নিরাপদ আশ্রয় হোক নগরীর ভাসমান মানুষ

শামিমা নাসরীন: শিশিরসিক্ত শিউলি, শিশিরসিক্ত দূর্বাঘাস, শিশিরসিক্ত ফসলের মাঠের বর্ণনা পড়েছি কবির কবিতায়। শুধু তাই নয়, গ্রামের মেয়ে হওয়ার সুবাদে চোখেও দেখেছি। প্রকৃতির সঙ্গে শিশিরের প্রেম অপার সৌন্দর্যের আধার। কিন্তু রাজধানীতে এসে প্রকৃতির আরেকটি রুঢ় রূপ দেখেছি। আর তা হলো শিশিরসিক্ত মানুষ! আর কয়েকদিন পরই ভোরবেলায় দেখা মিলবে এসব শিশিরসিক্ত মানুষের। খোলা আকাশের নিচে সড়কদ্বীপের ওপর অথবা ফুটপাতে দেখা যাবে শিশিরে ভেজা চট অথবা পলিথিন গায়ে শুয়ে আছে লোকজন। শুধু বড়রা নয়, এ দলে থাকে পথশিশুরাও। এসব দেখে প্রথম প্রথম শিশিরসিক্ত শেফালির সৌন্দর্য এক নিমিষেই চোখের জল হয়ে গড়িয়ে পড়ত।
রাজধানীতে নয়, বছর পার করে একটা জিনিস খুব ভালো করে টের পেয়েছি, এখানে এলে সব খারাপ বিষয় সহ্য করার ক্ষমতা বেড়ে যায় তিন-চার গুণ। এখনও কষ্ট লাগে, তবে আগের মতো সপ্তাহ ধরে নিজের ভেতরে তোলপাড় হয় না। যখন দেখি তখনই হয়তো আহা-উহু করে পেছনে না তাকিয়ে আবার গন্তব্যে রওনা দিচ্ছি। তবু মানতে পারি না ভেতরে ভেতরে। কিন্তু কিছু করার নেই আমার মতো সামান্য এক মানুষের। শুধু কিবোর্ডের খটখট শব্দে প্রতিবাদ করে ওঠে আঙুলগুলো। এদের জন্য কি কিছুই করার নেই আমাদের বা সরকারের? যে দেশের সরকার মিয়ানমার ফেরত ১০ লাখ রোহিঙ্গাদের জন্য আশ্রয় দেয়, শুধু আশ্রয় নয় তাদের বসবাসের জন্য ঘর করে দিতে পারে, সে দেশের সরকার নিজ দেশের ভাসমান মানুষের মাথা গোঁজার ব্যবস্থা করতে পারে নাÑএটি বিশ্বাস করতে যে পারছি না।
প্রতি বছর প্রচুর সংখ্যক লোক কাজের সন্ধানে ঢাকায় প্রবেশ করছে। এদের কেউ কেউ পড়ালেখা শেষ করে চাকরির সন্ধানে বা ব্যবসার উদ্দেশ্যে আসে। আরেক দল আসে লেখাপড়া না জানা দিনমজুর শ্রেণির; যারা বিভিন্ন কাজের সন্ধানে আসে। কেউবা প্রাকৃতিক দুর্যোগে ঘরবাড়ি হারিয়ে পেটের দায়ে রাজধানীতে পাড়ি দিচ্ছে। এদেরই একটি অংশ ফুটপাত, সড়কদ্বীপ, ফ্লাইওভারের নিচে, ওভারব্রিজের ওপর, বিভিন্ন পার্কে অথবা খোলা আকাশের নিচে কোনো বাড়ির দেয়ালঘেঁষে শুয়ে পড়ছে। রাত কাটছে সেখানেই। গরমকালটা কোনো রকমে কাটলেও ভয়ানক কষ্টে কাটে শীতকাল ও বর্ষাকাল। ভরা শীতে খোলা আকাশের নিচে একটি চটের বস্তা বা নামমাত্র চাদর গায়ে বা পলিথিন গায়ে জড়িয়ে রাত কাটানোর ভয়াবহতা চোখে দেখে অনুভব করা সম্ভব নয়।
গত আগস্টে একটি সংবাদ সারাবিশ্বে আলোড়ন তুলেছে। ইথিওপিয়ার নতুন প্রধানমন্ত্রী আবিই আহমেদ নির্দেশ দিয়েছেন ভাসমান লোকদের রাস্তা থেকে তুলে নিয়ে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করতে, নতুন কাপড় দিতে এবং নতুন জুতা কিনে দিতে। আর ইথিওপিয়ায় নাইবা গেলাম। দেশের ভেতরে একটু ঘোরাফেরা করলেই অনেক কিছু চোখে পড়বে। ব্যক্তিগত উদ্যোগে ২০১৩ সালের ২২ নভেম্বর বিদ্যানন্দ নামে একটি প্রতিষ্ঠান চালু করেন পেরু প্রবাসী কিশোর কুমার দাশ ও তার বোন শিপ্রা দাশ। প্রথমে সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের পড়ালেখায় সহযোগিতার মধ্য দিয়ে শুরু করলেও এখন তারা একাধিক কাজ করে। প্রতিদিন পথশিশু ও বৃদ্ধদের এক টাকার বিনিময়ে দুপুরের খাবারও দেয়। নারায়ণগঞ্জে তারা প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম শুরু করলেও পরবর্তীতে ঢাকা, রাজশাহী, চট্টগ্রাম, রংপুরসহ দেশের বেশ কয়েকটি জেলায় শাখা খুলেছে। রোজার সময়ও তারা প্রতিদিন ইফতারিসহ রাতের খাবার এবং সেহরির খাবার দিয়ে থাকে ভাসমান মানুষকে। একজন ব্যক্তি যদি ব্যক্তিগত উদ্যোগে এতগুলো মানুষকে খাবার খাওয়াতে পারেন, তাহলে সরকারিভাবে উদ্যোগ নেওয়া কেন সম্ভব হবে না?
হ্যাঁ কিছু সমস্যা আছে। এসব ভাসমান লোকদের থাকা-খাওয়ার জায়গা দিতে শুরু করলে হয়তো অনেক বাড়িঘর থাকা লোকরা লোভে পড়ে এর মধ্যে ঢুকে পড়বে। সেসব যাচাই-বাছাই করার ব্যবস্থা থাকাও তো প্রয়োজন। এসব ভাসমান জনগণ নিজেরাই শুধু ভুক্তভোগী তা তো নয়। এদের অপকর্মের জন্য চরম দুর্ভোগের শিকার হতে হয় সাধারণ মানুষকে। গ্রামের কর্মহীন বেকাররা আসে শহরে। এখানে এসে কাজ না পেলে জড়িয়ে পড়ে বিভিন্ন অপকর্মের সঙ্গে। ভাসমান শিশু, কিশোর ও যুবকদের একটি অংশ ছিনতাইকারী, মাদক বহণকারীসহ বিভিন্ন অপরাধী চক্রের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে। ওভারব্রিজ, আন্ডারপাস, ফ্লাইওভার ও পার্কসংলগ্ন রাস্তাগুলো মাদককারবারিদের আখড়ায় পরিণত হয় রাতের বেলা। দল বেঁধে ছিনতাইকারীরা ওঁৎ পেতে থাকে।
আরও বেদনাদায়ক বিষয় হলো, এসব কাজের সঙ্গে যারা জড়িত তাদের অধিকাংশই শিশু। শৈশব পেরিয়ে কৈশোরে পা দেওয়ার আগেই তারা জড়িয়ে পড়ছে অন্য রকম এক অশুভ পৃথিবীর সঙ্গে। এখন দিনের বেলায়ও ফুটপাতে দেখা যায়, ১০-১১ বছরের কয়েকজন বালক মিলে দল বেঁধে পলিথিনের মধ্যে মুখ গুঁজে বুঁদ হয়ে আছে। আবার এদের নিজেদের মধ্যে অর্থ ভাগাভাগি নিয়ে দ্বন্দ্বে জড়িয়ে ছুরিকাহত হতে দেখা গেছে অনেকবার। বিভিন্ন মার্কেটে ভিড়ের মধ্যে ক্রেতাদের মানি ব্যাগ, মোবাইলসহ বিভিন্ন জিনিস চুরি করতেও সিদ্ধহস্ত এরা। ফুটপাত, আন্ডারপাস ও ফ্লাইওভারে বেড়ে ওঠা প্রজš§ কখনোই জাতির জন্য নিরাপদ নয়।
ভাসমান যুবকদের একটি অংশ দিনের বেলায় রিকশা, অটোরিকশা চালায় আর রাতের অন্ধকারে ছিনতাই করে। রাতে যার চোখের পাতা বুজে মাথা গোঁজার ঠাঁই নেই তার কাছ থেকে উন্নত চিন্তা কীভাবে আশা করব আমরা! ভাসমান জনগণ বেড়ে যাওয়ার আরও একটি কারণ হলো, রাজধানীর বস্তিগুলো উচ্ছেদ এবং এদের পুনর্বাসন না করা। রাজধানীতে বস্তি পোড়ানো তো এখন উৎসবে পরিণত হয়েছে। এসব বস্তিতে থাকা লোকজন উদ্বাস্তু হয়ে যায়। শুধু তাই নয়, রক্ত পানি করা সামান্য সঞ্চয়টুকুও ছাই হয়ে যায় বস্তির বেড়ার সঙ্গে। একেবারে শূন্য হাতে নেমে পড়তে হয় রাস্তায়। কারও কারও হয়তো অন্য কোনো বস্তিতে জায়গা হয় কিন্তু অধিকাংশেরই নামতে হয় খোলা আকাশের নিচে। বিক্ষিপ্ত ও বারবার পুড়ে যাওয়া মন নিয়ে যখন শূন্য হাতে ক্ষুধার্ত পেট নিয়ে রাস্তায় নামে তার কাছ থেকে ভালো কিছু আশা করাই তো অন্যায়।
রাত ১০টায় অফিস থেকে বাসায় ফেরার সময় প্রতিদিন দেখি কারওয়ান বাজারের বিএসইসি ভবনের দেয়ালঘেঁষে কয়েকজন বয়স্ক লোক শুয়ে থাকেন। কারও গায়ে একটি চাদর আর কারও গায়ে বড়জোর একটি গামছা থাকে। বিষণœ মনে প্রতিদিন তাদের দেখতে দেখতে যাই। বাসায় পৌঁছাতে পৌঁছাতে সব উধাও হয়ে যায় মন থেকে। কথায় বলে, প্রাণ থাকলেই প্রাণী হয়, মন না থাকলে মানুষ হওয়া যায় না। আসলে কংক্রিটের দেয়ালে বাড়ি খেতে খেতে মনের চারদিকে সিমেন্টের আস্তর পড়েছে কি না, তাই মানুষের খাতা থেকে খারিজ হয়ে গেছি। আর খারিজ না হলেই বা কী করার আছে আমাদের? এত এত মানুষের জন্য একজন ব্যক্তির কী করার থাকে!
কিন্তু একটি দেশের সরকারের তো এসব ভাসমান মানুষের করার অনেক কিছু আছে। তাদের মনের বাইরের সিমেন্টের আস্তর কি কোনো দিন উঠবে না, নাকি দিন দিন কংক্রিটে চাপা পড়বে? শুধু সরকার নয়, করপোরেট মালিকরাও পারে এসব অসহায় লোকদের আশ্রয় ও দুমুঠো খাবার দিতে। এমন উদাহরণ তো এদেশে রয়েছেই। পুরান ঢাকার ১০৯ নবাবপুর রোডের মদনমোহন অন্নছত্র ট্রাস্ট ১৯২৪ সাল থেকে নিয়মিত গরিবদের দুপুরের খাবার খাওয়ায়। এটি শুরু করেছিলেন তৎকালীন রাজা মদনমোহনের তিন ছেলে রজনীকান্ত পাল, মুরলীমোহন পাল ও প্রিয়নাথ পাল। এছাড়া বগুড়ার আকবরিয়া গ্র্যান্ড হোটেল অ্যান্ড রেস্টুরেন্টেরে মালিক প্রয়াত আকবর আলি মিঞা সেখানকার দরিদ্রদের রাতের খাবার দিতেন। ১৯১১ সাল থেকে আজও চালু রয়েছে সেই নিয়ম। ঠিক একইভাবে করপোরেট গ্রুপগুলো তো পারে রাত কাটানোর আশ্রয় দিতে। সরকার ও বেসরকারি কোম্পানিগুলো এগিয়ে এলে অসহায় লোকজন তো রেহায় পেত। ঢাকাবাসীও পেত একটি সুন্দর পরিচ্ছন্ন শহর।

গণমাধ্যমকর্মী