নিজের ভাষাটা ভালোভাবে জানা গৌরবের

শাহ মো. জিয়াউদ্দিন: বাংলাদেশের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায় এদেশ পরাধীন ছিল যুগের পর যুগ, প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে বিদেশি কর্তৃক শাসিত হয়েছে বাংলাদেশ নামের জনপদটি। স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশটি কি তার নিজস্ব সংস্কৃতি ও ভাষার মাধ্যমে দৈনন্দিন কার্যকলাপ পরিচালনা করতে পারছে? এখনও এ দেশের মানুষের ঘাড়ে বিদেশি সংস্কৃতি ও ভাষার ভূত চেপে আছে। প্রায়ই দেখা যায়, কোথাও গল্প বা আড্ডায় অনেকেই নিজের পাণ্ডিত্য বা আভিজাত্য প্রকাশে ইংরেজিতে বলার চেষ্টা করেন। আসলে কি এতে করে আভিজাত্য প্রকাশ পায়?

দেশের মানুষের মানসিকতায় ঢুকে আছে বিদেশি ভূত; কারণ রাজতন্ত্র বা ঔপনিবেশিক শাসন উভয়টাতেই ক্ষমতায় বসে ছিল বিদেশিরা। এই শাসকদের ভাষা আয়ত্ত নিয়ে শাসক শ্রেণির সান্নিধ্য লাভ করতেন অনেকেই। তাই নিজেদের উচ্চ শ্রেণি বা শাসকগোষ্ঠীর সমপর্যায়ের হিসেবে প্রকাশ করতে তারা বিদেশি ভাষা ব্যবহার করতেন।

ইংরেজি না জানলে ভালো কর্মসংস্থান হতো নাÑপ্রচলিত এ প্রথাটি এখনও বহাল আছে; যদিও সরকারি চাকরির ক্ষেত্রে ইংরেজি কম জানলেও তেমন কোনো সমস্যা নেই। তবে বেসরকারি চাকরির ক্ষেত্রে ইংরেজি জানাটা জরুরি। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর সব কার্যক্রম ইংরেজি ভাষাতেই চলে।

কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয় পড়–য়াদের বাংলা শব্দ ইংরেজি স্টাইলে উচ্চারণ করাটা অনেকটা মেনিয়ায় পরিণত হয়েছে। যেসব পড়–য়া ইংরেজি স্টাইলে বাংলা বলতে পারেন না, তাদের ‘খেত’ হিসেবে সতীর্থরা চিহ্নিত করেন। আজকাল পাড়ার মোড়ে, রাস্তাঘাটে স্কুল-কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয় পড়–য়াদের মুখে একটি শব্দ শোনা যায় অসাম বা ওসম-এর উচ্চারণগত দিকটা কী, তা নিয়ে শ্রুতিগত ত্রুটি হয়তো আমার থাকতে পারে; কারণ একেকজন এ শব্দটা একেকভাবে উচ্চারণ করেন। এটা বাংলা না ইংরেজি, না হিন্দি এ নিয়েও সংশয় দেখা দেয় তাদের উচ্চারণের গতিবিধি দেখে। এ শব্দটি ব্যবহার করে বর্তমানে নিজেকে অভিজাত শ্রেণিভুক্ত করার প্রবণতাও লক্ষ করা যায়।

বাংলাদেশের অর্থনীতির উন্নতি হয়েছে, যার ফলে রাস্তার মোড়ে মোড়ে ছোট-বড় খাবারের দোকান গড়ে উঠেছে। এই খাবারের দোকানগুলোয় খাবারের তালিকাটিও ইংরেজি অক্ষরে লেখা। বড় হোটেলগুলোয় তো কথাই নেই, সবাই মেন্যু ইংরেজিতে লেখে। তাছাড়াও দেশি খাবারগুলোকে বিদেশি শব্দের মাধ্যমে বিভিন্ন স্টাইলে পরিবেশন করা হয় বড় খাবারের দোকানগুলোয়।

বাংলাদেশের একটি বিভাগীয় শহরের এক খাবার দোকানে একদিন ভাত খেতে গিয়েছিলাম। চেয়ারে বসে যিনি খাবার পরিবেশন করেন, তাকে ভাত দিতে বললাম। খাবার পরিবেশনকারী উচ্চস্বরে বলে উঠলেন ‘এক প্লেট চাউল’! প্রথমে একটু ধাক্কা খেলাম; তারপর মনে হলো, দিল্লিতে খাবারের দোকানগুলোয় ভাতকে ‘চাউল’ বলে। তাই বলে কি বাংলাদেশেও ভাতকে চাউল বলতে হবে! বাংলাদেশে বিদেশি কিছু শব্দ আত্তীকরণ হয়ে এখন বাংলা শব্দের মতো প্রচলিত। কিন্তু এভাবে প্রতিনিয়ত বিদেশি শব্দ বাংলা ভাষায় প্রবেশের ফলে শুধু ভাষার নয়, এদেশের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিরও মারাত্মক ক্ষতি করছে।

বাংলাদেশের সংস্কৃতির সঙ্গে ধর্মটা ওতপ্রোতভাবে জড়িত। এদেশের মানুষের ধর্মীয় বিশ্বাসকে পুঁজি করেও বিদেশি শব্দের প্রবেশ ঘটছে বাংলা ভাষায়। কওমি মাদরাসাসহ দেশের অনেক ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে উর্দু ভাষাকে সম্ভ্রান্ত ভাষা হিসেবে ধরে নেওয়া হয়। দেশের বিশিষ্ট আলেম-ওলামারা নিজেকে যোগ্যতর হিসেবে প্রকাশের জন্য ধর্মীয় সমাবেশগুলোয় উর্দুতে বয়ান করেন। এই কৌশলটি তারা নিয়ে থাকেন নিজেকে জ্ঞানী হিসেবে প্রকাশের জন্য। দেশের আলেম-ওলামারা এভাবে ধর্মীয় রীতিনীতি বয়ান করলে সাধারণ মানুষ তা কতটা বোঝে এ নিয়ে সংশয় তো থেকেই যায়। আরেকটি বিশেষ প্রবণতা রয়েছে বাংলাদেশের হিন্দু বা মুসলিম ধর্মযাজকদের মধ্যে। তারা ধর্মীয় শব্দগুলো বাংলায় বলতে চান না। বিশেষ করে হিন্দু ধর্মযাজকরা তাদের পাণ্ডিত্য প্রসারে সংস্কৃত শব্দ আর ইসলাম ধর্মের আলেমরা তা উর্দুতে প্রকাশ করেন। ধর্মীয় বিষয়গুলো বাংলায় প্রচলন করলে ধর্মের জন্যই ভালো হতো। আর এ কারণে ধর্মীয় বিষয়গুলোর গোঁড়ামি বা কুসংস্কারের বেড়াজাল থেকে মুক্ত হচ্ছে না। মিলাদ বা অন্য কোনো ধর্মীয় অনুষ্ঠানে যে শব্দগুলো বাংলায় বলা যায়, সেগুলোকেও উর্দুতে বলার একটা চেষ্টা করেন আলেমরা।

অফিস-আদালতে গেলে দেখা যায় ইংরেজি বলার প্রবণতা। ভুল-শুদ্ধ যা-ই হোক, স্টাইল করে ইংরেজি বলতে পারলে দেখবেন অফিসের কর্তাব্যক্তিটি আপনাকে মূল্যায়ন একটু বেশিই করছেন। অফিসিয়াল কিছু নির্দেশনাও সাধারণের মাঝে বলতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন অফিস কর্তারা; কারণ নিজেকে বড়মাপের কর্তাব্যক্তি হিসেবে তুলে ধরার জন্য তা ইংরেজিতে বলেন। দেশের বণিক প্রতিষ্ঠানগুলোয় স্মার্টনেসের বিষয়টি অত্যাবশ্যকীয়; এই স্মার্টনেস প্রকাশে প্রতিষ্ঠানগুলোয় কর্মরতদের দেখা যায় বাংলা শব্দগুলোকে বিকৃতভাবে ইংরেজি স্টাইলে উচ্চারণ করছেন। এটা অনেকটা কাকের স্বরে কোকিলের কথা বলার মতো!

মোবাইল ফোন কোম্পানিগুলো বাংলা ভাষাকে বিকৃত করছে, সেটগুলোর অপশনে বাংলার ব্যবহার ইংরেজি শব্দের অনুবাদের সমার্থক অর্থ বহন করে না; তারপরও তারা এ ধরনের একটা কাজ করে বাংলা ভাষার প্রতি উদারতা দেখাতে চেয়েছে। মোবাইল কোম্পানিগুলোর গ্রাহকসেবা কেন্দ্রগুলোর নাম ‘কাস্টমার কেয়ার সেন্টার’। আপনি কোনো মোবাইল কোম্পানির নাম বলে তার গ্রাহক সেবাকেন্দ্রটি কোথায় জানতে চাইলে দেখবেন কেউ বলতে পারবেন না। আর যদি বলেন কাস্টমার কেয়ার সেন্টারে, তখন দেখবেন সঙ্গে সঙ্গে আপনাকে চিনিয়ে দিচ্ছে। গ্রাহক সেবাকেন্দ্রটি কাস্টমার কেয়ার সেন্টারে পরিণত হয়েছে যে কারণে, সে কারণটি হলো মোবাইল কোম্পানিগুলো শুরুতেই তাদের গ্রাহক সেবাকেন্দ্রটির সামনে ‘কাস্টমার কেয়ার সেন্টার’ নামে বড় সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে দিয়েছে। গ্রাহক সেবাকেন্দ্রগুলোয় কর্মরতরা একটু বিদেশি কায়দায় বিনয় প্রকাশ করে থাকেন গ্রাহকের সঙ্গে। তাদের কথা বলার ধরনটাও ব্যতিক্রম। তারা স্কুল-কলেজ পড়ুয়াদের মতো অতটা ইংরেজি স্টাইলে বাংলা শব্দ উচ্চারণ না করলেও বাংলা শব্দকে ইংরেজিকরণের সাধ্যমত চেষ্টা করে থাকেন।

আড্ডা বা চা দোকানে বসে নিজের যোগ্যতা প্রকাশ করতে যার যা সাধ্যমতো ইংরেজি শব্দ ব্যবহার করাটা নিত্যনৈমিত্তিক বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। স্বাধীনতার আগে বাংলাদেশের মানুষের উর্দু বলাটা ছিল গৌরব বা আভিজাত্যের প্রতীক। পাকিস্তান আমলে বিশেষ করে ধনীরা বাংলা বলতেন না। পাকিস্তানের শাসক শ্রেণির সঙ্গে সম্পর্কিত পরিবারগুলোর পারিবারিক ভাষা ছিল উর্দু। তারা বাঙালি হয়েও পরিবারের সদস্যরা একে অপরের সঙ্গে উর্দুতে কথা বলতেন। তাই দেখা যায়, ভাষা আন্দোলনে যেসব ভাষাসৈনিক রয়েছেন, সবাই মধ্যবিত্ত বা নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবার থেকে আসা। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ধনী পরিবারগুলোর পারিবারিক ভাষা ইংরেজি হয়ে গেছে। ইংরেজ আমলে বাংলাকে ছোট জাতের ভাষা হিসেবে চিহ্নিত করার চেষ্টা চালায় শাসক গোষ্ঠী আর সে সময় শাসক শ্রেণির দলভুক্ত অনেক ধনী তা মেনে নেন। এ ধরনের একটি প্রক্রিয়ায় বিদেশি ভাষা অনুশীলন হতে হতে সে ভাষায় কথা বলাটা একটা আভিজাত্যের প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে।

যারা অভিজাত হিসেবে যুগ যুগ ধরে নিজেদের দাবি করে আসছেন, তাদের এ দেশ স্বাধীন করার পেছনে কোনো অবদান নেই বললেই চলে। অভিজাত হিসেবে দাবিদাররা নানাভাবে এ দেশকে বিদেশিদের গোলাম বানিয়ে নিজেরা বিদেশিদের তাঁবেদারি করছেন। আজও কথিত এই অভিজাত শ্রেণি নানাভাবে এ দেশকে বিদেশিদের বাজারে পরিণত করার প্রয়াস চালাচ্ছে। ভাষা হলো মানুষের নিজস্ব সত্তা। মানুষ জন্মের পর প্রকৃতিগতভাবে ভাষাটা শেখে; তাই ভাষার সঙ্গে নিজের স্বকীয়তাটা জড়িত। সুতরাং আভিজাত্য প্রকাশের জন্য যারা বিদেশি ভাষার মাধ্যমে নিজেকে অভিজাত বানাতে চান, তারা বোকার স্বর্গে বাস করেন। এতে করে আভিজাত্য প্রকাশ পায় না, প্রকাশ পায় চরম গোলামি। আর গোলামরা কোনোদিন অভিজাত শ্রেণি হতে পারে না। সুতরাং যারা বাংলাকে বিকৃত ইংরেজি ভাষায় উচ্চারণ করেন, তারা নিজেকেই অপমান করছেন, সে সঙ্গে মহান মুক্তিযুদ্ধের বীর শহীদের প্রতিও অবজ্ঞা দেখাচ্ছেন।

তবে নিজের ভাষার উৎকর্ষ বাড়ানোর জন্য বিদেশি ভাষা শেখার প্রয়োজন রয়েছে। কিন্তু তা সমাজে প্রচলনের উদ্দেশ্যে হওয়া উচিত নয়। সবারই মনে রাখা উচিত, নিজের ভাষাটা ভালোভাবে জানা গৌরবের। তাই বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতিকে অক্ষুন্ন রাখার জন্য তার বিকৃতি রোধ জরুরি।

 

ফ্রিল্যান্স লেখক

[email protected]