নির্বাচনী বছরে আলোচনায় মালয়েশিয়া সেকেন্ড হোম

পলাশ শরিফ: নির্বাচনী বছরে আলোচনায় এখন মালয়েশিয়া সেকেন্ড হোম। নিজের অর্জিত সাদা-কালো টাকার নিরাপত্তা পেতে একটি শ্রেণি মালয়েশিয়াকে বেছে নিচ্ছে। আর তাদের সেবা দিতে এগিয়ে এসেছে বেশ কিছু প্রতিষ্ঠান। বাংলাদেশ ব্যাংক ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ড স্বপ্নের সেকেন্ড হোমের কোনো বৈধতা না দিলেও অবৈধভাবেই চলছে মালয়েশিয়ায় সেকেন্ড হোম। পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দিয়ে বেশ কিছু প্রতিষ্ঠান চালাচ্ছে তাদের কার্যক্রম।
প্রাপ্ত তথ্যমতে, সিএম ইন্টারন্যাশনাল ইমিগ্রেশন সার্ভিস নামের একটি প্রতিষ্ঠানের নামে ১৪ মে একটি জাতীয় দৈনিকে ‘সেকেন্ড হোম’ প্রকল্পে বিনিয়োগের বিজ্ঞাপন দেওয়া হয়েছে। সেখানে ‘মালয়েশিয়া মাই সেকেন্ড হোম প্রোগ্রাম মালয়েশিয়া সরকারের একটি বিশেষ কার্যক্রম। এ কার্যক্রমের আওতায় ব্যবসায়ী, শিল্পপতি, করপোরেট নির্বাহী, উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা এবং উচ্চ আয়ের মানুষ মালয়েশিয়ায় শিল্পে বিনিয়োগ, ব্যবসা-বাণিজ্য পরিচালনা ও স্থায়ীভাবে বসবাস করতে পারবেন। তাই মালয়েশিয়াকে আপনার সেকেন্ড হোম হিসেবে বেছে নিতে চাইলে আজই আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করুন। সিএম ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেড বিগত ২৩ বছর ধরে আপনাদের সেবায় নিয়োজিত’ বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
মালয়েশিয়া যেতে আগ্রহী হিসেবে পরিচয় দিয়ে বিজ্ঞাপনে উল্লেখিত সেলফোন নম্বরে কয়েক দফা যোগাযোগ করা হয়। পরে ওই প্রতিষ্ঠানের ব্যবহƒত অন্য একটি সেলফোন নম্বর থেকে ফোন করে প্রতিষ্ঠানটির ফারুক নামে এক কর্মকর্তা জানান, ‘আমরা প্রায় ২৫ বছর ধরে কাজ করছি। মালয়েশিয়া সরকার সেকেন্ড হোম সুবিধা চালুর পর আমরাই প্রথম ২০০৫ সালে ওই কার্যক্রম বাংলাদেশে নিয়ে আসি। এখন পর্যন্ত প্রায় চার হাজার ব্যক্তি আমাদের মাধ্যমে সেকেন্ড হোম সুবিধা নিয়েছেন। আমরা কারও এজেন্ট নই, আমরা কনসালটেন্সি করি। মালয়েশিয়ান একটি ল’ ফার্মের মাধ্যমে গ্রাহকের হয়ে কাজ করি। আমরা এজন্য দুই লাখ টাকার মতো কনসালটেন্সি ফি নিই। গ্রাহকের হয়ে পুরো প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন করি। আর মালয়েশিয়ায় টাকা নেওয়ার দায়িত্ব গ্রাহকের, আমরা কোনো দায়দায়িত্ব নিতে চাই না। তবে সেলফোনে বেশি কিছু বলা যাচ্ছে না। এসব বিষয়ে সাক্ষাতে বিস্তারিত বলা যাবে।’
বাংলাদেশ ব্যাংকের দায়িত্বশীলরা বলছেন, বর্তমানে চলতি ব্যাংক হিসাবের মাধ্যমে আমদানি-রফতানি, বিদেশে পড়াশোনা ও চিকিৎসার জন্য টাকা স্থানান্তরের সুযোগ রয়েছে। এজন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদন নিতে হয়। এর বাইরে বিদেশে বিনিয়োগের জন্য মূলধন হিসেবে টাকা স্থানান্তরের কোনো সুযোগ নেই। এ অবস্থায় সেকেন্ড হোমের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদন ছাড়া অবৈধ পন্থায় মালয়েশিয়ায় অর্থ পাচার করা হচ্ছে। ১৯৪৭ সালে প্রণীত বাংলাদেশ ফরেন একচেঞ্জ রেগুলেশন অনুযায়ী এভাবে অর্থ সরিয়ে নিয়ে তা বিনিয়োগ করা শাস্তিযোগ্য অপরাধ।
বনানীর ই-ব্লকের ১৩/সি রোডের একটি ভবনে অবস্থিত ওই প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তারা কনসালটেন্সির কথা বললেও মূলত সেকেন্ড হোমে বিনিয়োগের পুরো প্রক্রিয়ায় সহায়তা করেন। তবে হুন্ডির মাধ্যমে মালয়েশিয়ায় অর্থ পাচার নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক ও দুর্নীতি দমন কমিশন সরব হওয়ার কারণে এ বিষয়ে গোপনীয়তার আশ্রয় নেওয়া হচ্ছে। কমিশনের বিনিময়ে সিএম ইন্টারন্যাশনাল বিভিন্ন ব্যক্তি-প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে মালয়েশিয়ায় অর্থ পাচারে সাহায্য করছে। আর সেকেন্ড হোমে উদ্বুদ্ধ করতে বিনিয়োগ-খরচ সম্পর্কে মনগড়া তথ্যও দিচ্ছে প্রতিষ্ঠানটি। মালয়েশিয়ার হিসেবে সেকেন্ড হোম কার্যক্রমের সুযোগ নিতে প্রায় পৌনে দুই কোটি টাকা প্রয়োজন হয়। অথচ মাত্র ৭৫-৮০ লাখ টাকা থাকলেই মালয়েশিয়ায় সেকেন্ড হোম সুবিধা পাইয়ে দেওয়ার প্রতিশ্রুতিও দিচ্ছে সিএম ইন্টারন্যাশনাল।
সিএম ইন্টারন্যাশনালের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাসুদুর রহমানের সঙ্গে কথা বলতে চাইলে ‘তিনি কানাডায় আছেন’ বলে তার অফিস থেকে জানানো হয়েছে। পরে প্রতিষ্ঠানটির জেনারেল ম্যানেজার কামরুল আমিন শেয়ার বিজকে বলেন, ‘আমরা স্বল্প খরচে সুবিধা পাইয়ে দেওয়ার জন্য কাজ করি। আমাদের মাধ্যমে গেলে ৫০ বছরের বেশি বয়সীদের এক কোটি টাকার মতো থাকতে হয়। টাকা পাঠানোর দায়িত্ব আমরা নিই না। গ্রাহক নিজ দায়িত্বেই টাকা নিয়ে যান। আমাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করার কিছু নেই। শুধু আমরা নই, এখন বহু প্রতিষ্ঠান এ প্রকল্পের হয়ে কাজ করছে। আপনার কিছু জানার থাকলে এমডি স্যার এলে তার সঙ্গে কথা বলুন।’
উল্লেখ্য, বাংলাদেশি নাগরিকদের স্থায়ীভাবে বসবাসের সুযোগ দিতে ২০০২ সালে মালয়েশিয়া সরকার ‘মাই সেকেন্ড হোম’ প্রকল্প চালু করে। এরপর ২০০৩ সাল থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত প্রায় সাড়ে আট হাজার বাংলাদেশি নাগরিক ওই সুবিধা নিয়ে সেখানে পাড়ি জমানোর আবেদন করেছেন। এর মধ্যে সুবিধা পেয়েছেন প্রায় সাড়ে তিন হাজার বাংলাদেশি। ১২৬ সুবিধাভোগী দেশের মধ্যে সংখ্যার দিক থেকে তৃতীয় অবস্থানে বাংলাদেশ। তবে ‘সেকেন্ড হোম’ প্রকল্পের সুবিধা নিতে দেশ থেকে অবৈধ পথে অর্থ সরিয়ে নেওয়া নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমতি না নিয়ে হুন্ডির মাধ্যমে অর্থ পাচার করা হচ্ছে। এভাবে প্রায় পাঁচ হাজার কোটি টাকা বিদেশে চলে গেছে বলেও তথ্য মিলেছে।