নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের কাছে তরুণ প্রজন্মের প্রত্যাশা

জাতীয় নির্বাচন-২০১৮

তৌহিদুর রহমান: চারদিকে এখন নির্বাচনী আমেজ। চায়ের দোকান থেকে শুরু করে অফিস-আদালত সব খানেই চলছে এ নিয়ে আলাপ-আলোচনা। কে আসবে ক্ষমতায়, কেমন হবে নির্বাচন তা নিয়েই আলোচনা চলছে বেশি। তবে একটি ব্যাপার, এসব আলোচনায় কিংবা রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে যতটা গুরুত্ব পাওয়ার কথা ছিল সম্ভবত তা পাচ্ছে না। সেটা হলো, তরুণ কিংবা যুবসমাজ সরকারের কাছে কী চায় বা কেমন সরকার তারা দেখতে চায়। অথচ একটি দেশের আর্থসামাজিক অগ্রগতিতে সবচেয়ে বেশি ভূমিকা রাখে কিন্তু আমাদের এই তরুণ প্রজন্ম। সে হিসেবে এ বিষয়টি কোনোভাবেই এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। দেশের রাজনৈতিক দলগুলোকে এটি অনুধাবন করে এবং এ প্রজন্মকে যথাযথভাবে নিজেদের পরিকল্পনায় রেখেই নির্বাচনের কাজ এগিয়ে নিতে হবে।
আগামী ৩০ ডিসেম্বর একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। এবারের নির্বাচনে মোট ভোটারের সংখ্যা ১০ কোটি ৪১ লাখ। এর মধ্যে এবার প্রথম ভোট দেবেন প্রায় এক কোটি ২৩ লাখ। সব মিলিয়ে ১৮ থেকে ২৮ বছর বয়সী ভোটারের সংখ্যা প্রায় আড়াই কোটি। এই তরুণ বয়সের ভোটারদের ভোটই কিন্তু আগামী নির্বাচনের ফল নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে যাচ্ছে বলা চলে। সেক্ষেত্রে সরকারের কাছে তাদের চাওয়া-পাওয়া ও আকাক্সক্ষার দিকটি কিন্তু খুবই গুরুত্বপূর্ণ। যারা এ প্রজন্মের মনোযোগ আকর্ষণ করতে পারবে সফলভাবে, তাদেরই নির্বাচনে জয়ের পাল্লা ভারী হবে। তবে দুঃখজনক ব্যাপার হলো, জাতীয় নির্বাচনের প্রার্থীদের এ বিষয়টি নিয়ে এখনও খুব বেশি মনোযোগী হতে দেখা যায়নি। যদিও নির্বাচন ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে গণমাধ্যমে তরুণ ভোটারদের নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। রাজনৈতিক দলগুলোও এনিয়ে নিজেদের অবস্থান জানান দেওয়া শুরু করেছে।
আমাদের প্রজন্ম তথা তরুণ প্রজন্ম নিয়ে এ লেখা একটি নেতিবাচক বিষয় নিয়েই শুরু করতে চাই। গত কয়েকদিনে গণমাধ্যমে একটি খবর বেশ ফলাও করে প্রকাশ করা হচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও অনেকে বিষয়টি নিয়ে বেশ সরব। চলতি বছর এ পর্যন্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৯ জন সাবেক ও বর্তমান শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছেন। আর গত সপ্তাহেই চাকরি না পাওয়ার হতাশা থেকে আত্মহত্যা করেছেন ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্র। যে কারণেই হোক আত্মহত্যার বিষয়টি কিন্তু কোনোভাবেই সমর্থনযোগ্য নয়। সমস্যা যত কঠিনই হোক তা যে কোনোভাবেই কিন্তু সমাধানযোগ্য। যাই হোক গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবর থেকে জানা যাচ্ছে, এসব শিক্ষার্থীর বড় অংশই চাকরি না পেয়ে হতাশ ছিলেন কিংবা পরিবার থেকে পড়াশোনার খরচ চালাতে হিমশিম খাচ্ছিলেন। প্রেমঘটিত ব্যাপারও কাজ করেছে এক্ষেত্রে। এ বিষয়গুলো তাদের মধ্যে হতাশা তৈরি করায় একপর্যায়ে তারা আত্মহত্যার মতো কঠিন পথ বেছে নিতে বাধ্য হয়েছেন।
এ সম্ভাবনাময় মুখগুলো আমাদের দেশের দুটি কঠিন বাস্তবতা আরও স্পষ্ট করে দিয়ে গেছে। সন্তানের লেখাপড়া চালানোর জন্য মধ্যবিত্ত ও দরিদ্র পরিবারগুলোর কঠিন সংগ্রাম এবং বেকারত্বের কঠিন যন্ত্রণা। এসব পরিবারের সন্তানরা কঠিন পরিস্থিতি মোকাবিলা করে লেখাপড়ার পাঠ চুকাতে সক্ষম হলেও চাকরির বাজারে এসে কোণঠাসা হয়ে পড়ছেন। এখানেও বাধা দুটি। চাকরির আবেদন করতে গিয়ে অতিরিক্ত ফি এবং অল্প পদের বিপরীতে তীব্র প্রতিযোগিতা। একটি যুদ্ধের ময়দানে জয়ী হয়ে আরেকটি বড় যুদ্ধে শামিল হওয়ার মতো অবস্থা। গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হলো, এই কঠিন সময়টা কিন্তু বেশ দীর্ঘ। আর এটি পার করতে হয় ওই তরুণ বয়সেই। যে বয়সের ভোটাররাই জাতীয় নির্বাচনে বড় ফ্যাক্ট বা নির্ধারক হয়ে উঠতে পারেন বলে মনে করা হয়। সবার আগে দেশপ্রেমের ব্যাপারটি তো আছেই, এরপরেই তাই তাদের চাওয়া-পাওয়ার একটি বড় অংশই কিন্তু দেশের শিক্ষাব্যবস্থা কিংবা কর্মসংস্থানকেন্দ্রিক।
এ ধরনের ব্যাপার নিয়েই সম্প্রতি দেশে বড় ধরনের একটি আন্দোলন হয়ে গেছে। ‘কোটা সংস্কার আন্দোলন’ নামে চলা এ কর্মসূচিতে দেশের শিক্ষিত তরুণ শ্রেণির বিরাট উপস্থিতি ছিল। বড় ধরনের এ আন্দোলন দেশের সার্বিক পরিস্থিতিতেই একটি নাড়া দিয়ে গেছে। এত বড় আন্দোলন কিন্তু দু’একদিনে গড়ে ওঠেনি। এর আগে এক দশকের মধ্যে দুবার এমন আন্দোলন গড়ে উঠলেও তা দানা বাঁধতে পারেনি। তবে এবার সব বাধা সরিয়ে ফেলে চূড়ান্ত বিস্ফোরণ ঘটেছে আন্দোলনের। পরিস্থিতির কারণে সরকারকে তাদের দাবি মেনেও নিতে হয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হলো, এ আন্দোলনের রেশ কাটতে না কাটতেই স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণে ‘নিরাপদ সড়ক চাই আন্দোলন’ হয়েছে। কোটা সংস্কার আন্দোলন থেকে অনুপ্রাণিত হয়েই আরও একটি বড় আন্দোলনের সূত্রপাত হয়েছে বলে অভিমত অনেকের। এখানে একটি বিষয় বেশ স্পষ্ট হয়ে গেছে। তা হলো কিশোর-কিশোরী ও তরুণ প্রজš§ তাদের অধিকার নিয়ে সচেতন হয়ে উঠছে।
অবশ্য কোটা সংস্কার আন্দোলনে যে শুধু কোটা নিয়ে ক্ষোভের বিস্ফোরণ হয়েছে তা নয়। এ আন্দোলনে চাকরি ক্ষেত্রে বৈষম্য ও বেকারত্বের বিষয়টিও ছিল। এটি আন্দোলনকারীদের কথাবার্তাতেই ফুটে উঠেছে। বিশেষ করে উচ্চশিক্ষা শেষ করেও কাক্সিক্ষত চাকরি না পাওয়া, দীর্ঘসূত্রতা, সরকারি চাকরির আবেদনেও বেশি ফি আদায়, মন্ত্রণালয়গুলোর মধ্যে সমন্বয়হীনতা, সময়মতো নিয়োগ না পাওয়া, দীর্ঘ বিরতি দিয়ে বড় চাকরির বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ, আইনি জটিলতা, ঘুষ বাণিজ্য, রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ, ভেরিফিকেশন জটিলতা, অনিয়মসহ নানা বিষয়ে তাদের ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে। তরুণ প্রজন্ম বিশেষ করে উচ্চশিক্ষিত সমাজের সমর্থন পেতে হলে রাজনৈতিক দলগুলোকে এ বিষয়গুলো গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করতেই হবে। কারণ এ প্রজন্মের ভোটাররা কিন্তু অন্ধভাবে ভোট দিতে অভ্যস্ত নয়। তারা সবদিক বিবেচনা করেই নিজেদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করবেন।
দেশের অর্থনীতি সচল রাখতে বড় ভূমিকা রয়েছে কর্মক্ষম যুবসমাজের। বিষয়টি জনমিতির লভ্যাংশ বা ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড তত্ত্ব হিসেবে অভিহিত করা হয়। এই জনশক্তিকে ভালোভাবে কাজে লাগাতে পারলে তা দেশের জন্য আশীর্বাদ হিসেবে গণ্য হবে সন্দেহ নেই। আমাদের দেশ এই ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড অর্জন করেছে প্রায় এক দশক হতে চলল। কিন্তু এ বিষয়টি পুরোপুরি ব্যবহার করতে পারার দিক থেকে আমরা অনেক পিছিয়ে। সরকারি পরিসংখ্যানই বলছে, দেশে বেকারের সংখ্যা প্রায় ২৭ লাখ। এর মধ্যে সাড়ে ১০ লাখই উচ্চশিক্ষিত। তবে বাস্তবে এ সংখ্যা আরও অনেক বেশি বলে অভিমত অনেকের। এ বিষয়টি সামনে রেখে আমাদের প্রজন্মের আশা থাকবে ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ডের পূর্ণ সদ্ব্যবহারের নিশ্চয়তা রাজনৈতিক দলগুলোর পক্ষ থেকে থাকবে।
বেকারত্ব কিংবা চাকরির বিষয়টির সঙ্গে আরও একটি বিষয় সামনে চলে আসে। তাহলো শিক্ষার মান। দেশের শীর্ষস্থানীয় একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সৌভাগ্য আমার হয়েছে। পড়াশোনার পাশাপাশি সাংবাদিকতার সঙ্গে যুক্ত থাকার সুবাদে প্রায় সব বয়সী শিক্ষার্থীর সঙ্গে যোগাযোগও ছিল নিয়মিত, এখনও আছে। তাদের মনোভাব হয়তো পুরোপুরি জানা সম্ভব নয়, তবে অনেকাংশেই জানার সুযোগ ছিল। তাদের মধ্যে দেশের শিক্ষাব্যবস্থা ও মান নিয়ে এক ধরনের হতাশা রয়েছেই। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর কারিকুলাম ও মান নিয়েও সন্তুষ্ট নন অধিকাংশই। ভর্তি প্রক্রিয়া নিয়েও অসন্তোষ রয়েছে। বিশ্বব্যাপী এখন প্রযুক্তির জয়-জয়কার। কিন্তু আমাদের দেশে শিক্ষাব্যবস্থা কিংবা অন্য ক্ষেত্রে প্রযুক্তির ব্যবহার এখনও আশানুরূপ পর্যায়ে পৌঁছেনি বলা চলে। প্রযুক্তি শিক্ষার সুযোগও এখনও শহরকেন্দ্রিক। দেশের প্রতিটি কোণে প্রযুক্তি ছড়িয়ে দিতে না পারলে বাকি বিশ্ব থেকে আমরা পিছিয়ে যাব সন্দেহ নেই।
এছাড়া শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়া ও গবেষণার দুরবস্থা নিয়েও হতাশ শিক্ষার্থীদের বড় অংশ। যোগ্য প্রার্থী বাদ দিয়ে দলীয় বিবেচনায় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় শিক্ষক নিয়োগের খবর গণমাধ্যমে প্রকাশ পেলে তাদের হতাশার দিকগুলো ফুটে ওঠে। ক্যাম্পাসগুলোয় এ নিয়ে প্রায়ই আন্দোলন করতেও দেখা যায়। ভালো গবেষণাও হচ্ছে এখন হাতেগোনা। সব মিলিয়ে প্রাথমিক স্তর থেকে শুরু করে উচ্চশিক্ষা পর্যন্ত সার্বিক শিক্ষাব্যবস্থা ঢেলে সাজানোর পক্ষপাতী আমাদের প্রজন্মের অনেকেই। কর্মমুখী শিক্ষা নিশ্চিত করাটাই এখন সব পক্ষের একক দাবিতে পরিণত হয়েছে বলা চলে। সেক্ষেত্রে যে দলই ক্ষমতায় আসুক না কেন তাদের এ বিষয়টি গুরুত্ব সহকারেই বিবেচনা করতে হবে। রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ ও দলীয় বিবেচনা বন্ধের দিকে নজর দেওয়াটাও সম্ভবত সবচেয়ে কাক্সিক্ষত বিষয় শিক্ষার্থীদের কাছে। আগামী নির্বাচনে অংশগ্রহণ করা রাজনৈতিক দল এবং পরবর্তী সময়ে যারা ক্ষমতায় আসবে তাদের তাই এ বিষয়টি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েই দেখতে হবে।
চাকরির বাইরে কর্মসংস্থানের জন্য উদ্যোক্তা হওয়ার কথা প্রায়ই বলা হয়। এক্ষেত্রেও প্রতিবন্ধকতা অনেক। উচ্চশিক্ষিত হয়ে উদ্যোক্তা হতে গিয়ে নানা কারণে বাধার মুখে পড়ছেন অধিকাংশ তরুণ। বিশেষ করে ব্যাংক কিংবা অন্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে অর্থসংস্থানের চেষ্টা করতে গিয়ে সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধকতার মুখে পড়েন তারা। এক্ষেত্রে যে দলই ক্ষমতায় আসুক না কেন তাদের উদ্যোক্তা হওয়ার পথের সব বাধা দূর করতে হবে। শুধু তাই নয়, কর্মমুখী শিক্ষা নিশ্চিত করার পাশাপাশি প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণের জন্যও স্পষ্ট প্রতিশ্রুতি তরুণদের দিতে হবে। বৈদেশিক শ্রমবাজারের ক্ষেত্রেও ভালো প্রশিক্ষণ গুরুত্বপূর্ণ। এক্ষেত্রে যে দলের পরিকল্পনা সবচেয়ে সময়োপযোগী হবে, তরুণ ভোটারদের সমর্থনও তাদের পক্ষেই থাকবে সন্দেহ নেই।
এ পর্যায়ে এসে অনেকের একটি বিষয় মনে হতে পারে, তাহলে কি তরুণদের চিন্তাভাবনা শুধু চাকরি-বাকরি কিংবা শিক্ষাব্যবস্থাকেন্দ্রিক? এর জবাব হলো, ‘না’। তার প্রমাণ কিন্তু মিলেছে কোটা সংস্কার আন্দোলন কিংবা ‘নিরাপদ সড়ক চাই’ আন্দোলনের সময়। সাম্প্রতিক সময়ে আলোড়ন তোলা এ দুই আন্দোলনেই কিন্তু স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা একটি দাবিতে থেমে থাকেনি। মূল দাবির পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় নানা অসঙ্গতি দূর করার দাবিও তারা জানিয়েছে। এর মধ্যে মানবাধিকার, সুষ্ঠু ধারার রাজনীতি, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, গণতন্ত্র শক্তিশালী করা, দুর্নীতি-অনিয়ম দূরীকরণ, দারিদ্র্য বিমোচন, বিদেশে উচ্চশিক্ষাসহ নানা বিষয় উঠে এসেছে। এগুলো শুধু তারা জানিয়েই থেমে থাকেনি, আনুষ্ঠানিকভাবে তা রাজনৈতিক দলগুলোর সামনে পেশ করার উদ্যোগও আমরা প্রকাশ্যেই দেখতে পাচ্ছি।
কোটা সংস্কার আন্দোলনের সূচনা ছিল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুক ব্যবহার করে। পরে সময় যত গড়িয়েছে ফেসবুকের ব্যাপক ব্যবহারও আমরা লক্ষ্য করেছি। রাজপথে আন্দোলন চলার পাশাপাশি কোটা সংস্কার আন্দোলনের নামে খোলা গ্রুপেও তারা ব্যাপক সক্রিয় ছিলেন। সেখানে নিজেদের দাবি-দাওয়া ও সার্বিক পরিস্থিতি তুলে ধরেছেন আন্দোলনকারীরা। সে দাবি আদায় হওয়ার পর এখন রাষ্ট্রীয় নানা অসঙ্গতি, অনিয়ম, ভালো-মন্দ নানা বিষয় সেখানে আলোচনা হচ্ছে। এরই মধ্যে সম্প্রতি সংবাদ সম্মেলন করে অভিনব এবং আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে ব্যতিক্রম একটি কর্মসূচি ঘোষণা করেছে তারা। এবার নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ‘তারুণ্যের ইশতেহার-২০১৮’ ঘোষণা করেছে কোটা সংস্কার আন্দোলনকারীরা।
ইশতেহারের মূল বিষয়বস্তু শিক্ষাব্যবস্থা এবং কর্মসংস্থানকেন্দ্রিক। তবে রাষ্ট্রীয় কাজের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নানা বিষয়ে তরুণদের যুক্তিসঙ্গত মতামত স্থান পেয়েছে। এগুলো আওয়ামী লীগ, বিএনপিসহ রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে চিঠি দিয়ে পৌঁছে দিয়েছে আন্দোলনকারীরা। এ ইশতেহারে চাকরিসংক্রান্ত সব জটিলতা দূর করা, শিক্ষাব্যবস্থাকে বাস্তবসম্মত ও যুগোপযোগী হিসেবে গড়ে তোলার কথা বলা হয়েছে। এছাড়া দেশের মূল স্তম্ভগুলো কীভাবে চললে ভালো হয় বা এগুলো তরুণরা কেমন দেখতে চায় সে বিষয়েও নিজেদের মতামত তুলে ধরেছেন তরুণরা। প্রশ্ন ফাঁস বন্ধ, সান্ধ্যকালীন কোর্স বাতিল করা, শিক্ষায় বরাদ্দ বৃদ্ধি, ছাত্র সংসদ নির্বাচন, সুশাসন, ন্যয়বিচারসহ রাষ্ট্রীয় কাঠামো কেমন হওয়া উচিত তা নিয়েও মতামত রয়েছে। এই ইশতেহার কিন্তু দু’একজনের একক মতামতের ভিত্তিতে তৈরি হয়নি। ফেসবুকের গ্রুপে সবার মতামতের আলোকেই তারুণ্যের ইশতেহার ঘোষণা করা হয়েছে। সে হিসেবে এটি কতটা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে তা সহজেই অনুমেয়। সেক্ষেত্রে নির্বাচনকে সামনে রেখে এসব বিষয়গুলো এড়িয়ে গেলে তা রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য ভালো ফল বয়ে আনবে না নিঃসন্দেহে।
বিশ্বব্যাপী তথ্যপ্রযুক্তির অগ্রগতিকে মূল হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে এগিয়ে যাচ্ছে দেশগুলো। যে দেশ প্রযুক্তি খাতে যত অগ্রগতি অর্জন করেছে, আর্থসামাজিক, রাজনৈতিক প্রভৃতি ক্ষেত্রে তাদের অগ্রগতিটাও তত স্পষ্ট। এক্ষেত্রে উদাহরণ হিসেবে, যুক্তরাষ্ট্র, চীন, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, জার্মানি এমনকি প্রতিবেশী দেশ ভারতের কথা বলা যেতে পারে। প্রযুক্তি সদ্ব্যবহার এবং এ উন্নতির পেছনে সবচেয়ে বেশি ভূমিকা কিন্তু তরুণদেরই। আমাদের দেশেও মেধাবী তরুণের অভাব নেই। তবে দুঃখজনক ব্যাপার হলো, তাদের আমরা সঠিবভাবে কাজে লাগাতে পারছি না। যে দলই ক্ষমতায় আসুক না কেন, তাদের যদি সত্যিকার অর্থেই দেশের জন্য কিছু করার ইচ্ছা থাকে তাহলে তরুণদের কথা অবশ্যই শুনতে হবে। তাদের চাওয়া-পাওয়ার সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। এ কাজটি যে দল সঠিকভাবে করতে পারবে আমাদের তরুণ প্রজন্মের সমর্থনও তাদের সঙ্গে থাকবে। আর এ প্রজন্মের ভাষা বুঝতে ব্যর্থ হলে তার ফল যে খুব একটা সুখকর হবে না, তা নতুন করে বলে না দিলেও চলে।

গণমাধ্যমকর্মী

[email protected]