ক্রিটিক্যাল স্থাপনায় এই ডিজাইন প্রক্রিয়া ব্রেক করা হয়েছে।

পদ্মা সেতুতে পিলার মোট ৪২টি। নকশা প্রণয়নে প্রতিটি পিলারের তলদেশে মাটির গুণাগুণ পরীক্ষা করা হয়নি। মাত্র ১১টি পিলারের তলদেশের মাটি পরীক্ষা করে বাকিগুলো তার অনুমানের ভিত্তিতে ধরে প্রণয়ন করা হয় ৪২টি পিলারের মূল নকশা। কিন্তু এই অনুমান সম্পূর্ণ ভুল প্রমাণিত হয়েছে। বাস্তবতা হচ্ছে ১৪টি পিলারের নকশায় বর্ণিত মাটির গুণাগুণের সঙ্গে পদ্মার তলদেশের মাটির বর্তমান অবস্থা মিলছে না। মাওয়ার কাছে ছয় থেকে ১২ ও জাজিরার কাছে ২৬, ২৭, ২৯, ৩০, ৩১, ৩২ ও ৩৫নং পিলারে পাইলের শেষ প্রান্তে বাতার ঠিক ওপরে ৩৮০ থেকে ৪০০ ফুট কাদার স্তর রয়েছে। আরও আটটি পিলারে সম্ভবত নদীস্রোতের বাঁক পরিবর্তনজনিত ভিন্ন জটিলতা পাওয়া গেছে। ফলে মোট ২২টি পিলারের নকশা সংশোধন করতে হচ্ছে।

বিভিন্ন পিলারের তলদেশে মাটির গুণাগুণ আবার পরীক্ষা করতে হচ্ছে। এর বাইরে ইঞ্জিনিয়ারিং ডাইমেনশনের কিছু লোড ভেরিয়েবল টেস্টও নতুন করে করা প্রয়োজন। এই ২২ পিলারের নকশা প্রণয়নের কয়েকটি বিকল্প সামনে রেখে কাজ করছে নির্মাতা ও পরামর্শক প্রতিষ্ঠানগুলো। এর মধ্যে রয়েছেÑ ছয়টি পাইল রেখেই গভীরতা কমিয়ে বা বাড়িয়ে দেখা যায় যে, এতে জাহাজ চলাচলে কতটুকু প্রভাব পড়ে, ফেন্ডার পাইলসহ সাতটি পাইল, ফেন্ডার ছাড়া সাতটি পাইল, স্ক্রিন গ্রাউন্ডিংসহ ছয়টি পাইল এবং আটটি পাইল করা প্রভৃতি।

বিশ্বের কোনো দেশে এত গভীর পিলার ব্রিজ হয়েছে কি না, তাতে সন্দেহ দেখা দিয়েছে। এ অবস্থায় কাদার স্তর থাকা স্থানে ও এই ধরনের ভূগঠনের নদীতে টানেল ব্রিজ না করে পিলার ব্রিজ করার যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

মোটকথা ‘বিল্ড ইন ডিজাইন’-এর অনুপস্থিতি ব্রিজটিকে আরও খরুচে করছে, কেননা বারবার নকশা পরিবর্তন করতে হচ্ছে। এতে ব্রিজটি আসলেই টেকসই হচ্ছে কি না তা নিয়ে বিস্তর সন্দেহ দেখা দিয়েছে। ফলে নির্ধারিত সময়ে ডিসেম্বর ২০১৮-তে তো হচ্ছেই না, বরং বারবার মৌলিক নকশা পরিবর্তনের খেসারতে নির্মাতা প্রতিষ্ঠান আরও ২৩ মাস সময় চেয়েছে এবং তাতে দেখা যাচ্ছে নভেম্বর-ডিসেম্বর ২০২০-এর আগে পদ্মা সেতু উদ্বোধনের কোনো সম্ভাবনাই নেই। ইত্যবসরে সেতুর খরচ তিন দফা বেড়ে ৩০ হাজার কোটি ছাড়িয়েছে। সুবিধামতো স্থানে মাত্র চারটি পিলার করেই ৫২ শতাংশ অর্থ নিয়ে গেছে চায়না মেজর ব্রিজ।

আমার ব্যক্তিগত বিবেচনায় মাত্র চার লেন সেতু দূরদৃষ্টিসম্পন্ন নয়। ১০০ বছরের লাইফ সাইকেলে চার লেইন বাংলাদেশের ছয় দশমিক পাঁচ থেকে সাত শতাংশ ইকোনমিক ও ট্রান্সপোর্ট গ্রোথকে ধারণ করে না। তদুপরি গ্রামীণ অর্থনীতির এলিমেন্টগুলো, হাঁটা, সাইক্লিং, ভারে ও ঠেলায় পণ্য পরিবহন ও ধীর গতির যানবাহনে যাত্রী ও পণ্য পরিবহন, সেতুর মাঝবরাবর মেইনটেন্যান্স স্পট, ট্রাফিক ও স্পিড অ্যালার্ম সেন্টার এবং ডিজিটাল অ্যালার্ম ও স্পিড ডিসপ্লে পোল ও প্যানেলসহ ন্যূনতম ছয় লেনবিশিষ্ট সেতু প্রয়োজন। এতে একেবারে বাইরের লেনটি গ্রামীণ অর্থনীতিকে গ্রো করার অনুষঙ্গ হিসেবে রাখা যাবে, কিংবা যানজটের সময়ে শুধু ট্রাক চলাচলের হার্ড শোল্ডার লেন হিসেবেও ব্যবহার করা যাবে। এছাড়া ভবিষ্যতের সড়কে যাত্রী ও পণ্য পরিবহনের গ্রোথ, রেলপথে যাত্রী ও পণ্য পরিবহনের গ্রোথ ডিজাইনকে বিবেচনায় রেখে সেতুর ডাইমেনশনিং করা হোক। অন্যদিকে ব্রিজের তলদেশে জাহাজ চলাচলের গ্রোথও বিবেচনায় রাখা দরকার। যমুনা সেতুর রেল ইনক্লুসনজনিত ডিজাইন জটিলতা থেকে শিক্ষা নেওয়া দরকার।

উপরন্তু, ভবিষ্যতের চাহিদাকে মাথায় রেখে গ্যাস পাইপলাইন, হাই ভোল্টেজ ইলেকট্রিক পাওয়ার কেব্ল ও হানড্রেড বা থাউজেন্ড কোরের ফাইবার অপটিক কেব্লওয়ে প্রভৃতি সেতুর মূল ডিজাইন ও ডাইমেনশনিংয়ে কতটুকু রাখা হয়েছে, তাও রিচেক করা হোক। যতটুকু জানা গেছে, পদ্মা সেতুর ভূমিকম্প সহনীয়তা বেশ উচ্চ রাখা হয়েছে। এটাই এখন পর্যন্ত একমাত্র ডিজাইন ইনপুট হিসেবে স্বস্তি দিয়েছে।

বাংলাদেশে সেতুগুলো সাধারণ ১৫ থেকে ২৫ কিলো পাউন্ড মাস পার ভেহিকলে ডিজাইন করা হয়, কিন্তু আধুনিক সড়ক ট্রান্সপোর্টেশন এত বেশি মাস পার ভেহিকল লোড বহনে সক্ষম যে এই ২৫ কিপ বা ১১ দশমিক ১৬ টন সক্ষমতা খুবই সেকেলে হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। দেখা যাচ্ছে একটি আধুনিক ভারতীয় টাটা কোম্পানির ট্রাক প্রায় ১৭ টন এবং একটি ডাচ্ ডাফ ট্রাক প্রায় ১৯ টন ভার বহনে সক্ষম (যা ভবিষ্যতে আরও বাড়বে)। এ ট্রাকগুলোর প্রতিটির ওজন প্রায় পাঁচ টন। অর্থাৎ নতুন নির্মিত সেতুকে তার অন্তত অর্ধেক লাইফ সাইকেলে ও লোড ক্যাপাসিটিতে পূর্ণ সচল রাখতে নতুন সেতুগুলোকে অন্তত ৩৫ থেকে ৪০ কিলো পাউন্ড (১৫ থেকে ১৭ টন) মাস পার ভেহিকলে ডিজাইন করা দরকার।

মেঘনা ও গোমতী সেতুর ডিজাইন ও ডাইমেনশনিং ইনপুটে দেওয়া প্রতিটি লোড ভেরিয়েবল ভুল ছিল। ডাইমেনশনিং ফোরকাস্ট এমন একটি নির্দেশক, যার ওপর ভিত্তি করে বলা চলে এই আশির দশকেও বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক উন্নয়নের যে প্রবৃদ্ধি হিসাব করা হয়েছিল, তা চরম ত্রুটিপূর্ণ, তার ওপর ভিত্তি করে নির্মিত অবকাঠামোগুলো লাইফ টাইমের মাত্র এক-চতুর্থাংশে এসে বর্তমানে আউটডেটেড হয়ে যাচ্ছে এবং বর্তমান অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পূর্ণ বিকাশের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। অর্থাৎ ইঞ্জিংনিয়ারিংয়ের সঙ্গে ম্যাক্রো ও মাইক্রো ইকোনমির সমন্বিত ইনটেলেকচুয়ালিটি দিয়ে আমরা দেশের সাসটেইন্যাবল ইকোনমিক পটেনশিয়াল নির্ণয় করতে ব্যর্থ হয়েছি অতীতে। এই ঘাটতি যাতে বর্তমান স্থাপনা নির্মাণে নতুন করে না হয়, সেজন্য পর্যাপ্ত ইনটেলেকচুয়াল স্কোপ তৈরি করা দরকার। আমরা চাই পদ্মা, শীতলক্ষ্যা, মেঘনা ও গোমতীতে নির্মীয়মান নতুন সেতুগুলো কারিগরি ও অর্থনৈতিক চাহিদার ভিত্তিতে নিখুঁত ও টেকসই হোক।

সেতুতে দরকারি ইউটিলিটি ফিচারগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে মূল নকশা প্রণয়ন, সেতুর লাইফ টাইমে ভেহিকল সংখ্যার প্রবৃদ্ধি, ভেহিকল লোড প্রবৃদ্ধি, ভূমিকম্প ও কম্পন সহনীয়তা, সেতুর তলদেশে নৌযান চলাচল প্রবৃদ্ধি, নকশা রিভিউ, রিভিউ বিবেচনা ও খসড়া নকশা পরিমার্জন, বিল্ড ডিজাইন বেজড নির্মাণের ফলোআপ, হ্যান্ডওভারের ক্রাইটেরিয়া ফুলফিলমেন্ট এবং আফটার কেয়ার-বিষয়ক যে অসংখ্য স্থাপনা নির্মাণ এলিমেন্টস আছে, তার সবকিছু বিবেচনায় আনা হোক। কাঁচপুর, মেঘনা, গোমতী ও যমুনা সেতুতে যেসব ডিজাইন ও ট্রাফিক গ্রোথের ক্ষত উঠে এসেছে, সেসবের পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবেচনায় নেওয়া হোক। যেহেতু এমনিতেই সেতুর ডিজাইন বারবার পরিবর্তিত হচ্ছে এবং তাতে সেতু নির্মাণ বিলম্বিত হচ্ছে; তাই আলোচ্য ডিজাইন ইনপুটগুলো রি-অ্যাসেস করে আরও কিছু বেশি সময় নিয়ে হলেও পদ্মা সেতুকে পরিপূর্ণরূপে টেকসই করে তোলা হোক। নির্মিতব্য কাঁচপুর, মেঘনা ও গোমতীর দ্বিতীয় সেতুগুলোতেও একই উচ্চমান প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ করা হোক।

বহু প্রতীক্ষিত স্বপ্নের নতুন সেতুগুলো হয়ে উঠুক নিখুঁত নির্মাণশৈলীর এক একটি ‘স্টেট অব দি আর্ট’ স্থাপনা। যোগাযোগ ও সেতু মন্ত্রণালয় হয়ে উঠুক মানসম্পন্ন অবকাঠামো নির্মাণের গর্বিত অভিভাবক। সেকালের অবকাঠামো খাতে ইনপুট দেওয়ার জ্ঞানস্বল্পতা কাটিয়ে উঠুক একালের প্রজ্ঞা ও প্রযুক্তিভিত্তিক দূরদর্শী নির্মাণগুলো। বাংলাদেশ এগিয়ে যাক।

 

ইনফ্রাস্ট্রাকচার রাইটার ও সাসটেইন্যাবল ডেভেলপমেন্ট অ্যাকটিভিস্ট।

প্রকৌশলী, ইইই, বুয়েট। সিনিয়র সফটওয়্যার সলিউশন আর্কিটেক্ট, ভোডাফোন, নেদারল্যান্ডস

[email protected]