নাটোরে জনপ্রিয় ড্রাগন

তাপস কুমার: শুধু সুস্বাদুই নয়, গুণবিচারেও অনন্য ড্রাগন। ক্যালরি কম থাকায় ডায়াবেটিস ও হার্টের রোগীরা অনায়াসে এ ফল খেতে পারেন। ড্রাগন রক্তের গ্লুকোজ নিয়ন্ত্রণ করে বলে এটি ডায়াবেটিস প্রতিরোধ করে। কোলেস্টেরল ও উচ্চ রক্তচাপও নিয়ন্ত্রণ করে ফলটি। আয়রনের উৎস হিসেবে ড্রাগন রক্তশূন্যতা দূর করে। ক্যালসিয়াম ও ফসফরাসে ভরপুর বলে হাড় ও দেহের গঠনে ভূমিকা রাখে। ভিটামিন ‘এ’ ও ‘বি’ সমৃদ্ধ হওয়ায় স্নায়ুতন্ত্র ও দৃষ্টিশক্তির উপকার করে ড্রাগন। সর্বোপরি অ্যান্টিঅক্সিডেন্টের ভাণ্ডার হিসেবে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধিতে সহায়ক। এই ফলে কীটনাশকের ব্যবহার নেই বলে পুষ্টিগুণও থাকে অটুট।

নাটোরে এ ফলের চাষ জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। অধিক মুনাফায় প্রতিষ্ঠিত ফলচাষিরা ড্রাগন ফলের বাগান তৈরি ও এর পরিধি বাড়াতে তৎপর হয়েছেন। মানোন্নয়নে চলছে গবেষণা। নাটোরে উৎপাদিত ফল ও গাছের চারা যাচ্ছে সারা দেশে। এখানে বেড়াতে আসা দর্শনার্থীরা ড্রাগনের নজরকাড়া ফুল ও ফল দেখতে বাগানে ভিড় করেন।

২০০৩ সালে দেশের প্রখ্যাত ফল গবেষক ও উদ্ভাবক এসএম কামরুজ্জামানের তত্তাবধানে নাটোরের মডার্ন হর্টিকালচার সেন্টারে থাইল্যান্ড থেকে আনা ড্রাগনের প্রথম অভিষেক ঘটে। অজানা এ গাছের ফল পেতে প্রায় তিন বছর অপেক্ষা করতে হয়েছিল। দেশে ড্রাগন চাষ, সম্প্রসারণ ও চাষাবাদ কৌশল জানতে ২০০৯ সালে কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরীর নির্দেশনায় মন্ত্রণালয় তদানীন্তন বড়াইগ্রাম উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা এসএম কামরুজ্জামানকে এক সপ্তাহের জন্য ভিয়েতনাম পাঠানো হয়। ভিয়েতনামের অন্যতম জনপ্রিয় ফল ড্রাগন চাষে প্রসিদ্ধ হো চি মিন এলাকার কৃষকের কাছ থেকে ড্রাগন চাষের প্রায় সবকিছু রপ্ত করতে পেরেছিলেন কৃতী এই কৃষি কর্মকর্তা।

বর্তমানে মডার্ন হর্টিকালচার সেন্টারে থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম, শ্রীলঙ্কা ও চীন থেকে আনা বিভিন্ন জাত ছাড়াও উদ্ভাবিত ১২ জাতের দুই হাজার গাছে লাল, সাদা, গোলাপি, হলুদ ও মাল্টিকালার এ পাঁচ রঙের ড্রাগন ফল চাষ হচ্ছে। উৎপাদিত ড্রাগন যাচ্ছে রাজধানীর কারওয়ান বাজার ও শ্যামবাজারে। এসব বাজার থেকে পাঁচতারকা হোটেল, অভিজাত ডিপার্টমেন্টাল স্টোর ও সারা দেশে।

এসএম কামরুজ্জামান বলেন, মৌমাছি নিশাচর না হলেও জ্যোৎস্না রাতে ড্রাগন ফুল ফুটলে এর মনোরম সুবাসে ঝাঁকে ঝাঁকে মৌমাছির আগমনে অপরূপ হয় পরিবেশ, ঘটে পরাগায়ন। বিষয়টি বিস্ময় জাগানিয়া। পুরুষ বন্ধ্যা গাছের সঙ্গে বিভিন্ন স্ত্রী গাছের রেণুর পরাগায়ন ঘটিয়ে নতুন জাত উদ্ভাবন করা সম্ভব বলে জানান তিনি। এসএম কামরুজ্জামান আরও বলেন, এদেশের আবহাওয়া ড্রাগন চাষের উপযোগী হলেও বৃষ্টি ও ১২ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচের তাপমাত্রায় ফলের আকার ছোট হয়ে যায়। ফল বড় করা ও সংগ্রহের সর্বশেষ সময়কে দীর্ঘায়িত করে অন্তত জানুয়ারি পর্যন্ত বর্ধিত করার কাজ করছি আমরা।

ড্রাগন গাছ মূল আর কাণ্ডে বিভক্ত, পাতা নেই। সবুজ কাণ্ড থেকে বের হয় অসংখ্য কাণ্ড। অনেকটা ক্যাকটাসের মতো দেখতে এসব কাণ্ড থেকে বের হয় কলি। আর কলি থেকে সাত থেকে ১০ দিনের মাথায় ফোটে নাইট কুইনের মতো অত্যন্ত আকর্ষণীয় ফুল। সুন্দর এই ফুল থেকে ফলের পূর্ণতা পেতে সময়ের প্রয়োজন এক মাস।

ড্রাগন গাছ দাঁড়িয়ে রাখতে প্রয়োজন ছয়-সাত ফুট উঁচু কংক্রিটের খুঁটি। একটি খুঁটিকে কেন্দ্র করে দাঁড়িয়ে থাকে চারটা গাছ। পরিচর্যায় প্রয়োজন নিড়ানি ও সামান্য সেচ। গাছের মূল খাবার হিসেবে প্রয়োজন শুকনো গোবর। গাছ থেকে ফল সংগ্রহের পর এক মুঠো করে টিএসপি আর পটাশ দিলে ভালো ফল পাওয়া যায়।

খুব সহজেই কাণ্ডের অংশ কেটে তৈরি করা হয় ড্রাগন চারা। মাত্র ছয় মাসের মধ্যে গাছে ফুল পাওয়া সম্ভব। সাধারণত মে থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত ছয়বার ফুল থেকে ফল ধরে। একটা গাছে বছরে অন্তত পাঁচ কেজি ফল পাওয়া যায়।

বাইপাসে সিটি কলেজ সংলগ্ন সোহাগ-সোহান নার্সারির স্বত্বাধিকারী জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত কৃষক আলফাজুল আলম বলেন, ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে শুধু ফল নয়, যাচ্ছে ড্রাগন চারাও। শহরের মধ্যে নার্সারি হওয়ায় মৌসুমের প্রায় প্রতিদিন দর্শনার্থীরা ড্রাগন বাগান বা ফল দেখতে আসেন। দেশি-বিদেশি দর্শনার্থীর পদচারণায় মুখর হয়ে ওঠে তার নার্সারি।

বাজারমূল্য ও চাহিদা বিবেচনায় অত্যন্ত লাভজনক হওয়ায় শহরতলির মাঝদিঘাতে ৪০ একরের মৎস্য ও কৃষি খামারের অন্য ফলবাগানকে ড্রাগন বাগানে রূপান্তর করা হয়েছে। এখানে ২৫ বিঘা জমির ওপর ড্রাগন খামার দেশে মধ্যে সর্ববৃহৎ বলে দাবি করেন খামারের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. গোলাম নবী। দেশের বৃহত্তম এ ড্রাগন খামার দেখতে আসছেন অসংখ্য দর্শনার্থী।

মৎস্য ও আদর্শ ফলচাষি গোলাম নবী জানান, খামারে ১৬ হাজার ড্রাগন গাছে চলতি মৌসুমে অন্তত ৮০ টন ফল পাওয়া যাবে। উৎপাদিত ফল স্থানীয় বাজার ছাড়াও ঢাকা, সিলেট, খুলনা, ময়মনসিংহে পাঠানো হচ্ছে। ভবিষ্যতে খামারের পরিধি আরও বৃদ্ধির পরিকল্পনার কথা জানালেন তিনি। ফলচাষি সেলিম রেজা আহম্মদপুরে দুই একর জমিতে ড্রাগন চাষ করেছেন।

নাটোর কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের উপপরিচালক মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, পুষ্টিমান ও আর্থিক দিক বিবেচনায় ড্রাগন অগ্রগামী এবং অপার সম্ভাবনাময় ফল। তাই এখানে ড্রাগন চাষের পরিধি ক্রমশ বাড়ছে। নাটোর হর্টিকালচার সেন্টারের উপপরিচালক স.ম. মেফতাহুল বারি আশা করেন, নাটোরের মতো ড্রাগন ছড়িয়ে পড়বে সারা দেশে আর এতে ফলটি হয়ে উঠবে বেশ জনপ্রিয়।

নাটোর