দিনের খবর প্রচ্ছদ প্রথম পাতা

নিন্মচাপে রূপ নিয়ে বৃষ্টি ঝরাল ‘ফণী’

নিজস্ব প্রতিবেদক: শক্তি কমে গতকাল গভীর নিম্নচাপে পরিণত হয় ঘূর্ণিঝড় ‘ফণী’। এতে দেশের সব সমুদ্রবন্দরকে ৩ নম্বর স্থানীয় সতর্কসংকেত দেখাতে বলা হয়েছে। গতকাল সন্ধ্যার দিকে ফণী বাংলাদেশ পেরিয়ে ভারতের আসমের দিকে যায়। তবে ঘূর্ণিঝড়টির প্রভাবে দেশের বিভিন্ন স্থানে গতকাল বৃষ্টিপাত হয়েছে। আজও বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকতে পারে। গতকাল আগারগাঁওয়ে বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদফতরে এক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানানো হয়।
এদিকে ফণীর আঘাতে দেশের বিভিন্ন এলাকায় চারজন নিহত ও অন্তত ৬৩ জন আহত হয়েছেন বলে দাবি করছে সরকার। যদিও বেসরকারি হিসাবে এ সংখ্যা আরও বেশি বলে দাবি করা হচ্ছে।
আবহাওয়া অধিদফতরের পরিচালক শামসুদ্দীন আহমেদ গতকাল দুপুরে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে এক সংবাদ ব্রিফিংয়ে জানান, বাংলাদেশ এখন অনেকটা ঝুঁকিমুক্ত। মোংলা ও পায়রা সমুদ্রবন্দরকে ৭ নম্বর বিপদসংকেত নামিয়ে এর বদলে ৩ নম্বর স্থানীয় সতর্কসংকেত এবং চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দরকে ৬ নম্বর বিপদসংকেত নামিয়ে তার পরিবর্তে ৩ নম্বর স্থানীয় সতর্কসংকেত দেখাতে বলা হয়েছে। কক্সবাজার সমুদ্রবন্দরকে ৪ নম্বর স্থানীয় হুশিয়ারি সংকেত দেখাতে বলা হয়েছে। উত্তর বঙ্গোপসাগর ও গভীর সাগরে অবস্থানরত সব মাছ ধরার নৌকা ও ট্রলারকে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত নিরাপদ আশ্রয়ে থাকতে বলা হয়েছে।
দুর্বল হয়ে ঘূর্ণিঝড় ফণী আজ দুপুরের দিকে টাঙ্গাইল, পাবনা ও ময়মনসিংহে অবস্থান করছিল। এর আগে সকাল ৯টার দিকে ঘূর্ণিঝড়টি ফরিদপুর-ঢাকা ও পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে ছিল। দুপর দেড়টার দিকে আবহাওয়া অধিদফতর সূত্র এ কথা জানায়। ঘূর্ণিঝড়টি এখন নিন্মচাপে পরিণত হয়েছে।
আগামী ২৪ ঘণ্টায় ফণীর কারণে সৃষ্ট নিন্মচাপে মাঝারি থেকে ভারী বৃষ্টি হবে বলে আবহাওয়ার পূর্বাভাসে জানানো হয়েছে। ভারতের উড়িষ্যায় আঘাত হানার ২১ ঘণ্টা পর শনিবার সকাল ৬টার দিকে বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল অতিক্রম করে প্রবল ঘূর্ণিঝড় ফণী। আরও উত্তর দিকে চলে গিয়ে সকাল ৯টার দিকে ফরিদপুর ও আশপাশের অঞ্চলে অবস্থান করছিল। এটি পরে আরও উত্তর-পূর্ব দিকে এগিয়ে গেছে। ঘূর্ণিঝড়টির প্রভাবে দেশের আকাশ মেঘাচ্ছন্ন। দমকা ও ঝড়ো হাওয়াসহ সারা দেশে চলছে বৃষ্টি ও বজ্রবৃষ্টি।
আবহাওয়াবিদ আরিফ হোসেন বলেন, ‘সমতলে আসার পর ফণী উত্তরাঞ্চলে ভারতের আসাম ও মেঘালয়ের দিকে চলে যাবে। পরিণত হবে গভীর নিন্মচাপে। এরপর আরও দুর্বল হয়ে স্থল নিন্মচাপে পরিণত হবে।’
আবহাওয়া অধিদফতর সূত্র জানায়, ঘূর্ণিঝড় ও অমাবস্যার প্রভাবে উপকূলীয় জেলা চট্টগ্রাম, নোয়াখালী, লক্ষ্মীপুর, ফেনী, বরগুনা, বরিশাল, পটুয়াখালী, পিরোজপুর, ঝালকাঠি, বাগেরহাট, খুলনা ও সাতক্ষীরা জেলা এবং এসব এলাকার অদূরবর্তী দ্বীপ ও চর স্বাভাবিকের চেয়ে দুই থেকে চার ফুট উচ্চতায় জলোচ্ছ্বাসে প্লাবিত হতে পারে।
গতকাল দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব শাহ কামাল সংবাদ সম্মেলনে বলেন, ‘মৃত লোকের সংখ্যা হলো চার। এর মধ্যে বরগুনায় দুজন, ভোলায় একজন এবং নোয়াখালীতে একজন। আহতের সংখ্যা ৬৩। আমরা গতকাল বলেছিলাম সাড়ে ১২ লাখ লোক আশ্রয়কেন্দ্রে নিয়ে এসেছি। এটা বর্তমানে ১৬ লাখ ৪০ হাজার ৪১৭।’
শাহ কামাল বলেন, ‘আল্লাহর অশেষ কৃপায় আমাদের খুব একটা ক্ষতি হয়নি। ফসল ও গবাদি পশুর ক্ষতি হয়নি। এটা আমাদের প্রাথমিক অ্যাসেসমেন্ট, যেটা আমরা জেলা প্রশাসক ও সংশ্লিষ্ট সংস্থার কাছ থেকে সংগ্রহ করেছি।’
খাদ্যমন্ত্রী বলেন, ‘উপকূলীয় জেলাগুলোতে যথেষ্ট পরিমাণ খাদ্য মজুত আছে। আমাদের খাদ্যের কোনো সংকট নেই। আমাদের এখন প্রয়োজন দ্বিতীয় পর্যায়ের কাজ শুরু করা।’
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী এনামুর রহমান বলেন, ‘আলহামদুলিল্লাহ। আল্লাহ আমাদের বিপুল ক্ষয়ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা করেছেন। আমরা আনন্দিত যে, আমরা যে শঙ্কায় ছিলাম সেই শঙ্কা কাটিয়ে ভালো অবস্থানে আছি। তেমন উল্লেখযোগ্য ক্ষয়ক্ষতি কোথাও হয়নি বলে জেনেছি।’
তিনি বলেন, যারা মারা গেছেন, ‘তারা আশ্রয়কেন্দ্রে যাননি। আমাদের লক্ষ্য থাকবে, উপকূলের একটি লোকও যাতে নিরাপদ আশ্রয়ের বাইরে না থাকে। যারা মারা গেছেন তাদের দাফনের জন্য ২০ হাজার টাকা করে দেওয়া হবে। আহতদের চিকিৎসায় মেডিক্যাল টিম আছে। সিভিল সার্জনরা এটা মনিটরিং করছেন।’
প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘ক্ষতি যেটা হয়েছে, আমরা দেখেছি, টিনগুলো উড়ে গেছে। আমরা দুর্যোগ মন্ত্রণালয় থেকে যেখানে যে পরিমাণ টিনের দরকার তা সরবরাহ করব। ক্ষয়ক্ষতির পুরো বিবরণটা ২৪ ঘণ্টার মধ্যে আমাদের কাছে আসবে। সে অনুযায়ী প্রত্যেক মন্ত্রণালয় তাদের পুনর্বাসনের জন্য দায়িত্ব নেবে।’
তিনি বলেন, ‘ক্ষয়ক্ষতিটা যেভাবে অ্যাসেস (নির্ধারণ) করা হবে সেই অ্যাসেসমেন্ট অনুযায়ী প্রত্যেক মন্ত্রণালয় ক্ষয়ক্ষতি কাটিয়ে ওঠার জন্য সাহায্য করবে। শেখ হাসিনার সরকার অত্যন্ত সামর্থ্যবান সরকার, ধনী সরকার। অর্থের কোনো কমতি নেই। যে কোনো দুর্যোগ মোকাবিলার জন্য আমাদের সামর্থ্য যথেষ্ট। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বলিষ্ঠ নেতৃত্বে, আমরা আমাদের সামর্থ্য দিয়ে যে ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে তা কাটিয়ে উঠতে পারব। ভবিষ্যতে দুর্যোগ মোকাবিলায় সামর্থ্য বাড়ানোর চেষ্টাও করব।’

সর্বশেষ..