নিরাপদ সড়কের প্রতিপক্ষ চালক নাকি অন্য কেউ?

মো. রুহুল আমিন: সড়কে বাসচাপায় দুই শিক্ষার্থীর মৃত্যুর প্রতিবাদে তিন দিন অন্যরকম অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছে ঢাকা মহানগরী। আন্দোলনের ব্যাপকতা দেখে অনেকেই একে ‘কিশোর বিদ্রোহ’ আখ্যা দিয়েছেন। এসব কিশোর বলছে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, রফিক, সালাম, বরকত তাদের প্রেরণা। খুবই ইতিবাচক তাদের এমন মনোভাব। উত্তরা থেকে মতিঝিল, ধানমন্ডি থেকে গাবতলী গোটা শহর ছাপিয়ে এই আন্দোলনের উত্তাপ ছড়িয়ে পড়েছে চট্টগ্রামসহ দেশের অন্যান্য অঞ্চলেও। সরগরম সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম। প্রতিবাদী কণ্ঠ নিরাপদ সড়ক চায়; আমিও চাই, আপনিও চান। কারণ আমি, আপনি সবাই অনিরাপদ। তবে সমাধান চাইলে সমস্যার গোড়ায় যেতে হবে। নিরাপদ সড়কের প্রতিপক্ষকে খুঁজে বের করতে হবে।
শুরুতে সড়কে আমাদের ক্ষতি কীভাবে হচ্ছে, তা জেনে নিই। অনিরাপদ সড়কে মোটাদাগে তিন ধরনের ক্ষতির শিকার হচ্ছি আমরা। আর্থিক, মানসিক ও প্রাণহানি। আর্থিক ক্ষতি নিরূপণে অনেক গবেষণা দেশীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে হয়েছে। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের (এআরআই) প্রতিবেদন বলছে, শুধু ঢাকায় যানজটে প্রতিদিন নষ্ট হয় ৫০ লাখ কর্মঘণ্টা। অর্থের হিসাবে বছরে আর্থিক ক্ষতি হয় প্রায় ৩৭ হাজার কোটি টাকা। গবেষণায় উঠে আসে, এ নগরীতে প্রতিদিন গণপরিবহনগুলো ৩৬ লাখ ট্রিপ দেয়। ৩৫ শতাংশ যাত্রী যান কর্মক্ষেত্রে। ৮০ শতাংশ গণপরিবহনই ইঞ্জিনচালিত। যানজটের কারণে ব্যস্ত সময়ে গণপরিবহনের গতিবেগ ঘণ্টায় পাঁচ কিলোমিটারে নেমে আসে, যা হাঁটাগতির চেয়েও কম। গবেষকদের দাবি, নগরের যানজট যদি ৬০ শতাংশ কমানো যায়, তাহলে ২২ হাজার কোটি টাকা সাশ্রয় হবে। যদিও ২০১৫ সালের এক গবেষণায় দাবি করা হয়, ঢাকায় যানজটের আর্থিক ক্ষতি প্রায় এক লাখ কোটি টাকা।
যানজটের মানসিক ক্ষতিও ভয়াবহ। এআরআই’র প্রতিবেদনে আরও জানানো হয়, যানজটের কারণে সৃষ্ট মানসিক চাপ থেকে নানা ধরনের রোগ হতে পারে। ব্যক্তিগত ও সামাজিক জীবনে এর ব্যাপক প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, যানজটের কারণে মানুষ প্রয়োজনীয় বিশ্রামের সময় পাচ্ছে না। স্বজন ও অন্যের সঙ্গে ‘ন্যায্য’ আচরণের বদলে দুর্ব্যবহার করছে। আবার সময়মতো হাসপাতালে নেওয়া যাচ্ছে না বলে অনেকেই পথে মারা যাচ্ছেন।
অনিরাপদ সড়কের সবচেয়ে ভয়াবহ দিক প্রাণহানি ও শারীরিক ক্ষতি। গত ২৯ এপ্রিল বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতি জানায়, সড়কে দিনে গড়ে ১৭ জনের মৃত্যু হচ্ছে। চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত এক হাজার ৮৭১টি দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন এক হাজার ৯১৭ জন। আহত হয়েছেন পাঁচ হাজার ৫৫৮ জন। এছাড়া চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন আরও ২০৬ জন। অর্থাৎ চার মাসে প্রাণহানি হয়েছে দুই হাজার ১২৩ জনের। উদ্বেগজনক হলো, মৃত্যুর এই হার আগের বছরের তুলনায় বেশি। ফেব্রুয়ারিতে একটি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, ১৩ বছরে সড়কে ৫৯ হাজার ৯৪১টি দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন ৬৮ হাজারের বেশি মানুষ। আহত হয়েছেন দুই লাখেরও বেশি।
শুধু পরিসংখ্যান দিয়ে সড়ক দুর্ঘটনার ভয়াবহতা ব্যাখ্যা করা একটু কঠিন। সড়ক দুর্ঘটনার ভয়াবহতা বুঝতে হলে ভুক্তভোগীর কাছে যেতে হবে। আমাদের এক ভাই মারা যান সড়ক দুর্ঘটনায়। পেশায় তিনি চৌকিদার। পাশাপাশি কৃষিকাজ করতেন। দুই ছেলে ও স্ত্রী নিয়ে ভালোই চলছিলেন। স্বপ্ন দেখছিলেন ছেলে দুটোকে লেখাপড়া শিখিয়ে বড় করবেন। কিন্তু তার অকাল প্রয়াণ পরিবারটিকে পথে বসিয়ে দেয়।
এমন কেউ আছেন কি যিনি নিরাপদ সড়ক চান না? চালকরা কি নিরাপদ সড়ক চান, না-কি চান না? অনিরাপদ সড়কে তারা কী ক্ষতিগ্রস্ত হন না? খেয়াল করে দেখুন, আপনার-আমার চেয়ে চালক শ্রেণি আর্থিকভাবে অনেক দুর্বল। সড়ক দুর্ঘটনা তাদের পরিবারকেও কাঁদায়, পথে বসায়।
চলুন জেনে নিই সড়ক নিরাপত্তার দায় কার? সড়ক একক কোনো মন্ত্রণালয়ের অধীন নয়। একজন চালক ও তার গাড়ির অনুমোদন দেয় বিআরটিএ বা সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয়। আর সড়কে তাদের তদারক করে পুলিশ প্রশাসন বা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। যাত্রী যেহেতু ভোক্তা, তাই বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে এখানে। সেবা না পেলে আপনি ভোক্তা অধিকারে যেতে পারেন। আবার চালক যেহেতু শ্রমিক, তাই তার অভিভাবক শ্রম মন্ত্রণালয়। এ মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন নিয়ে তাদের সংগঠন করতে হয়। আবার ঢাকায় যেহেতু ফুট ওভারব্রিজ লাগে, সেহেতু এখানে সিটি করপোরেশনও সম্পৃক্ত। অর্থাৎ এটি বিশাল এক কর্মপরিধি।
এবার জেনে নিই দুর্ঘটনার কারণ চালকের অদক্ষতা, অসচেতনতা, ফিটনেসবিহীন গাড়ি, বেহাল সড়ক; না যাত্রীর অসচেতনতা, তদারকির অভাব। মোটামুটি এসব কারণে সড়ক দুর্ঘটনা সংঘটিত হয়।
এবার মূল আলোচনায় আসা যাক। ঢাকার কথাই ধরি। এখানে কোনটা বড় সমস্যাÑচালকের অদক্ষতা, ফিটনেসবিহীন গাড়ি, যাত্রী সচেতনতা, নাকি তদারকির অভাব। তার আগে চিন্তা করুন, দক্ষ চালক কি দুর্ঘটনা ঘটান না, ভালো গাড়ি কি দুর্ঘটনায় পড়ে না, সচেতন যাত্রী কি মারা যান না? একটা কথা সবাই স্বীকার করবেন, ঢাকায় বাসচালকরা একেবারেই বেপরোয়া। কারণ কী? দিনশেষে মোটা অংকের টাকা দিতে হয় মালিককে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা জ্যামে বসে থেকে চালক সেই টাকা তুলবেন কী করে? যেটুকু সময় তিনি গাড়ি চালানোর জন্য পান, তাকে নিজের পরিবার আর মালিকের পরিবার দু’পক্ষের কথা ভেবেই গাড়ি চালাতে হয়। তাই তিনি বেপরোয়া। আপনারা অনেকেই হাতিরঝিল বাস সার্ভিস বা ‘ঢাকার চাকা’য় উঠেছেন। এ গাড়িগুলোকে কি এমন প্রতিযোগিতা করতে দেখেছেন, যেমনটা করে জাবালে নূর কিংবা বিহঙ্গ অথবা বলাকা? ঢাকার চাকা বা হাতিরঝিলের বাস সরাসরি পরিচালনা করেন মালিক। গাড়ির স্টাফ টাকা আদায়ে জড়ান না। তাই তারা প্রতিযোগিতায়ও নামেন না। অর্থাৎ চালকদের বেপরোয়া হতে বাধ্য করছেন মালিক, অদক্ষ চালকের হাতে গাড়ি তুলে দিচ্ছেন মালিক। আমি, আপনি মরছি; ক্ষতি হচ্ছে আমাদের পরিবারের। কিন্তু গাড়ির ক্ষতি হলে মালিক ঠিকই বিমার টাকা আদায় করে নিচ্ছেন কিংবা ব্যাংকের কিস্তি ফাঁকি দিচ্ছেন।
তাহলে আমাদের সবার আগে মালিকের বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে হবে। আরেকটু ভাবুন। রাস্তায় অগণিত ফিটনেসবিহীন গাড়ি, অসংখ্য লাইসেন্সবিহীন চালক। এদের থামাবে কে? পুলিশ? তারা কি থামায়? তারা তো টাকার বিনিময়ে এগুলোকে বৈধতা দিচ্ছে প্রতিনিয়ত। দেখেও না দেখার ভান করছে। এ কারণে মালিক যখন পুলিশকে বললেন আমার গাড়ি রক্ষা করতে না পারলে আপনাদের মাসোহারা বাতিল। ঠিক তখনই ছেলে-মেয়ে নির্বিশেষে বাচ্চাগুলোর ওপর চড়াও হলো পুলিশ।
এদেশে কর্মের বড় অভাব। এর মধ্যে গাড়ি চালনার কাজটা সহজে পাওয়া যায়। তাই ১২ বছরের ছেলেটিও চালক হতে চায়। বাবা-মায়ের মুখে অন্ন তুলে দিতে চায়। এতে অন্যায় কিছু দেখি না। অন্যায় হয় তখনই যখন তার হাতে গাড়ির চাবি দেওয়া হয়; অন্যায় হয় তখনই যখন অনেকেই টাকা নিয়ে খুশি থাকে।
ঢাকায় একটি সমন্বিত পরিবহন ব্যবস্থার দাবি অনেক দিনের। যেখানে থাকতে পারে সরকারি-বেসরকারি দু’ধরনের বিনিয়োগই। উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রয়াত মেয়র আনিসুল হক উদ্যোগ নিয়েছিলেন। তার অবর্তমানে নিরাপদ সড়কের দাবি থেমে থাকতে পারে না।
সারা দেশের সড়কগুলোকে নিরাপদ করতে চালকের প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করা যেমন জরুরি, তেমনি থাকতে হবে সার্বক্ষণিক তদারকি। জরুরি যাত্রী সচেতনতাও। নিজের ইচ্ছামতো স্থানে গাড়িতে ওঠানামা করা, চলন্ত গাড়িতে লাফিয়ে ওঠা, গাড়ি থামার আগেই নেমে যাওয়া এসবে দায় আছে যাত্রীরও। সরকারের স্বপ্ন রূপকল্প-২০৪১ বাস্তবায়ন। এ রূপকল্প একটি সমৃদ্ধ ও উন্নত দেশের। প্রতিবছর অর্থনীতির আকার বাড়ছে প্রায় সাত শতাংশ হারে। সমুদ্র বিজয়ের পর বাংলাদেশের নিশান উড়ছে মহাকাশে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ধারা অব্যাহত রাখতে নিশ্চিত করতে হবে সময় ও জীবনের মূল্য।

গণমাধ্যমকর্মী

[email protected]