নিট মুনাফার সাড়ে দশ গুণ খেলাপি ঋণ এবি ব্যাংকের

সাইফুল আলম, চট্টগ্রাম: বাংলাদেশের প্রথম বেসরকারি ব্যাংক এবি ব্যাংক লিমিটেড ব্যাংক পরিচালনায় ৩৭ বছরের অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ। এবি ব্যাংকের গত চার বছরের কর ও প্রভিশন সংরক্ষণের পর নিট মুনাফা হয়েছিল মোট ৩৮৬ কোটি ৪৭ লাখ ১৯ হাজার ৯৮৫ টাকা। আর একই সময়ে খেলাপি ঋণের মোট পরিমাণ ছিল চার হাজার ৭৬ কোটি ৪৬ লাখ ৮৮ হাজার ৬৫ টাকা। অর্থাৎ নিট মুনাফার চেয়ে ১০ দশমিক ৫৪ গুণ বাড়ছে খেলাপি ঋণ। ব্যবস্থাপনার অদক্ষতায় প্রতিবছর বাড়ছে খেলাপি ঋণ। বাড়ছে প্রভিশন সংরক্ষণ। কমছে নিট মুনাফাও। কমছে ডিপোজিট সংগ্রহ। এতে আস্থা হারাচ্ছেন গ্রাহকরাও।
এবি ব্যাংক সূত্রে জানা যায়, বেসরকারি খাতে অভিজ্ঞ আর্থিক এ প্রতিষ্ঠানে প্রতি বছর বাড়ছে খেলাপি ঋণের পরিমাণ। ২০১৭ সালে বিভিন্ন খাতে বিতরণ করা ঋণের পরিমাণ ছিল ২২ হাজার ৮৮৮ কোটি ১৪ লাখ ৩৯ হাজার টাকা। বিপুল এ ঋণের মধ্যে খেলাপি হয় এক হাজার ৬২৫ কোটি ৮৬ লাখ টাকা। এর মধ্যে গত নভেম্বরে এ ব্যাংকের চট্টগ্রাম অঞ্চলে ৩০ গ্রাহকের কাছে ৬৫০ কোটি টাকার অধিক ঋণ খেলাপি হওয়া কারণে ৩০টি মামলা করা হয় অর্থঋণ আদালতে। একইভাবে ২০১৬ সালে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল এক হাজার ১২৪ কোটি ৩২ লাখ টাকা। মাত্র এক বছরের এ খেলাপি ঋণে বেড়েছে ৫০১ কোটি ৫৪ লাখ টাকা। এছাড়া ২০১৫ সালে ছিল ৬৫০ কোটি ৮৩ লাখ টাকা। আর ২০১৪ সালে ঋণ খেলাপির পরিমাণ ছিল ৬৭৫ কোটি ৪৬ লাখ টাকা। অপরদিকে খেলাপি ঋণের বিপরীতে ব্যাংকগুলোকে আয় থেকে অর্থ নিয়ে প্রয়োজনীয় প্রভিশন রাখতে গিয়ে কমছে নিট মুনাফাও। ২০১৭ সাল শেষে ব্যাংকটির নিট মুনাফা হয় মাত্র দুই কোটি ৯৬ লাখ ৯৬৫ টাকা, যেক্ষেত্রে ২০১৬ সালে নিট মুনাফা হয়েছিল ১৩০ কোটি ৪৬ লাখ ৭০ হাজার ৪২৩ টাকা। একইভাবে ২০১৫ সালে ছিল ১২৭ কোটি চার লাখ ১৪ হাজার টাকা। আর ২০১৪ সালে ১২৬ কোটি ৩৩ হাজার টাকা। এছাড়া ২০১৩ সালে ছিল ১০১ কোটি ৯ লাখ টাকা।
বিশ্লেষণে দেখা যায়, এবি ব্যাংকের গত চার বছরের কর ও প্রভিশন সংরক্ষণের পর নিট মুনাফা হয়েছে মোট ৩৮৬ কোটি ৪৭ লাখ ১৯ হাজার ৯৮৫ টাকা। আর একই সময়ে খেলাপি ঋণের মোট পরিমাণ ছিল চার হাজার ৭৬ কোটি ৪৬ লাখ ৮৮ হাজার ৬৫ টাকা। অর্থাৎ নিট মুনাফার চেয়ে ১০ দশমিক ৫৪ গুণ বাড়ছে খেলাপি ঋণ, যা ব্যাংকটিকে ক্রমেই ঝুঁকিপূর্ণ ব্যাংকে রূপান্তর করছে। আর খেলাপি ঋণ বাড়ায় প্রতি বছর প্রভিশন সংরক্ষণও বাড়ছে। ২০১৭ সালে প্রভিশন রাখা হয় ৩৮৬ কোটি ৩৮ লাখ ৪৩ হাজার ৪১৫ টাকা। ২০১৬ সালে রাখা হয় ২১৯ কোটি ২৫ লাখ ৭২ হাজার ৬৬১ টাকা, ২০১৫ সালে ৯৫ কোটি ৫৬ লাখ ১১ হাজার ৩৬৩ টাকা এবং ২০১৪ সালে ২০৬ কোটি ৪০ লাখ ১৩ হাজার ১৭০ টাকা।
গত নভেম্বরে চট্টগ্রামের ৩০ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে করা এবি ব্যাংকের মামলার মধ্যে ক্ষুদ্র প্রতিষ্ঠানের উদ্যোক্তা থেকে রয়েছে বৃহৎ শিল্প গ্রুপ পর্যন্ত। এর মধ্যে ব্যাংকটির আগ্রাবাদ শাখার গ্রাহক রাইজিং স্টিল মিলের কাছে অনাদায়ী ৪৫৯ কোটি ১০ লাখ টাকা এবং লিজেন্ড হোল্ডিংসের কাছে অনাদায়ী ৬৫ কোটি ১৮ লাখ টাকা আদায় করতে না পেরে চট্টগ্রামের অর্থঋণ আদালতে গত নভেম্বরে মামলা করা হয়। একই মাসের ৯ তারিখে সিডিএ শাখার মাবিয়া শিপ ব্রেকারের কাছে ১১৭ কোটি ২১ লাখ অনাদায়ী থাকায় চট্টগ্রামের অর্থঋণ আদালতে মামলা করা হয় প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে। কিন্তু বিপুল পরিমাণের পাওনা অনাদায়ী থাকায় চিন্তিত অধিকাংশ চট্টগ্রামের শাখা ব্যবস্থাপকরা। কারণ মামলার প্রক্রিয়া শেষ হতে সময় লাগে প্রচুর।
ব্যাংক ও আর্থিক খাতের বিশ্লেষকরা বলেন, দুর্নীতি, দক্ষ লোকের অভাব, রাজনৈতিক বিবেচনায় ঋণ অনুমোদন, সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংকের শক্তিশালী পদক্ষেপের অভাবে দিন দিন ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ বাড়ছে। খেলাপি ঋণ বেশি হলে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের ঋণ দেওয়ার ক্ষমতা কমে যায়। খেলাপি ঋণের বিপরীতে ব্যাংকগুলোকে আয় থেকে অর্থ নিয়ে প্রয়োজনীয় প্রভিশন সংরক্ষণ করতে হয়। এতে সাধারণ বিনিয়োগকারীরা লভ্যাংশবঞ্চিত হচ্ছেন। আর যেসব ব্যাংক প্রভিশন ঘাটতিতে থাকে, তাদের মূলধন ঘাটতিতে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়, যা আর্থিক ভিত্তির দুর্বলতা প্রকাশ করে। খেলাপি ঋণের কারণে ব্যাংকগুলো ঋণের সুদহার কমাতে পারছে না। এতে ব্যবসায়ী ও শিল্পোদ্যোক্তারা নিরুৎসাহিত হচ্ছেন। ফলে বিনিয়োগে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
এ প্রসঙ্গে এবি ব্যাংক লিমিটেডের প্রেসিডেন্ট ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক মশিউর রহমান চৌধুরীর সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
উল্লেখ্য, বাংলাদেশের প্রথম প্রজšে§র বেসরকারি ব্যাংক হিসেবে এবি ব্যাংক লিমিটেড ১৯৮১ সালের ৩১ ডিসেম্বর আত্মপ্রকাশ করে। আর গত তিন দশক সেবার পরিধির মাধ্যমে শ্রেষ্ঠত্ব অর্জনের লক্ষ্যে দেশ-বিদেশে ব্যাপকভাবে সম্প্রসারিত করেছে শাখা। মোট ১০৫টি শাখাসহ একটি বৈদেশিক শাখা রয়েছে ভারতের মুম্বাই শহরে। আর দেশজুড়ে ছড়িয়ে রয়েছে ২৭০টির বেশি এটিএম। ব্যাংকটি এর মূল ব্যাংকিং কার্যক্রমে যুক্তরাজ্যের একটি এক্সচেঞ্জ কোম্পানিসহ মোট ছয়টি সহায়ক কোম্পানি, বৈদেশিক ব্যাংকিং ইউনিট এবং কাস্টডিয়াল সেবা সংযুক্ত করেছে। ব্যাংকটি এর বৈদেশিক কার্যক্রম বিস্তৃতির লক্ষ্যে মিয়ানমারের ইয়াংগুন এবং যুক্তরাজ্যের লন্ডনে রিপ্রেজেন্টেটিভ অফিস চালু করেছে।