নিরাপদ সড়কের জন্য যেন আর রাস্তায় নামতে না হয়

নিরাপদ সড়কের দাবিতে চলা আন্দোলন বিশ্ব গণমাধ্যমে ব্যাপকভাবে আসায় ব্যবসায় ভাবমূর্তি বিনষ্ট হচ্ছে দেশের। ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, এমন পরিস্থিতিতে ভ্রমণ বাতিল করছেন বায়াররা। পরিবহন ব্যবস্থা ভালো হলে ব্যবসা-বাণিজ্যের জন্য তা সুফল বয়ে আনবে বলে অবশ্য মনে করেন অর্থনীতিবিদরা। রাজধানীতে বাসচাপায় দুই শিক্ষার্থীর মৃত্যুর পর নিরাপদ সড়কের দাবিতে সড়কে নামে শিক্ষার্থীরা। একপর্যায়ে গাড়ির কাগজপত্রও পরীক্ষা করতে থাকে তারা। এ অবস্থায় সরকার দাবি মানার ঘোষণা দিয়ে তাদের ঘরে ফেরার আহ্বান জানালে অঘোষিত ধর্মঘট শুরু করেন পরিবহন মালিক-শ্রমিকরা। এতে এক সপ্তাহ ধরে রাজধানীসহ সারা দেশে গণপরিবহন বন্ধ হয়ে যায়। সার্বিক যোগাযোগ ব্যবস্থা বিপর্যস্ত হয়। ভোগান্তি বাড়ে মানুষের। এরই মধ্যে শিক্ষার্থীদের ওপর বিভিন্ন স্থানে হামলা হয়। সংঘাতও বাধে। এসবের খবর ও ছবি ফলাও করে প্রচার হয় বিশ্ব গণমাধ্যমে। সে সঙ্গে ঢাকায় নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূতের গাড়িবহরে হামলার বিষয়টিও গুরুত্বসহ প্রচার হয় বিবিসিসহ আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলো। এ প্রেক্ষাপটে গতকাল শেয়ার বিজে প্রকাশিত ‘বিদেশে ক্ষুণœ হচ্ছে দেশের ইমেজ’ শীর্ষক প্রতিবেদন পাঠকদের দৃষ্টি আকৃষ্ট করবে। এতে চার বিশিষ্টজনের বক্তব্য রয়েছে। এর আগে তাজরীন ফ্যাশনসে অগ্নিকাণ্ডে শ্রমিকের প্রাণহানি, রানা প্লাজা ধসে তাদের মৃত্যু, হলি আর্টিজান হামলা প্রভৃতি কারণে বহির্বিশ্বে কেবল ভাবমূর্তি ক্ষুণœ হয়নি, ব্যবসায়ও বড় ক্ষতি হয়েছে। তাজরীন ও রানা প্লাজা দুর্ঘটনা পোশাকশিল্পে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। আমাদের কারখানা ভবনের নিরাপত্তার সীমাবদ্ধতায় কর্মপরিবেশ ও শ্রমিক সুরক্ষা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। এগুলোর ক্রেতারা জোট করে মান যাচাইয়ে নামে। এদিকে হলি আর্টিজানের ঘটনায় অনেক বিদেশি ব্যবসায়ী চলে যান। এখনও বাংলাদেশকে সিকিউরিটি থ্রেট অ্যালার্টে দ্বিতীয় ক্যাটেগরিতে রেখেছে জাপান। সম্প্রতি জাপান সফরে বাণিজ্যমন্ত্রীকে ‘বাংলাদেশ এখন বিদেশিদের জন্য নিরাপদ’ বলে আশ্বস্ত করতে হয়েছে বিনিয়োগকারীদের। ঠিক এ অবস্থায় শিক্ষার্থীদের আন্দোলন, সহিংসতা এবং গণপরিবহন ধর্মঘটে যোগাযোগব্যবস্থা ভেঙে পড়া বিদেশিদের কাছে ভালো বার্তা দেবে না। এফবিসিসিআইর সভাপতি বলেছেন, এমন আন্দোলন দেশের ব্র্যান্ডিংকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। এ অবস্থায় শিক্ষার্থীদের দাবি মেনে নিয়ে সরকার যেমন দূরদর্শিতার পরিচয় দিয়েছে, তেমনি সরকারি দলের কিছু লোক কোমলমতি শিক্ষার্থীদের ওপর হামলে পড়ে সেটাকে আবার অসার করে দিয়েছে। এর বদলে ছাত্রছাত্রীদের দাবি পূরণে দ্রুত ও দৃশ্যমান অগ্রগতি হলে অবস্থার উন্নতি হতো। আন্দোলনে আগ্রহ থাকত না অনেকের। তা হয়নি। এর মধ্যে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রবেশদ্বারের দুই পাশে স্পিডব্রেকার স্থাপন কিংবা সংলগ্ন রাস্তা ও ফুটপাত দখলমুক্ত করার প্রক্রিয়াও শুরু হয়নি। অথচ এর প্রতিশ্রুতি ছিল। এদিকে আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে দ্রুত চূড়ান্ত করা খসড়া আইনে অবহেলা বা বেপরোয়া গাড়ি চালনায় সর্বোচ্চ পাঁচ বছর কারাদণ্ড ‘গুরু অপরাধে লঘু দণ্ড’ হিসেবে গণ্য হতে পারে। আবার ড্রাইভিং লাইসেন্স প্রাপ্তির জন্য ন্যূনতম শিক্ষাগত যোগ্যতা অষ্টম শ্রেণি নির্ধারণ করা হয়েছে। এটিকে জেএসসি পাস করা যেত। শিক্ষার্থীদের আন্দোলন চলাকালে বারবারই বলা হয়, ‘তারা যা চায়, সেগুলো আইনেই আছে’। কিন্তু কার্যকর প্রয়োগ না হলে ‘আইন’ থেকে কী লাভ? আমরা চাই, বেপরোয়া যান চালনায় একটি প্রাণহানিও যেন না হয়। নিরাপদ সড়কের জন্য শিশুদেরও যেন আর রাস্তায় নামতে না হয়। এমন আন্দোলন-বিক্ষোভে দেশ অচল না হলে বহির্বিশ্বে আমাদের ভাবমূর্তিও ক্ষতিগ্রস্ত হবে না।