নির্ধারিত সময়ে সমন্বয় হোক ঋণ-আমানত অনুপাত

সংশোধিত হারে ঋণ-আমানত অনুপাত সমন্বয়ের জন্য তফসিলি ব্যাংকগুলোকে নতুন সময়সীমা নির্ধারণ করে দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। নিয়ন্ত্রক সংস্থাটির জারি করা সার্কুলার অনুযায়ী, এক্ষেত্রে ব্যাংকগুলো সময় পাবে আগামী বছরের ৩১ মার্চ পর্যন্ত। ব্যাংকার ও এ খাতের বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের উদ্যোক্তাদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতেই কেন্দ্রীয় ব্যাংক নিয়েছে এমন সিদ্ধান্ত। অনেকের মনে থাকার কথা, প্রথমে এ সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছিল চলতি বছরের জুন পর্যন্ত; পরে বাড়িয়ে ডিসেম্বর পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয় সেটি। এ সিদ্ধান্ত যে নিয়ন্ত্রক সংস্থার পক্ষ থেকে বড় ধরনের ছাড়, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। আমরা আশা করি, নিয়ন্ত্রক সংস্থাটির নির্দেশনা পরিপালনে ব্যাংকগুলো এখন থেকেই প্রস্তুতি গ্রহণ করবে। তাহলে যেসব প্রতিষ্ঠানের ঋণ-আমানত অনুপাত কেন্দ্রীয় ব্যাংক নির্ধারিত হারের বাইরে রয়েছে, যথাসময়ে তাদের পক্ষে সেটি সীমার মধ্যে আনা সম্ভব হবে।

ব্যাংকগুলোর জন্য ঋণ-আমানত অনুপাত নির্ধারণ করে দেওয়া হয় আমানতকারীর স্বার্থ সুরক্ষার জন্য। এটি লঙ্ঘন করলে রয়েছে জরিমানার বিধান। আমরা দেখেছি, এ হার সংশোধনের আগেও বেশ কয়েকটি ব্যাংকের ঋণ-আমানত অনুপাত ছিল নির্ধারিত সীমার বাইরে। পর্যাপ্ত নগদ অর্থ সংরক্ষণে ব্যর্থ হওয়ায় জরিমানা গুনতে হয়েছে কয়েকটি ব্যাংককে। এ থেকে স্পষ্ট, আমানতকারীর স্বার্থ সুরক্ষায় সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ খুব একটা মনোযোগী নন। বস্তুত কোনো ব্যাংক চাহিদামতো নগদ অর্থ পরিশোধ করতে না পারলে তার প্রতি সৃষ্টি হয় গ্রাহকের অনাস্থা। বেসরকারি ব্যাংক খাতে আংশিকভাবে হলেও যে সংকট চলমান, তার সূচনা কিন্তু এমন একটি ঘটনা থেকেই। এজন্য সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের নীতিনির্র্র্র্র্ধারকদের উচিত হবে পর্যাপ্ত নগদ অর্থ সংরক্ষণে গুরুত্ব দেওয়া। ঋণ-আমানত অনুপাত তারা যদি সীমার মধ্যে না রাখেন, তাহলে কাজটি কঠিন হয়ে পড়বে বৈকি।

ব্যাংক মুনাফামুখী ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান। গ্রাহকের কাছ থেকে সংগৃহীত আমানত বিনিয়োগ করে সেখান থেকে আয় করাই এ ধরনের প্রতিষ্ঠানের প্রধান কাজ। আগে গ্রাহকের নগদ চাহিদা মেটানোর জন্য বাধ্যতামূলকভাবে সাড়ে ছয় শতাংশ অর্থ কেন্দ্রীয় ব্যাংকে সংরক্ষণের বিধান ছিল। বর্তমান পরিস্থিতিতে সেক্ষেত্রেও এক শতাংশ ছাড় দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এ থেকে স্পষ্ট, ব্যাংকগুলো ঋণ-আমানত অনুপাত হ্রাসকৃত সীমার মধ্যে নিয়ে এলেও তাদের আয়ে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে না। সাড়ে পাঁচ শতাংশ সঞ্চিতি গ্রাহকের নগদ অর্থের চাহিদা মেটাতে যথেষ্ট কিনা, তা নিয়েও রয়েছে প্রশ্ন। এ অবস্থায় আমরা চাইব, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশিত সীমার মধ্যে থেকেই গ্রাহক স্বার্থ সুরক্ষায় সচেষ্ট হবে প্রতিটি ব্যাংক।

গত বছর দেশের ব্যাংক খাতে আমানতের তুলনায় ঋণ প্রবৃদ্ধি হয়েছে অপেক্ষাকৃত বেশি। এর অন্যতম কারণ হলো, ওই সময়ে আমানতে সুদের গড় হার ছিল মূল্যস্ফীতির হারের নিচে। এ কারণে খাতটিতে আগ্রহ হারিয়েছিলেন আমানতকারীদের উল্লেখযোগ্য অংশ। এখান থেকে অর্থ তুলে নিয়ে তারা বরং বিনিয়োগ করেছেন অন্যখানে। এটাও কিছু ব্যাংকের ঋণ-আমানত অনুপাত সীমার বাইরে চলে যাওয়ার অন্যতম কারণ। বিনিয়োগে কয়েকটি ব্যাংকের আগ্রাসী নীতি সংকটকে আরও তীব্র করেছে। বাড়তি আয়ের জন্য কোনো প্রতিষ্ঠানের এমন নীতি অনুসরণ গ্রাহক স্বার্থের জন্যও ইতিবাচক নয়। এতে বেড়ে ওঠে খেলাপি ঋণ। এ অবস্থায় বিধিবদ্ধ সঞ্চিতি সংরক্ষণ করতে গিয়ে আবার কমে যায় ব্যাংকের প্রকৃত আয়। তাতে আবার ক্ষতিগ্রস্ত হন সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের শেয়ারে বিনিয়োগকারীরা। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে নতুন আমানত আকর্ষণে সুদের হার বেশ কিছুটা বাড়িয়েছে একশ্রেণির ব্যাংক। আমরা চাইব, তাদের শেয়ারে বিনিয়োগকারীদের প্রতিও থাকুক এসব প্রতিষ্ঠানের নীতিনির্ধারকদের দৃষ্টি। ঋণ-গ্রাহকের বিষয়েও তাদের মধ্যে থাকা চাই সুবিবেচনা। কোনো প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ যদি এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সবার স্বার্থ সুরক্ষায় সক্ষম না হয় বর্তমান পরিস্থিতিতে তাদের সামনে হাজির হতে পারে নানামুখী সংকট।