নব্বইয়ের দশকে জহুরুল ইসলাম

ঢাকার পতিত নগর পরিসরে সহসা রাজধানী জেগে ওঠায় আবাসন ও নির্মাণ খাত হয়ে উঠেছিল অনিবার্য। সেই বাতাবরণে জহুরুল ইসলামের সৃজনী পদক্ষেপ ছিল তুরুপের তাস। ক্ষুদ্র ঠিকাদারি দিয়ে শুরু। দেশের সীমানা মাড়িয়ে বিদেশ-বিভুঁইয়ে তিনি গড়েছেন আকাশচুম্বী অট্টালিকা, সড়ক-মহাসড়ক, কল-কারখানা; এমনকি দেশের আঙিনায় বুলন্দ করেছেন বিদেশি বড়-প্রসিদ্ধ বাণিজ্যিক ও শৌখিন গাড়ির সমৃদ্ধি। রাজধানী ঢাকার নির্মাণ, আবাসন ও বিস্তৃতির বিবর্তনিক ইতিহাসের ধারাক্রমে জহুরুল ইসলাম তাই এক অবিচ্ছেদ্য প্রাসঙ্গিকতা। পর্ব-৪৪

মিজানুর রহমান শেলী: নব্বইয়ের দশকেও জহুরুল ইসলামের ব্যবসা চলেছে দুর্দান্ত গতিতে। এ সময়ে বিডিসির সাফল্য এগিয়ে চলে। জহুরুল ইসলাম এ সময়ে তার জীবনের শেষ পাদপ্রান্তে পৌঁছে যান। এই দশকের মধ্য ভাগ পর্যন্ত তার কর্মব্যস্ত জীবনে তিনি তার সমগ্র ব্যবসায় সাম্র্রাজ্যকে আগলে ধরে রাখতে সক্ষম হন। এমনকি নিয়ত ধারায় তিনি তার ব্যবসার গতি পরিধি বাড়িয়ে তুলেছেন। আগের মতোই রাস্তা, সেতু ও ভবন নির্মাণ প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছেন। তবে এই দশকে জহুরুল ইসলাম কিছু বিশেষায়িত ইঞ্জিনিয়ারিং প্রকল্পে ভবন নির্মাণ করেন। এগুলোর মধ্যে ১. চট্টগ্রামে প্রিভেন্টিভ মেইনটেন্যান্স ট্রেনিং সেন্টার, ২. ঈশ্বরদীর বাংলাদেশ রেলওয়ের আওতাধীন ওয়ার্কশপ ট্রেনিং ইউনিট অ্যান্ড হোস্টেল, ৩. উপকূলীয় সাইক্লোন শেল্টার সেন্টার। এর পাশাপাশি মহাসড়ক নির্মাণের কাজও তিনি চালিয়েছেন জীবনের শেষ সময়ে। তিনি ৩৩ কিলোমিটার ন্যাশনাল হাইওয়ে পীরগঞ্জ-রংপুর সেকশনের নির্মাণ সম্পন্ন করেন। তাছাড়া রংপুর-সৈয়দপুর ৩৪ কিলোমিটার ন্যাশনাল হাইওয়ে, ১০ কিলোমিটার সৈয়দপুর বাইপাস, দাসুরিয়া-নাটোর সেকশনে ৪১ কিলোমিটার হাইওয়ে এবং এর সঙ্গে সেতু বক্স কালভার্ট, পাইপ কালভার্ট, রাস্তা সংস্করণ, বাস বেই নির্মাণকাজ সম্পন্ন করেন। দাসুরিয়া-নাটোর সেকশনে ৪১ কিলোমিটার হাইওয়ে এবং এর সঙ্গে সেতু বক্স কালভার্ট, পাইপ কালভার্ট, রাস্তা সংস্করণ, বাস বেই নির্মাণ কাজটি ছিল আরআরএমপি, আরএইচডির আওতাধীন এবং তত্ত্বাবধায়ক ছিল কন্সালট্যান্ট লুইস বার্গার ইনক, ইউএসএ ও এসএমইসি, অস্ট্রেলীয় ব্রিজ। বক্স কালভার্ট, পাইপ কালভার্ট, বাস বেইগুলোর অর্থায়নে ছিল আইডিএ।
এদিকে জহুরুল ইসলাম বিডিসি রাস্তা সংস্কারকাজেও হাত দিয়েছেন। সৈয়দপুর-বেলডাঙ্গা ৮৯ কিলোমিটার রাস্তা পেভমেন্ট সংস্কারের কাজটি তিনি সম্পন্ন করেন। রংপুর বাইপাস, পলাশবাড়ী-গাইবান্ধা রোড, রংপুর-কুড়িগ্রাম রোড, পলাশবাড়ী-গাইবান্ধা রোড এবং রংপুর-কুড়িগ্রাম রোড ছিল আরএইচডি ও আরআরএমপির এইডিএ অর্থায়নে। এগুলোর নির্মাণকাজ তিনি সম্পন্ন করেন। পতেঙ্গা সমুদ্রসৈকতে পাঁচ কিলোমিটার উপকূলীয় বাঁধ ও হাইড্রোলিক স্ট্রাকচার, আগারগাঁওয়ে এলজিইডির হেডকোয়ার্টার, নগর ভবনের (ডিসিসি) ১৫ তলা হেডকোয়ার্টার ফুলবাড়িয়া যা দেশের অন্যতম প্রেস্টিজিয়াস স্থাপত্য আভিজাত্য, মিরপুরে গ্রামীণ ব্যাংকের ২৩ তলা ভবন, মিলিটারি ইঞ্জিনিয়ারিং সার্ভিসের আওতায় ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে ১৫ তলা মেরিন ওএরএস কোয়ার্টার, চাঁদনীঘাট ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্লান্টের আরসিসি ইনটেক স্ট্রাকচার, হসপিটাল পর্যন্ত তিন কিলোমিটার বন্যা রক্ষা বাঁধ, ডিইউটিপির আওতাধীন মিরপুর থেকে তালতলা পর্যন্ত রাস্তা প্রশস্তকরণ ও সংস্কার, সায়েদাবাদের ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্লান্ট, পাকশী সেতুর পূর্ব সংযোগ রোড, ছাতকে সুরমা সিমেন্ট ফ্যাক্টরির লাফারেজ ল্যান্ড ডেভেলপমেন্ট ওয়ার্ক ও সামহোয়ান করপোরেশন কোরিয়ার আওতাধীন বঙ্গবন্ধু রেলওয়ে লিঙ্ক প্রকল্পের ভূমি ও অবকাঠামো-সংশ্লিষ্ট কার্যক্রমও চালায় বিডিসি।
১৯৮৯ সালে তিনি জহুরুল ইসলাম মেডিক্যাল কলেজের কাজ শুরু করেন। এটা ছিল আফতাব-রহিমা ওয়েলফেয়ার ট্রাস্টের আওতাধীন। ২৫০ বেড নিয়ে এর যাত্রা শুরু হয়। অবশেষে পরবর্তী সময়ে নব্বইয়ের দশকে এসে আধুনিক যন্ত্রপাতি, রাউন্ড দ্য ক্লক সার্ভিস, আউটডোর ও ইনডোরের ইমার্জেন্সি সার্ভিস চালু করা হয়। এই নব্বইয়ের দশকের শুরুতেই এটার বেড সংখ্যা বাড়িয়ে ৫০০তে উন্নীত করা হয়। হাসপাতালটিকে জেনারেল টার্সিয়ারি লেভেলের প্রশিক্ষণ হাসপাতালে পরিণত করা হয়। মেডিসিন, সার্জিক্যাল ও জরুরি সব বিভাগকেই মানসম্মত অবস্থায় পৌঁছানো সম্ভব হয়। এই হাসপাতালের একটি বিশেষত্ব হলো, ভাগলপুরের মধ্যে একটি গ্রাম্য পরিপ্রেক্ষিত। এই গ্রাম্য পরিবেশটা ছিল একটি মেডিক্যাল কলেজের জন্য আদর্শ স্থান। একটি বিশাল হাসপাতাল, আধুনিক যন্ত্রপাতিতে সজ্জিত এর সেবা ব্যবস্থা, চমৎকার অবকাঠামো ও প্রাতিষ্ঠানিক সুবিধাদি দিয়ে অবশেষে জহুরুল ইসলাম গড়ে তুললেন একটি পূর্ণাঙ্গ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল। নাম দিলেন জহুরুল ইসলাম মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতাল। ১৯৯২ সালেই প্রতিষ্ঠানটি পূর্ণাঙ্গতা পেয়েছিল। এর প্রাকৃতিক সৌন্দর্য শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য যেমন আরামদায়ক, তেমনি এখানকার শিক্ষার্থীদের পড়ালেখা ও গবেষণার জন্য সহায়ক। প্রতিষ্ঠানটি ক্যান্টিন ও আবাসন সুবিধাদি চমৎকার। রোগী ও তার অভিভাবকদের সঙ্গে হাসপাতালের সংশ্লিষ্ট সবার রয়েছে সৌহার্দ্য সম্পর্ক। ১৯৯২ সালের ২৬ আগস্ট জহুরুল ইসলাম মেডিক্যাল কলেজ একটি পূর্ণাঙ্গ আবাসিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়।
১৯৯৪ সালে তার একটি বড় অর্জন হলো, ঢাকার স্টক এক্সচেঞ্জ ইস্টার্ন হাউজিংয়ের তালিকাবদ্ধ হওয়া। এটাই ছিল বাংলাদেশের একমাত্র স্টক এক্সচেঞ্জ পাবলিকলি লিস্টেড রিয়েল স্টেট কোম্পানি। অবশেষে ১৯৯৫ সালের ১৮ অক্টোবর সিঙ্গাপুরে জহুরুল ইসলামের মৃত্যু হয়। ভাগলপুর গ্রামে তার জš§ভূমিতেই তাকে সমাধিস্থ করা হয়। ইসলাম গ্রুপে জহুরুল ইসলামের চেয়ারম্যানশিপের সফল পরিসমাপ্তি ঘটে।
জহুরুল ইসলামের মৃত্যুর পরে ইসলাম গ্রুপ তিন ভাগে ভাগ হলো। নাভানা গ্রুপ, আফতাব গ্রুপ ও ইসলাম গ্রুপ নামে। ১৯৯৬ সালে নাভানা গ্রুপ প্রতিষ্ঠা হলো। এই গ্রুপের অধিকারী হলেন জহুরুল ইসলামের ছোট ভাই শফিউল ইসলাম কামাল। তিনি গ্রুপটির চেয়ারম্যান হলেন। এ বছরেই তিনি তিনটি লিমিটেড কোম্পানিকে নিজের আয়ত্তে নিয়ে আসেন। এগুলো হলোÑনাভানা রিয়েল এস্টেট লিমিটেড, নাভানা কনস্ট্রাকশন লিমিটেড ও নাভানা বিল্ডিং প্রডাক্ট লিমিটেড। এরপর নাভানা গ্রুপ প্রতিষ্ঠা করে নাভানা ইন্টারলিংকস কিলোমিটার।
একই সময় প্রতিষ্ঠা হলো আফতাব গ্রুপ। এই গ্রুপের চেয়ারমেন হলেন জহুরুল ইসলামের অপর ছোট ভাই ইফতেখারুল ইসলাম। ইফতেখারুল ইসলাম একই সঙ্গে এই গ্রুপের ম্যানেজিং ডিরেক্টর। বর্তমানে আফতাব গ্রুপ দেশের একটি নেতৃত্বস্থানীয় গ্রুপ অব কোম্পানি। এর ব্যবসা রয়েছে ব্যাংক, টেক্সটাইল, খাদ্য, তৈরি পোশাক, কৃষি, কম্প্রেস ন্যাচারাল গ্যাস এবং ইন্ডাস্ট্রিয়াল পাম্প ম্যানুফ্যাকচারিংসহ আরও অনেক কিছু। এমনকি আমেরিকার নিউইয়র্ক শহরে এর রয়েছে রিয়েল এস্টেট ব্যবসা। এসব খাতেই রয়েছে তাদের সফলতার গল্প। দেশের বাইরের ব্যবসা কর্মকাণ্ডের মধ্যে এদের রয়েছে আলিব গ্রুপের কর্মযজ্ঞ। নিউইয়র্কের রিয়েল এস্টেট ব্যবসা এই গ্রুপের তত্ত্বাবধায়নে পরিচালিত হচ্ছে। ১৯৯৫ সাল থেকে এ প্রতিষ্ঠানটি সেখানে আবাসন খাতে লগ্নি শুরু করে। যুক্তরাজ্য, দক্ষিণ আফ্রিকা, ব্রাজিল, দুবাই, ভারত, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর ও চীনে রয়েছে এই আলিব গ্রুপের আন্তর্জাতিক ব্যবসায় কার্যক্রম। এদিকে আফতাব গ্রুপই উত্তরা ব্যাংকের সর্বোচ্চ শেয়ারহোল্ডার।
জহুরুল ইসলামের ইসলাম গ্রুপটি ছিল অনেকটা পারিবারিক ব্যবসা। তিনি তার ব্যবসায় কার্যক্রমে একের পর এক সফলতা পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে নিজের ভাইদেরও সংযুক্ত করতে থাকেন। ফলে ভাইদের অবদান এই গ্রুপে ধীরে ধীরে অংশীদারিত্বে পরিণত হয়। জহুরুল ইসলামের মৃত্যুর পরে ভাইরা তাদের অংশ নিয়ে পৃথক ব্যবসায় অবকাঠামো গড়ে তোলেন এবং নিজ নিজ জায়গা থেকে তারা সফলতা পেয়ে চলেছেন। স্বভাবত তারা জহুরুল ইসলামের আদর্শ আর দেখানো পথেই সামনের দিকে এগিয়ে চলেছেন। এই পথচলায় সব সময়ই জহুরুল ইসলাম তাদের সঙ্গে ছায়ার মতো অবস্থান করছেন। ইসলাম গ্রুপের বাদবাকি অংশ নিয়ে টিকে আছে ছেলে মাঞ্জুরুল ইসলামের নেতৃত্বে।
মাঞ্জুরুল ইসলাম ১৯৯৩ সালে ইস্টার্ন হাউজিং লিমিটেডে যোগ দেন। এরপর ১৯৯৫ সালে তিনি এর চেয়ারম্যান হয়েছেন। এখন পর্যন্ত তিনি এই পদে থেকে কাজ করে যাচ্ছেন। তিনি আফতাব বহুমুখী ফার্মস লিমিটেড, আফতাব ফিড প্রডাক্টস লিমিটেড, আফতাব হ্যাচারি লিমিটেড, আফতাব জিপি ফার্মস লিমিটেড, বিডিসি লিমিটেড, নাভানা ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেড, নাভানা হেলথ কেয়ার লিমিটেড, জহুরুল ইসলাম মেডিক্যাল কলেজ, ইসলাম ব্রাদার্স প্রপার্টিজ লিমিটেডেরও চেয়ারম্যান পদে আছেন। তাছাড়া তিনি লাফার্জ সুরমা সিমেন্ট লিমিটেডের ডিরেক্টর হিসেবেও আছেন।
এভাবে জহুরুল ইসলামের সাজানো ব্যবসায় কাঠামো দিন দিন বিস্তৃতি লাভ করছে। সবখানেই রয়েছে তাদের সাফল্যের গল্প। আবাসন ও নির্মাণ খাতকে ছাপিয়ে তারা এখন আরও অনেক শাখায় প্রসিদ্ধি লাভ করেছে। তবুও আবাসন খাতে তাদের ভবিষ্যৎ ব্যবসায় পরিকাঠামো অপ্রতিদ্বন্দ্বী ও সম্ভাবনাময় বলে মনে হয়।

লেখক: গবেষক, শেয়ার বিজ