‘নারীদের জন্য আলাদা যানবাহনের ব্যবস্থা করা দরকার’

পোশাকশিল্পী ও ডিজাইনার লিপি খন্দকার। বিবিআনা ফ্যাশন হাউজের কর্ণধার তিনি। সম্প্রতি এক আলাপনে বিবিআনা ও দেশের ফ্যাশনশিল্প সম্পর্কে তার ভাবনা জানার চেষ্টা করেছেন হাসান সাইদুল

আপনার শৈশব সম্পর্কে জানতে চাই…

লিপি খন্দকার: আমার শৈশব কেটেছে পুরান ঢাকায়। আমরা পাঁচ বোন দুই ভাই। বাবা ছিলেন ব্যবসায়ী, মা গৃহিণী। লেখাপড়া ঢাকায়। মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শেষ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে চারুকলায় পেইন্টিং বিভাগ থেকে গ্র্যাজুয়েশন করি। পরে এনআইডি থেকে পোস্ট গ্র্যাজুয়েশন সম্পন্ন করি।

আপনার প্রতিষ্ঠিত ফ্যাশন হাউজ বিবিআনার বর্তমান অবস্থা কেমন…

লিপি খন্দকার: বিশেষ দিন এলে তুলনামূলক ভালো বিক্রি হয়। তখন ভিড় থাকে সব ফ্যাশন হাউজেই। বর্তমানে আমাদের দেশে গার্মেন্টশিল্পে একটু মন্দা সময় যাচ্ছে। আমার বেলায়ও। তবে সব মিলিয়ে ভালোই চলছে বলতে পারেন।

উদ্যোক্তা হয়ে ওঠার গল্পটা শুনতে চাই

লিপি খন্দকার: ১৯৯২ সালে আড়ংয়ে ডিজাইনার হিসেবে কাজ করেছি। এর মাঝে আমার বড় ছেলের জন্ম হয়। ২০০০ সালে আড়ংয়ের চাকরি ছেড়ে দিই। এর তিন দিনের মাথায় মনে হলো আমি বসে থাকতে পারব না। নিজের কিছু করতে হবে সিদ্ধান্ত নিলাম। বাসায় বসে কাজে হাত দিই। শুরু করলাম ডিজাইন, সেলাই। এভাবে তিন মাসে অনেক কাপড় জমে গেল। আমার স্বজন ও বন্ধুরা উৎসাহ দিলেন শোরুম খোলার জন্য। আত্মবিশ্বাস ছিল আমার কাপড় বিক্রি হবে। যখন বাসায় কাপড় ডিজাইন করতাম, আশেপাশের সবাই কাপড় কেড়ে নিতেন। এ বিশ্বাস থেকেই ২০০১ সালে ধানমন্ডি ৫-এ প্রথম ‘বিবিয়ানা’ শোরুমটি চালু করি। এই শোরুম খোলার পেছনে যাদের অবদান না বললেই নয়, তারা হলেন আমার প্রডিউসাররা। তারা বাকিতে কাপড় ও সেলাই করে দিতেন। তারা বলতেনÑআপনার বিক্রি হলে আমাদের টাকা দেবেন। সঙ্গে আমার স্বামী অনেক সহযোগিতা করেছেন। অনেকটা টানাপড়েনের মধ্যে ‘বিবিআনার’ যাত্রা শুরু। শুরুতেই ভালো সাড়া পাই। বর্তমানে বিবিআনার ১১টি শোরুম আছে। ঢাকাসহ চট্টগ্রাম এবং সিলেটেও শোরুম আছে।

জীবনের প্রথম উপার্জন কত এবং কীভাবে খরচ করেছিলেন?

লিপি খন্দকার: আড়ংয়ের প্রথম মাসের বেতন ছিল চার হাজার টাকা, যা আমার প্রথম উপার্জন। বাসায় মিষ্টি নিয়ে গিয়েছিলাম।

বাংলাদেশের ফ্যাশনশিল্প আন্তর্জাতিক অঙ্গনেকোন অবস্থানে?

লিপি খন্দকার: আমাদের দেশের হাউজগুলোর আন্তর্জাতিক মানের কাজ করার ক্ষমতা রয়েছে। তবে খুব যে ভালো করতে পারছে তা বলব না; কারণ এতে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা দরকার। এখন তো দেশীয় শিল্প ধ্বংস হওয়ার পথে। পাকিস্তানি ও ভারতীয় পণ্যে দেশ সয়লাব হয়ে গেছে। এতে দেশি তাঁতিরা মার খাচ্ছেন।

বাংলাদেশের ফ্যাশনশিল্পে কী অভাব রয়েছে বলে মনে করেন?

লিপি খন্দকার: আমাদের ফ্যাশনশিল্প অনেক এগিয়ে যেত। আমাদের এই ছোট মার্কেটের যা অবস্থান ছিল, তা নষ্ট হচ্ছে বিদেশি পণ্য আসায়। এই তো পাঁচ বছর আগেও আমাদের এ সেক্টরটি রমরমা ছিল। কিন্তু হঠাৎ বিদেশি কাপড় আসায় এখন অনেকে এ ব্যবসা বন্ধ করতে বাধ্য হচ্ছেন। অনেকে ইতোমধ্যে পেশা পরিবর্তনও করে ফেলেছেন। এটা আমাদের জন্য ক্ষতিকর।

ফ্যাশন হাউজগুলোর একটা নিজস্বতা আছে কি?

লিপি খন্দকার: অবশ্যই। কিছু ফ্যাশন হাউজ পশ্চিমা প্রভাবে প্রভাবিত। তবে নিজস্বতা না থাকলে যতই তারা জাতীয় আলোচনার কেন্দ্রতে আসুক না কেন, দিন শেষে এরা হারিয়ে যাবে। বিদেশি পোশাক আসুক, তাতে আমাদের আপত্তি নেই। তাই বলে আমরা আমাদের দেশি সংস্কৃতি ভুলে গেলে তো চলবে না।

যেসব নারী শোরুম কিংবা ফ্যাশন হাউজে চাকরি করেন, তারা বাসায় ফিরতে কি নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন?

লিপি খন্দকার: এটা ঠিক। এ বিষয়ে সরকারের সহযোগিতা খুব প্রয়োজন। মেয়েদের জন্য আলাদা যানবাহন দরকার। তবেই তারা বাসায় ফিরতে পারবে নিরাপত্তার সঙ্গে। আমরা যারা ফ্যাশন হাউজে কাজ করি, তাদের গাড়ি বের করার সামর্থ্য হয়নি, যাবতীয় খরচ মিটিয়ে বাড়তি কিছু করার সুযোগ হয়ে ওঠে না।

আপনার সংসারজীবন নিয়ে বলুন…

লিপি খন্দকার: দুই সন্তান, আমি আর স্বামী মিলে ছোট সংসার। বিবিআনায় আমি ও আমার স্বামী একই সঙ্গে, এখনও করছি।

জীবনে কখনও প্রেমে পড়েছিলেন?

লিপি খন্দকার: প্রেমে পড়িনি। কিন্তু এখন যার সঙ্গে আছি, তার সঙ্গে আর্ট কলেজে অধ্যয়ন অবস্থায় পরিচয়। সে থেকে বিয়ে, এখনও তার সঙ্গেই আছি।

এমন কোনো স্মৃতি কি আছে, যা মনে পড়লে এখনও রোমাঞ্চিত হন?

লিপি খন্দকার: আমার স্বামী আর আমি বকুলতলায় বসে কথা বলার স্মৃতিগুলো এখনও রোমাঞ্চিত করে। মন চায় এখনও বসি; কিন্তু সে সময় হয়ে ওঠে না!

অবসরে কী করেন?

লিপি খন্দকার: অবসর তেমন একটা পাই না। আমার প্রকৃতি ভালো লাগে। প্রকৃতি দেখার জন্য দেশে বা দেশের বাইরে পরিবারের সবাইকে নিয়ে ঘুরতে যাই।

ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কী?

লিপি খন্দকার: ডিজাইনারদের নিয়ে একটি ইনস্টিটিউট করার ইচ্ছা আছে। এটাকে ইনস্টিটিউট বলব না ডিজাইনার ক্লাব বলব। আমি চাই এমন একটা জায়গা থাকবে, যেখানে সব সিনিয়র ডিজাইনার যাবেন, জুনিয়র বা স্টুডেন্টরা তাদের কাছে যেতে পারবেন, কাজ শেয়ার করতে পারবেন। এমন একটা জায়গার কথা ভেবেছি অনেক আগে থেকেই। এটা নিয়ে কাজ করার ইচ্ছে আছে। যারা কাজ শিখতে চান, তাদের একটা দিকনির্দেশনা যেন দেওয়া যায় এমন একটা জায়গার কথা ভেবেছি।

জীবনে যা চেয়েছেন, তা কি পেয়েছেন?

লিপি খন্দকার: অনেক পেয়েছি। আমার এত চাওয়া ছিল না।

নতুন যারা উদ্যোক্তা হতে চান, তাদের উদ্দেশে…

লিপি খন্দকার: নতুন যারা আসছেন বা আসবেন, তাদের বলব ক্রিয়েটিভিটি, হার্ড ওয়ার্কিং ও ধৈর্য এ তিনটি বিষয় থাকতে হবে। ক্রিয়েটিভিটির মধ্যে নিজের মেধাটা লাগবে। নেট থেকে নকল করলে হবে না। পরিশ্রম করতে হবে। একদম পাস করা ডিজাইনাররা এখানে কাজ করতে আসেন, তাদের আবার একদম জিরো থেকে শেখাতে হয়। শক্ত মানসিকতা নিয়ে কাজ করতে হবে। হ