নির্মাণ শেষে বদলে যাবে অর্থনীতি

নিজস্ব প্রতিবেদক: অনেক চড়াই-উৎরাই পেরিয়ে শুরু করা হয়েছে পদ্মা সেতুর নির্মাণকাজ। ২০১৮ সালের মধ্যে এর নির্মাণ শেষ করার লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে। এ সেতু নির্মাণ সম্পন্ন হলে উš§ুক্ত হবে দক্ষিণ দুয়ার। দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির গতি ত্বরান্বিত হবে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, পদ্মা সেতু নির্মিত হলে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অর্থনীতির চিত্র দ্রুত বদলাতে শুরু করবে। যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়নে আঞ্চলিক বাণিজ্যের প্রসার ঘটবে। ফলে কৃষি খাতের সম্প্রসারণ হবে। বিদ্যুৎ ও গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করা গেলে শিল্প খাতের দ্রুত উন্নয়ন হবে। পাশাপাশি মংলা বন্দরের ব্যবহার বৃদ্ধি পাবে। এছাড়া পদ্মা সেতু এশিয়ান হাইওয়ে ও ট্রান্স-এশিয়ান রেলওয়ে নেটওয়ার্কভুক্ত হওয়ায় ভারতের সঙ্গে সড়ক ও রেল যোগাযোগ বৃদ্ধিতে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল হয়ে উঠবে গুরুত্বপূর্ণ রুট। এগুলোর সম্মিলিত প্রভাবে সারা দেশের জাতীয় উৎপাদন (জিডিপি) ১ দশমিক ২ শতাংশ হারে বাড়বে। আর দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে জিডিপি বাড়বে ২ দশমিক ৩ শতাংশ হারে।

এ প্রসঙ্গে পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের (জিইডি) সদস্য অধ্যাপক শামসুল আলম শেয়ার বিজকে বলেন, পদ্মা সেতু নির্মাণের ফলে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সঙ্গে দেশের অন্যান্য অংশের যোগাযোগ সহজতর হবে। ভারতের পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গে যোগাযোগে নৈকট্য বাড়বে ও দ্বিতীয় সমুদ্রবন্দর মোংলার ব্যবহার বাড়বে। এ সেতুর কারণে অর্থনীতিতে যে গতি সঞ্চার হবে তা জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার প্রায় ১.২ শতাংশ বৃদ্ধি করবে।

দেশি ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থার প্রতিবেদনের তথ্য-উপাত্তে দেখা যায়, পদ্মা সেতুর নির্মাণ বিলম্বিত হওয়ায় ক্রমেই পিছিয়ে পড়ছে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জনগোষ্ঠী। গত জুনে বিশ্বব্যাংক প্রকাশিত ‘বাংলাদেশ দারিদ্র্য মূল্যায়ন’ প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জেলাগুলোয় দরিদ্র মানুষের সংখ্যা তুলনামূলক বেশি। এক দশকে (২০০১-১০) সারা দেশে যে মাত্রায় দারিদ্র্যের হার কমেছে খুলনা ও বরিশালে সে তুলনায় কমার হার অনেক কম।

এদিকে সেতুটি নির্মিত হলে কীভাবে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল ও সারা দেশের অর্থনীতিতে প্রভাব পড়বে, তা পাওয়া যায় ‘এস্টিমেটিং দি ইকোনমিক ইমপ্যাক্ট অব পদ্মা ব্রিজ ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক প্রতিবেদনে। ২০১০ সালে প্রণীত ওই প্রতিবেদনে গাণিতিক অর্থনৈতিক মডেল ব্যবহার করে পদ্মা সেতুর অর্থনৈতিক প্রভাব পরিমাপ করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় দুজন অধ্যাপক সেলিম রায়হান ও বজলুল হক খন্দকার।

প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, পদ্মা সেতু হলে খুলনা ও বরিশাল বিভাগ তথা দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও দারিদ্র্য বিমোচনে তাৎপর্যপূর্ণ অবদান রাখবে। সেতু নির্মাণ ব্যয়ের আমদানি, ঠিকাদার ও পরামর্শকদের ফি বাবদ ব্যয় ছাড়া বাকি ২১০ কোটি ডলার দেশীয় অর্থনীতিতে প্রবেশ করবে। এতে ২০১৪ থেকে ২০৪৪ সাল পর্যন্ত ৩১ বছরে ৬৪৮ কোটি ডলার জাতীয় উৎপাদন বৃদ্ধি পাবে। পাশাপাশি সেতু নির্মাণের ফলে ওই অঞ্চলের সঙ্গে সারা দেশের যোগাযোগ সহজতর হবে। এতে যানবাহন পরিচালন ব্যয় ও সময় সাশ্রয়ের মাধ্যমে ২০১৪ থেকে ২০৪৪ সাল পর্যন্ত ৩১ বছরে এক হাজার ৮৫১ কোটি ডলার সাশ্রয় হবে। অর্থাৎ ৩১ বছরে পদ্মা সেতুর সম্মিলিত প্রভাব দাঁড়াবে দুই হাজার ৪৯৯ কোটি ডলার।

এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) গবেষণা পরিচালক ড. জায়েদ বখ্ত বলেন, খুলনা ও বরিশাল একসময় অবিভক্ত বাংলার অন্যতম বাণিজ্যকেন্দ্র ছিল। পরে ভূ-রাজনৈতিক পরিবর্তনে ক্রমেই এসব এলাকা অবহেলিত অঞ্চলে পরিণত হয়। বন্দরও প্রাণ হারিয়ে ফেলে। শিল্পগুলো সরকারি-বেসরকারি খাতের মনোযোগের অভাবে লোকসানি প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়। পদ্মা সেতু যথাসময়ে শুরু হলে ওই অঞ্চল এত দিনে অনেকটা এগিয়ে যেত। কিন্তু সেতুর বাস্তবায়ন বিলম্বে ওই অঞ্চল অবহেলিতই রয়ে গেছে।

এদিকে পদ্মা সেতু বাস্তবায়ন বিলম্বিত হওয়ায় দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের উন্নয়নে গৃহীত ২৪১ কোটি ডলার বা ২০ হাজার কোটি টাকার পরিকল্পনা বাস্তবায়নও বিলম্বিত হচ্ছে। সরকার ও দাতাদের অর্থে এ বিনিয়োগ তালিকায় ছিল তিন হাজার ১০০ কোটি টাকা ব্যয়ে পাঁচটি সেতুসহ মাওয়া থেকে পটুয়াখালী পর্যন্ত সংযোগ সড়ক নির্মাণ, চার হাজার ২৭৮ কোটি টাকা ব্যয়ে ৪৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন ও বিতরণের সংযোগ লাইন নির্মাণ, এক হাজার ৭৯৪ কোটি টাকায় মোংলা ও মাওয়া বন্দরের উন্নয়ন, বাগেরহাট থেকে মংলা পর্যন্ত এক হাজার ৭২৫ কোটি টাকা ব্যয়ে রেললাইন সম্প্রসারণ।

পাশাপাশি ১০৩ কোটি টাকা ব্যয়ে বাস-ট্রাকের মালপত্র বোঝাই-খালাস সুবিধা ও বাস টার্মিনাল নির্মাণ, দুই হাজার ৭০ কোটি টাকায় প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল রক্ষার ব্যবস্থা করা, গড়াই নদীকে আবার পুনরুদ্ধার এবং এ অঞ্চলের কৃষি ও সুপেয় পানির সরবরাহ বাড়াতে এক হাজার ৭২৫ কোটি টাকার উন্নয়ন প্রকল্প ছিল ওই পরিকল্পনায়। এছাড়া কৃষি, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প এবং প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো উন্নয়নে আরও দুই হাজার কোটি টাকার পরিকল্পনা নেওয়া হয়। এগুলোর মধ্যে কয়েকটির বাস্তবায়ন শুরু হয়েছে। আর বাকিগুলো সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার আওতায় বাস্তবায়ন করা হবে।

অধ্যাপক শামসুল আলম এ প্রসঙ্গে বলেন, দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অবকাঠামো উন্নয়ন সরকারের অগ্রাধিকারের তালিকায় আছে। এরই মধ্যে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে গ্যাস সরবরাহের জন্য ৬০০ কোটি টাকার বেশি ব্যয়ে একটি প্রকল্পের বাস্তবায়ন চলছে। মোংলা বন্দরের উন্নয়নেও নেওয়া হয়েছে একাধিক প্রকল্প। গড়াই নদীকে নতুন করে খননের জন্য একাধিক প্রকল্প সরকারের হাতে রয়েছে। ফলে পদ্মা সেতু কিছুটা বিলম্বিত হলেও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের উন্নয়নকাজ কোনোভাবেই থেমে নেই।