দিনের খবর সারা বাংলা

নরসিংদীতে চলছে অবাধে টিলা কাটা

শরীফ ইকবাল রাসেল, নরসিংদী: নরসিংদীর শিবপুরে রাতের আঁধারে অবাধে কাটা হচ্ছে টিলা। ফলে ধ্বংস হচ্ছে প্রাকৃতিক পরিবেশ। শিবপুরের বাঘাব এলাকায় এর মাত্রা সবচেয়ে বেশি। রাতের আঁধারে এসব মাটি কেটে বিক্রি করা হচ্ছে বিভিন্ন সিরামিক কারখানায়। এতে পরিবেশ ঝুঁকিতে পড়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে।
জানা যায়, উপজেলার বাঘাব, জয়নগর, চক্রধা ও যশোর এ চারটি ইউনিয়নেই টিলাগুলোর অবস্থান। বাঘাব ইউনিয়নে টিলা আছে প্রায় ২৫০টি। শিবপুর উপজেলায় টিলার সংখ্যা সহস্রাধিক। এগুলোর বেশির ভাগের উচ্চতা ২০-৪০ ফুট। গত এক বছরে শুধু বাঘাব ইউনিয়নেই কাটা গেছে পাঁচটির মতো টিলা।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, ভেকু (মাটি কাটার যন্ত্র) মেশিন দিয়ে সন্ধ্যা থেকে ভোর পর্যন্ত চলে এসব টিলা কাটা। এসব টিলার মাটি বিভিন্ন সিরামিক কারখানায় সরবরাহ করা হয়ে থাকে। এর পাশাপাশি কিছু মাটি ব্যবহার করা হচ্ছে নিচু এলাকা ভরাটের কাজেও। মাঝে মধ্যে পুলিশ আসতে দেখা যায় আবার কোনো ব্যবস্থা না নিয়েই চলে যায়। প্রতি রাতেই ১০-১২টি ট্রাকে ভরে এসব টিলার লালমাটি বিভিন্ন স্থানে সরবরাহ করা হয়। যেভাবে টিলা কাটা শুরু হয়েছে তাতে আগামী ৫ বছরের মধ্যে শিবপুরের সব টিলাই কাটা হয়ে যাবে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, টিলাগুলোর লালমাটি সিরামিক কারখানাগুলোতে ওয়াল টাইলস তৈরিতে ব্যবহার করা হয়। এলাকার কিছু লোকজন নিজেদের ব্যক্তি মালিকানাধীন টিলা কাটতে শুরু করেছেন। একটা টিলায় হাজার হাজার ট্রাক মাটি পাওয়া যায়। ভ্যাকু ও ট্রাকভাড়া বাদে ট্রাকপ্রতি লালমাটি বিক্রি হয় ৭০০ থেকে ৮০০ টাকায়। আর ড্রাম ট্রাকপ্রতি তিন হাজার ৫০০ টাকা। এ ব্যবসায় টিলার প্রকৃত মালিক পায় ট্রাকপ্রতি মাত্র ১০০ টাকা আর ড্রাম ট্রাকপ্রতি ৫০০ টাকা করে। প্রতিটি ড্রাম ট্রাকে ৩০ থেকে ৪০ টন মাটি ধরে। একটি টিলা কাটা হলে তার পাশের টিলাটিও আস্তে আস্তে ধসে পড়ার ঝুঁকিতে থাকে।
একই এলাকার প্রায় ১৫ বিঘা আয়তন ও ২০ থেকে ৩৫ ফুট উঁচু একটি টিলার প্রায় ৮০ ভাগ কেটে ফেলা হয়েছে। এ টিলার মালিক নওয়াব আলী ভূঁইয়া। তার বংশধররা এ টিলার উঁচু টিলায় থাকতে চান না বলে এটি কেটে ফেলা হচ্ছে। টিলার যে অংশ এখনও কাটা হয়নি শুধু সেখানেই রয়েছে ১৭টি ঘর। এছাড়াও আছে দুটি মুরগির খামারও। টিলার ওপরেই পল্লী বিদ্যুতের খুঁটি ছিল বলে এর নিচের অংশটুকু কাটা সম্ভব হয়নি। বিগত চার-পাঁচ মাস ধরে কাটা হচ্ছে টিলাটি।
এ বিষয়ে নরসিংদীর পরিবেশ আন্দোলনের সভাপতি মঈনুল ইসলাম জানান, প্রাকৃতিকভাবে পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রেখে যাচ্ছে যে পাহাড়-টিলা, সেগুলোকে নির্বিচারে ধ্বংশ করে আমরাই পরিবেশকে বিপর্যয়ের দিকে নিয়ে যাচ্ছি। যখনই গণমাধ্যমে এসব নিয়ে সংবাদ প্রকাশ হয় তখনই প্রশাসনের একটু তৎপড়তা লক্ষ্য করা যায়। কিন্তু স্থায়ীভাবে এসব বন্ধের দৃশ্যমান কোনো উদ্যোগ প্রশাসনের পক্ষ থেকে চোখে পড়ে না।
সম্প্রতি জেলা প্রশাসনের মাসিক আইনশৃঙ্খলা সভায় শিবপুর উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক জেলা প্রশাসকের দৃষ্টি আকর্ষণ করে জানান, শিবপুরের টিলাগুলো অবাধে কেটে নিয়ে এর অধিকাংশই বিক্রি হচ্ছে সাবেক সংসদ সদস্য সিরাজুল ইসলাম মোল্লার মালিকানাধীন চায়না বাংলা সিরামিক কোম্পানিতে। এছাড়া আরএকে সিরামিকস, গ্রেটওয়াল সিরামিকস, মীর সিরামিকস, ঢাকা-সাংহাই সিরামিক ও সিলেটের হার্ডল্যান্ড সিরামিকসহ বিভিন্ন সিরামিক কারখানায় এসকল লাল মাটি চলে যাচ্ছে। তাই এ বিষয়ে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার পরামর্শও দেন তিনি।
চায়না বাংলা সিরামিক কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সাবেক সংসদ সদস্য সিরাজুল ইসলাম মোল্লা জানান, এলাকার লোকজন মসজিদ নির্মাণের জন্য টিলাটি কেটে ফেলছেন। তিনি শুধু এ টিলার মাটিগুলো কিনেছেন। তিনি না কিনলে অন্য কেউ এ মাটি কিনে নিত।
নরসিংদীর পরিবেশ অধিদফতরের উপপরিচালক মুহাম্মদ হাফিজুর রহমান জানান, পরিবেশ সংরক্ষণ আইন অনুযায়ী, সরকারি-বেসরকারি ও ব্যক্তি মালিকানাধীন কাজে পাহাড়-টিলা কাটার কোনো সুযোগ নেই। এটি অবশ্যই দণ্ডনীয় অপরাধ। পাহাড়-টিলা কর্তনকারীদের পাশাপাশি যারা এসব মাটি ক্রয় করছেন তাদের চিহ্নিত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা হুমায়ুন কবীর জানান, অধিকাংশ টিলা ব্যক্তি মালিকানাধীন হওয়ায় বিভিন্ন অজুহাতে এসব কেটে ফেলার আগ্রহ দেখায় মালিকরা। এ প্রাকৃতিক সম্পদ রক্ষায় সচেতনতার বিকল্প নেই।
নরসিংদী-৩ (শিবপুর) আসনের সংসদ সদস্য জহিরুল হক ভূঁইয়া মোহন জানান, টিলা কাটার খবরে তিনিও উদ্বিগ্ন। আইনের তোয়াক্কা না করে যারা পরিবেশের বিপর্যয় ঘটাচ্ছেন তাদের ছাড় দেওয়া যায় না। জনস্বার্থ বিবেচনা না করে টিলা কাটার এসব লালমাটি একজন সাবেক সংসদ সদস্যের সিরামিক কারখানায় যাচ্ছে, এ বিষয়টি মেনে নিতেও খুব কষ্ট হয়।

 

সর্বশেষ..



/* ]]> */