নিরাপদ সড়ক গড়তে চাই আইনের কঠোর প্রয়োগ

জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবস আজ

কাজী সালমা সুলতানা: আজ ‘জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবস’। সড়ক নিরাপত্তা নিয়ে জনসচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্যে দিবসটি পালিত হবে। দিবসটিতে এবারের প্রতিপাদ্য ‘আইন মেনে চলবো, নিরাপদ সড়ক গড়বো’। গতবারের প্রতিপাদ্য ছিল ‘সাবধানে চালাবো গাড়ি, নিরাপদে ফিরবো বাড়ি’। শ্রমঘণ্টা না মেনে একটানা পাঁচ ঘণ্টার বেশি মোটরযান চালানো, বেপরোয়া গতি, অতিরিক্ত যাত্রী বা ওজন বহন, অননুমোদিত ওভারটেকিং, ট্রাফিক আইন না মানা সড়ক দুর্ঘটনার প্রধান কারণ। এসব প্রেক্ষাপটে এবারের প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
সড়ককে নিরাপদ জনবান্ধব করতে এবার আইন মেনে চলার প্রতি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। আইনের গুরুত্ব বুঝতে হলে আইনের প্রয়োগ থাকাটা জরুরি। আমাদের দেশে যেখানে চালকের ন্যূনতম শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা নেই, সেখানে তাদের কীভাবে আইন মানতে বাধ্য করা যায়? সেক্ষেত্রে সড়ক পরিবহন বিভাগ চালকদের তালিকা করে ক্রমান্বয়ে তাদের বিশেষ প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে পারে। চালক ও হেলপারদের ডেটা করে যথাযথ প্রশিক্ষণ দেওয়া হলে এর কিছুটা সুফল যোগাযোগ ব্যবস্থায় পড়বে।
নিরাপদ সড়কের দাবিতে গত ২৯ জুলাই দেশব্যাপী প্রচণ্ড বিক্ষোভে রাজপথে নেমে এসেছিল স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা। কুর্মিটোলায় শহীদ রমিজ উদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট স্কুল অ্যান্ড কলেজের দুই কলেজ শিক্ষার্থী বাসের চাকায় পিষ্ট হওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন রাস্তার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ট্রাফিকের দায়িত্ব পালন করে। নজিরবিহীন্্ ওই আন্দোলনে প্রায় আট দিন অচল হয়ে পড়েছিল রাজধানীসহ গোটা দেশ।
আন্দোলনের শুরুতেই শিক্ষার্থীরা রাজপথে নেমে চালকের লাইসেন্স ও যানবাহনের কাগজপত্র পরীক্ষা করা শুরু করে। এতে পরিবহন খাতের অব্যবস্থাপনার ভয়াবহ চিত্র ফুটে ওঠে। মন্ত্রী, সংসদ সদস্য, রাজনৈতিক নেতা, সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, আইনপ্রয়োগকারী সংস্থার সদস্য, সাধারণ নাগরিক নির্বিশেষ সবাই আইন অমান্য করে রাস্তায় চলাচল করে থাকে। কেউই আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল নয়। স্কুল শিক্ষার্থীরা কমপক্ষে দুজন মন্ত্রী, বিচারপতি, সংসদ সদস্য, সচিব পদমর্যাদার একজন, পৌরমেয়র এবং পুলিশের ডিআইজিসহ অনেকের লাইসেন্সবিহীন গাড়ি থামিয়েছে। লাইসেন্সবিহীন অবস্থায় ধরা পড়ে নির্বাচন কমিশনের গাড়িও। এ তালিকায় রয়েছে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের গাড়িও।
সড়ক দুর্ঘটনা রোধে সরকারের পক্ষ থেকে দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ তখনও ছিল না। অভিযোগ ছিল, গাড়ির লাইসেন্স বা ফিটনেস সনদ পেতে বিআরটিএতে গাড়ি নেওয়ার কোনো প্রয়োজন হয় না। গাড়ির ধরনভেদে নির্ধারিত সরকারি ফি’র অতিরিক্ত টাকা দিলে দিনে দিনেই সনদ পাওয়া যায়। গাড়িচালকের লাইসেন্সও পাওয়া যায় একই উপায়ে। আবার অনেক ক্ষেত্রে রাস্তায় গাড়ি চালাতে লাইসেন্সও প্রয়োজন হয় না। ট্রাফিক পুলিশকে ম্যানেজ করে অতি সহজেই গাড়ি চালানো যায়। দেশব্যাপী শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভের পর সরকার সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে ২০টি সিদ্ধান্ত নেয়। সড়ক পরিবহনবিষয়ক উপদেষ্টা পরিষদের সভায় এসব সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
সড়কে শৃঙ্খলা আনতে এসব সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এসব সিদ্ধান্তের মধ্যে রয়েছে মহাসড়কে শূন্য গতির গাড়ি বন্ধ করা। তাছাড়া সড়ক-মহাসড়কে ইজিবাইক, লেগুনা, নসিমন-করিমন যানবাহনগুলো কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হবে। সেইসঙ্গে মহাসড়কে যানবাহনের গতি ৮০ কিলোমিটার নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে। উপদেষ্টা পরিষদ ঢাকা শহরের যানবাহনের বিষয়েও বেশ কিছু সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যা খুবই ইতিবাচক। ঢাকায় রংচটা বিবর্ণ যানবাহন চলাচল নিয়ন্ত্রণ করা হবে। এসব যানবাহনকে সঠিকভাবে রং করে তারপর রাস্তায় নামতে হবে। সেইসঙ্গে ফিটনেসের বিষয়টিও কঠোরভাবে দেখা হবে বলে জানানো হয়েছে।
আন্দোলনের মুখে সড়ক-মহাসড়কে দুর্ঘটনার বড় একটি কারণ ইজিবাইক, লেগুনা, নসিমন-করিমন যানবাহনগুলোকে বাতিল করা হয়েছে।
ঢাকা শহরের যানবাহনের বিষয়ে নেওয়া সিদ্ধান্তগুলো অত্যন্ত সুচিন্তাপ্রসূত। বিশ্বের কোনো রাজধানী শহরে এমন এবড়োথেবড়ো, রংচটা বিবর্ণ যানবাহন চলতে দেখা যায় না। এছাড়া গাড়িচালক ও হেলপারদের ট্রিপভিত্তিক মজুরির পরিবর্তে মাসভিত্তিক মজুরি নির্ধারণও অত্যন্ত জরুরি। রেষারেষি করে বেপরোয়া গাড়ি চালানো বন্ধ করার এটি প্রথম পদক্ষেপ। রেষারেষি করে গাড়ি চালানোই ঢাকা শহরের সড়ক দুর্ঘটনার বড় কারণ।
সড়ক দুর্ঘটনার পেছনে প্রধান কারণ চালকদের যথাযথ প্রশিক্ষণ এবং লাইসেন্স না থাকা। দেশের মোট প্রায় ৩৬ লাখ যানবাহনের জন্য ১৮ লাখ লাইসেন্সধারী গাড়িচালক। এ বিষয়ে নজর দিয়ে পর্যাপ্ত সংখ্যক গাড়িচালক তৈরি করা দরকার। এজন্য বিআরটিএকে শক্তিশালী করা ও প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটের কার্যক্রমকে আরও জোরদার করতে হবে।
ইতোমধ্যে পরিবহন খাতের এমন চিত্র নিয়ে সড়ক পরিবহন আইন-২০১৮ মন্ত্রিসভায় ৬ আগস্ট অনুমোদন লাভ করেছে। পরে আইনটি সংসদেও পাস হয়। এ আইনে সর্বোচ্চ সাজা পাঁচ বছরের কারাদণ্ড ও জরিমানার বিধান রাখা হয়। আইনের ভেতরের বিষয়বস্তু নিয়ে আপত্তি জানিয়েছিল রোড সেইফটি ফাউন্ডেশন ও নিরাপদ সড়ক চাই নামের দুটি সংগঠন। তাদের বক্তব্য এ আইনে সড়ক নিরাপত্তার বিষয়গুলো তেমন গুরুত্ব পায়নি। পরিবহন মালিক, শ্রমিক এবং যাত্রী বা জনসাধারণ অর্থাৎ সব পক্ষের স্বার্থ সুরক্ষা হয়নি। মূলত মালিক পক্ষের স্বার্থকেই আইনে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। সড়ক পরিবহন আইনে চালকদের সাজার পরিমাণ বৃদ্ধি করা যেমন জরুরি, তেমনি চালকদের নিয়োগ নীতিমালাসহ পেশাগত সুযোগ-সুবিধা, দৈনিক কর্মঘণ্টা, আর্থিক ও সামাজিক নিরাপত্তার বিষয়গুলো স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা প্রয়োজন। অতিরিক্ত কর্মঘণ্টার কারণে দুর্ঘটনা ঘটলে চালকের জন্য যে শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে, মালিকের জন্যও তা প্রযোজ্য হওয়া উচিত।
অনেক ক্ষেত্রেই দুর্ঘটনা রোধে জনগণের সচেতনতার অভাব রয়েছে। সেগুলো একেবারেই রাস্তা পার হওয়া বা ফুটপাত দিয়ে চলাচলের ক্ষেত্রে। এজন্য জনগণকে সচেতন করার প্রয়োজন রয়েছে। কিন্তু দুটি গাড়ির মুখামুখি সংঘর্ষ, ওভারটেকিং করতে গিয়ে গাড়ি রাস্তায় পড়ে যাওয়া, বেপরোয়া গাড়ি চালিয়ে খাদে গাড়ি পড়ে যাওয়ার মতো ঘটনায় জনগণের কোনো দায় নেই। বাংলাদেশ যাত্রীকল্যাণ সমিতির হিসাব মোতাবেক ২০১৭ সালে দেশে সড়ক দুর্ঘটনায় মারা গেছে সাত হাজার ৩৯৭ জন। এসব দুর্ঘটনার বড় কারণ হিসেবে চালকের অদক্ষতাকে দায়ী করা হয়েছে। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের (এআরআই) এক গবেষণায় দেখা গেছে, ৯০ শতাংশ দুর্ঘটনা ঘটে চালকের বেপরোয়া মনোভাব ও গতির কারণে।
আইন প্রণয়ন করে দুর্ঘটনা রোধ করার মতো বাস্তব পরিস্থিতি বিদ্যমান নয়। এজন্য প্রয়োজন বিপুলসংখ্যক দক্ষ গাড়িচালক গড়ে তোলা। এ কাজে বিআরটিএকেই এগিয়ে আসতে হবে। একটি সুনির্দিষ্ট সময় নির্ধারণ করে প্রয়োজনীয় দক্ষ গাড়িচালক তৈরি করতে হবে। একইসঙ্গে গাড়ির ফিটনেস বিষয়ে কঠোর অবস্থান গ্রহণ করতে হবে। বিশ্বের কোনো দেশের রাজধানীতে এমন রংচটা এবড়োথেবড়ো গাড়ি দেখা যায় না। এসব গাড়ির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। গাড়িচালকের জন্য ট্রিপভিত্তিক মজুরি নির্ধারণ না করে দেশের অন্যান্য খাতের মতো নির্ধারিত বেতনের ব্যবস্থা করতে হবে। রুটভিত্তিক চলমান মানসম্পন্ন গাড়িগুলো নিয়ে একটি কোম্পানি গঠন এবং এই কোম্পানিকে নির্দিষ্ট রুটে গাড়ি চালানোর ব্যবস্থা করতে হবে। তাহলে রোষারেষি বন্ধ করা সম্ভব হবে।

ঢাকা মহানগরীতে একসময় নির্ধারিত স্থানের বাইরে গাড়ি থামত না। অর্থাৎ যাত্রীদের বাসস্ট্যান্ড থেকে উঠতে হতো এবং বাসস্ট্যান্ডেই নামতে হতো। কিন্তু এখন ঢাকার গণপরিবহন ব্যবস্থা দেখে মনে হয় পুরো ঢাকা শহরই যেন বাসস্ট্যান্ড। যেখানে যাত্রী পাচ্ছে, সেখান থেকেই তুলছে। আবার যেখানে যাত্রীর ইচ্ছে সেখানেই নামিয়ে দিচ্ছে। এজন্য ওই গাড়িটি রাস্তার পাশেও চাপানো হচ্ছে না। রাস্তার মাঝখান থেকেই যাত্রী উঠানো বা নামানো হচ্ছে। এভাবে যাত্রী উঠানো-নামানো যে কতটা ঝুঁকিপূর্ণ তা গাড়িচালক, গাড়ির হেলপার এমনকি ওই যাত্রীরও ধারণা নেই। এছাড়া এভাবে যত্রতত্র গাড়ি দাঁড় করানোর ফলে তার পেছনে যে অসংখ্য গাড়ি যানজটে আটকা পড়ছে সেদিকেও ভ্রুক্ষেপ নেই গাড়িচালকের। রাস্তার মাঝে গাড়ি থামিয়ে যাত্রী উঠানো-নামানোর পর যে কোনো সময় পেছন থেকে আসা আরেকটি বাসের নিচে জীবন চলে যেতে পারে যাত্রীর।
একই সঙ্গে সড়ক দুর্ঘটনায় পথচারীদের অসতর্কতাও দায়ী। সড়ক নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, গাড়িচালক ও পথচারীর অসর্তকতা এবং বেপরোয়া গতিতে গাড়ি চালানো সড়ক দুর্ঘটনার প্রধান কারণ। রাজধানীতে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহতের ৭২ শতাংশই পথচারী। সারা দেশে যত দুর্ঘটনা ঘটে তার জন্য পথচারীরাও অনেকাংশে দায়ী। পথচারীরা যদি সতর্কতার সঙ্গে রাস্তা পারাপার হয় তাহলে প্রাণহানীর সংখ্যা কমে আসবে। যানবাহনে অতিরিক্ত যাত্রী হওয়া, ট্রাকে যাত্রী হওয়া, ট্রাকের মালামালের ওপর যাত্রী হওয়া থেকে বিরত থাকতে হবে। সড়ক দুর্ঘটনা বিশেষজ্ঞ বুয়েটের অধ্যাপক শামসুল হক বলেছেন রাস্তার ওপর ফেরিওয়ালা ও বেচাকেনাও পথচারীদের ঝুঁকির অন্যতম কারণ। বিশিষ্ট নগর পরিকল্পনাবিদ স্থপতি মোবাশ্বের হোসেন বলেন, আইনের কঠোর প্রয়োগ থাকতে হবে এবং প্রয়োগ হতে হবে ৩৬৫ দিন ২৪ ঘণ্টা, অর্থাৎ সর্বক্ষণ, সব জনগণের জন্য সমান হবে। প্রতিদিন সড়কে যাতায়াত যেন জীবনমৃত্যুর সংগ্রাম। দেশের জনগণ যেন পরিবহন মালিকের হাতে জিম্মি। চালকের স্বেচ্ছাচারিতা, যখন তখন ওভারটেক করা, অতিরিক্ত জোরে গাড়ি চালনায় পথচারীর মৃত্যু হলে চালকের শাস্তি নিশ্চিত করা যায় না। দুর্ঘটনা ঘটানো অপরাধীর গাড়িচালকের পক্ষ নিয়ে সারা দেশে পরিবহন ধর্মঘট শুরু হয়ে যায়। এজন্য প্রয়োজন গণপরিবহন ব্যবস্থার উন্নয়নে সরকারি উদ্যোগ। সরকারি এ উদ্যোগের পাশাপাশি পথচারী, ট্রাফিক পুলিশ, পরিবহন মালিক ও চালকের দায়িত্ববোধ ও আন্তরিক সচেতনতার সমন্বয়ই পারে নিরাপদ সড়ক গড়তে।

গণমাধ্যমকর্মী
[email protected]