নিবন্ধন হোক যথাযথভাবে

রোহিঙ্গাদের বায়োমেট্রিক নিবন্ধনের কাজ শুরু হয়েছে গতকাল। কক্সবাজার জেলা প্রশাসকের নেতৃত্বে শুরু হওয়া এ কাজে সহযোগিতা করবে আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা (আইওএম) ও জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক হাইকমিশন (ইউএনএইচসিআর)। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে সহায়তা করবে পাসপোর্ট অধিদফতর। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, রোহিঙ্গাদের পরিচয়পত্র দেওয়া হবে। এটি ছাড়া তারা কোনো চিকিৎসাসেবা, খাবারসহ দেশি বা বিদেশি সাহায্য পাবে না। মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে আসা শরণার্থীদের একটি পূর্ণাঙ্গ তথ্যভাণ্ডার গড়ে তেলা হবে।

রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে সরকারের কূটনৈতিক প্রচেষ্টাও লক্ষণীয়। কাজাখস্তানের রাজধানীতে অনুষ্ঠানরত ওআইসির বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবিষয়ক শীর্ষ সম্মেলনের ফাঁকে তুরস্কের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে বৈঠকে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের জন্য জাতিসংঘের উদ্যোগে একটি ‘নিরাপদ অঞ্চল’ গঠনের প্রস্তাব দিয়েছেন আমাদের রাষ্ট্রপতি। শরণার্থী পরিদর্শনে প্রধানমন্ত্রী আজ কক্সবাজারের উখিয়া যাচ্ছেন। বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের জন্য আলাদা সেল গঠন করেছে সরকার। তাদের ভেতর থেকে সম্ভাব্য অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সতর্ক রয়েছে বলে জানিয়েছেন আইজিপি। এসবের পাশাপাশি রোহিঙ্গাদের বায়োমেট্রিক নিবন্ধন শুরুর ঘটনা ইতিবাচক। তাদের স্বদেশে ফিরে যাওয়া নিশ্চিত করতে এটি সহায়ক হবে।

বাংলাদেশ রোহিঙ্গা শরণার্থী সমস্যা মোকাবিলা করছে ১৯৭৮ সাল থেকে। তৎকালীন সরকার এখানে এসে ওঠা রোহিঙ্গাদের নিবন্ধন এবং কূটনৈতিক উদ্যোগের মাধ্যমে পরে তাদের অনেককে স্বদেশে ফিরিয়ে নিতে মিয়ানমারকে বাধ্য করেছিল। বর্তমানে আসা বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গাকেও একইভাবে ফেরত পাঠানোর প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ও এ কথা বলছে। এক্ষেত্রে রোহিঙ্গাদের মূল জনপদ থেকে আলাদা করে রাখতে তাদের নিবন্ধন জরুরি। কয়েকটি বিষয় এখানে বিশেষভাবে বিবেচ্য। এক. একজন রোহিঙ্গাও যেন বাদ না যায়; দুই. ক্যাম্প বা আসার পথে জন্মগ্রহণকারী শিশুও যেন নিবন্ধিত হয়; তিন. রোহিঙ্গারা যাতে জাতীয় পরিচয়পত্র, পাসপোর্ট না পায় (বাংলাদেশি পরিচয়ে এরা বিদেশে গিয়ে অপরাধে জড়িয়ে পড়তে পারে); চার. তাদের সঙ্গে বিয়েবন্ধনে আবদ্ধ না হওয়া নিশ্চিত করা।

দেশে মাদক, বিশেষ করে ইয়াবা আনয়নের প্রধান রুট হিসেবে নাফ নদীর পরিচিতি রয়েছে। উপকূলরক্ষী ও বিজিবির অভিযানে এখানে প্রায়ই মাদক উদ্ধার হয়। কক্সবাজারে নতুন আসা রোহিঙ্গারা সুনিয়ন্ত্রিত না হলে তাদের মাধ্যমে এটা আরও বাড়তে পারে। সর্বস্ব হারিয়ে শরণার্থী হওয়া ব্যক্তিদের অনেকে বেপরোয়া প্রকৃতির হয়ে ওঠে। জীবিকার জন্য তারা জড়িয়ে পড়ে মাদক ও ক্ষুদ্রাস্ত্র ব্যবসায়। রোহিঙ্গাদের নিয়ে এমন সমস্যা আগেও হয়েছে। এখন নতুন করে মূল জনগোষ্ঠীর সঙ্গে তারা মিশে গেলে এক্ষেত্রে পরিস্থিতি বিপর্যয়কর হতে পারে। কক্সবাজার আমাদের প্রধান পর্যটনকেন্দ্র। পর্যটকদের নিরাপত্তা বিধানে সে নগরী থেকে যথাসম্ভব দূরবর্তী স্থানে শরণার্থী শিবির স্থাপন এবং তাদের একত্রে রাখাটা জরুরি। তাহলে ত্রাণ বিতরণেও সুবিধা হবে। ইতোমধ্যে তেমন উদ্যোগ অবশ্য নেওয়া হয়েছে।

বাণিজ্যমন্ত্রী যথার্থই বলেছেন, মালদ্বীপের মতো মিয়ানমারের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করা সহজ নয়। সম্পর্ক বজায় রেখেই সংকটের সমাধান করতে হবে। নতুন ও পুরোনো রোহিঙ্গাদের যথাযথ নিবন্ধন এর ভিত্তি হতে পারে। এক্ষেত্রে মিয়ানমারের বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত বা তাদের কোনো প্রতিনিধিকে সম্পৃক্ত করার বিষয়টিও বিবেচ্য। তাহলে প্রকৃত রোহিঙ্গা নিয়ে ভবিষ্যতে দাবি, পাল্টা দাবি কম উঠবে। রোহিঙ্গা শরণার্থীদের জন্য আসা সাহায্য যথানিয়মে খরচ করার প্রশ্নটিও জরুরি। এক্ষেত্রে ব্যাপক দুর্নীতি হলে দেশের সুনাম নষ্ট হবে। তবে সবার আগে রোহিঙ্গা নিবন্ধনের কাজ শেষ করতে হবে দক্ষতার সঙ্গে। পাশাপাশি তাদের নিজ দেশে প্রত্যাবাসনের লক্ষ্যে জোর কূটনৈতিক প্রয়াস রাখতে হবে অব্যাহত।