মত-বিশ্লেষণ

নির্যাতনে ব্যবহৃত অস্ত্রের বাণিজ্য বন্ধ হোক

সেসিলা ম্যালমোস্ট্রম: নির্যাতনের এমন কোনো স্থান, কাল কিংবা দৃশ্যপট নেই যেখানে তা গ্রহণযোগ্য ও যথাযথ হতে পারে। নির্যাতনের কৌশল বা চর্চা যাই হোক না কেন তা যদি ভুক্তভোগীর দেহ ও মনকে ক্ষতিগ্রস্ত করে কেবল নির্যাতনকারীর ইচ্ছানুসারে তাকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য, তবে তা হবে মানব মর্যাদার প্রতি জঘন্য অবমাননা। এমনকি গবেষণায় দেখা গেছে, সবচেয়ে ভালো উদ্দেশ্যে যে নির্যাতন চালানো হয় তা মূলত গোয়েন্দা তথ্য বের করে আনার জন্য। আর সবচেয়ে খারাপ নির্যাতন হলো, কারও মুখ থেকে জোর করে মিথ্যা ভাষ্য আদায় করে নেওয়া, যা নির্যাতিতের বিরুদ্ধে অথবা অন্য যে কারও বিরুদ্ধে দোষারোপের জন্য ব্যবহার করা হয়।
যদিও আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী নির্যাতন নিষিদ্ধ, তবুও তা ব্যাপকভাবে চলছে। জাতিসঙ্ঘের আন্তর্জাতিক দিবস হিসেবে নির্যাতনে ভুক্তভোগীদের স্মরণ করা হয় ২৬ জুন। কিন্তু নির্যাতনে যারা মারা গেছেন এবং যারা বেঁচে আছেন তাদের সবার প্রতি সম্মান দেখানোর সবচেয়ে ভালো উপায় হলো বিশ্বব্যাপী সত্যিকার বা কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা, যাতে করে এই শোচনীয় দশার পুরোপুরি নির্মূল করা যায় অথবা ন্যূনতম বাধা প্রদান করা যেতে পারে। উদ্যোগটি শুরু করার একটি ভালো জায়গা হলো আন্তর্জাতিক বাণিজ্য। হ্যাঁ, এটা সত্য যে বিভিন্ন দেশ সাম্প্রতিক কয়েক দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড ও বিভিন্ন ধরনের অমানবিক আচরণ ও চর্চা বিলোপ করেছে।
কিন্তু ফিঙ্গার স্ক্রু, থাম্ব কাফ, লেগ আইরনস, রেস্ট্রেইন্ট চেয়ার, স্পাইকড ব্যাটন এবং তীরের ফলা, বড়শি ও সুচযুক্ত হুইপসের মতো যেসব হাতিয়ার বা যন্ত্রপাতি নির্যাতনে ব্যবহার হয়ে থাকে, সেগুলোর দেদার মুক্ত বাণিজ্য চলছে। সীমান্তেও কোনো বাধা নেই। সব দেশেই এগুলো সয়লাব হয়ে চলেছে। অবশ্য এগুলোর বাণিজ্য যারা করছে তারা মানুষের ওপর নির্যাতন বা ভোগান্তি চাপিয়ে দেওয়ার উদ্দেশ্যে করছে, তা নয়। বরং সীমান্তের পর সীমান্ত পেরিয়ে এসবের বাণিজ্য তারা চালিয়ে যাচ্ছে অন্য সাধারণ যে কোনো পণ্যের বাণিজ্যের মতোই।
তবে পৃথিবীর সর্বত্রই যে একই দশা বিরাজ করছে তাও ঠিক নয়। কেননা, ২০০৫ সাল থেকে ইউরোপীয় ইউনিয়ন এই বিশেষ ধরনের হাতিয়ার বা পণ্যের ব্যবসা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করেছে। পণ্যের মধ্যে রয়েছে ফাঁস, বৈদ্যুতিক চেয়ার ও প্রাণঘাতী ইনজেকশন। এগুলো সাধারণত সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড, নির্যাতন ও অন্যান্য অমানবিক আচরণে ব্যবহার করা হয়ে থাকে। এসব পণ্য হয়তো কখনোই ইউরোপীয় ইউনিয়নের সীমানা পাড়ি দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করবে না। এমনকি অন্য কোনো এলাকায় পৌঁছানোর জন্য তা ইউরোপীয় ইউনিয়নের মাটিও ব্যবহার করতে পারবে না। এরকম বিধিনিষেধের ফলে অমানবিক নির্যাতনের কাজে ব্যবহার্য হাতিয়ার। আর এখন এই অঞ্চলে সহজলভ্য নয়। তবে প্রস্তুতকারক ও ব্যবসায়ী উভয়েই শেষমেশ বিধিনিষেধের চোখে ধুলা দিয়ে বিকল্প কোনো পথে চালান দিতে পারে। এমনকি এক্ষেত্রে তখন আরও বেশি দামে বাণিজ্য চলতে থাকে, প্রতিবন্ধকতাও তখন যে কোনো মূল্যে যথার্থ ভূমিকা রাখতে সক্ষমতা হারিয়ে ফেলে।
নির্যাতনের হাতিয়ার ব্যবসা নিষিদ্ধ হওয়ার পরে এ ধরনের অভিজ্ঞতা বা ফলাফল পাওয়া গেছে। তবুও হতাশ হওয়ার কোনো উপায় নেই। এ ধরনের হাতিয়ারের ব্যবসাকে বৈধ ও স্বাধীন করা যাবে না। নিষেধজ্ঞা দিয়ে বিশ্বব্যাপী সে আইন বা সিদ্ধান্তকে বাস্তবায়ন করতেই হবে। নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়নে সর্বোচ্চ ফলাফলটি পাওয়ার চেষ্টা করতে হবে। যতক্ষণ পর্যন্ত না বিশ্বের সব দেশ একসঙ্গে এ ধরনের হাতিয়ারের বাণিজ্য নিষিদ্ধ করে দিচ্ছে না, ততোক্ষণ পর্যন্ত এই নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়ন করা সম্ভব হচ্ছে না এবং ভিন্ন কোনো না কোনো উপায়ে এর বাণিজ্য নিষিদ্ধ এলাকাতেও চলছে।
এ জন্য ২০১৭ সালের সেপ্টেম্বরে ইউরোপীয় ইউনিয়ান, আর্জেন্টিনা ও মঙ্গোলিয়া নির্যাতনের হাতিয়ার মুক্তবাণিজ্য ব্যবস্থা গড়ে তুলতে একটি জোট গঠন করে। এর লক্ষ্য ছিল, মানুষের ওপর যন্ত্রণা বসিয়ে দেয় এমন যে কোনো হাতিয়ারের বাণিজ্য খোলাখুলিভাবে একেবারে শূন্যের কোঠায় নিয়ে আসা। বর্তমানে এই জোটের মোট সদস্য রাষ্ট্র ৬৫। তারা স্থানীয় এরকম যে কোনো হাতিয়ারের প্রস্তুত ও বাণিজ্য উচ্ছেদ করার জন্যও একাট্টা হয়েছে।
গত বছরের সেপ্টেম্বরে এই জোট তার মন্ত্রিপর্যায়ের বৈঠকে যে কোনো পদেক্ষেপের জন্য রাজনৈতিক উদ্যোগ গ্রহণের কথা তোলে। একটি যৌথ ইশতেহারে সভার সদস্যরা জাতিসংঘের সহায়ক হিসেবে কাজ করতে সম্মত হয়। তারা নির্যাতনের হাতিয়ার বাণিজ্য বন্ধে আইন প্রয়োগে কাজ করবে। এর এক বছরের কম সময়ের মধ্যেই আমরা আমাদের যাত্রাপথের অন্তত একটি ফলক পাড়ি দিতে সক্ষম হয়েছি। এই মাসে জাতিসংঘের সাধারণ সভায় আশা করা যাচ্ছে, এ সম্পর্কিত একটি আইন পাস হতে যাচ্ছে। এই আইনে মানুষের ওপর ব্যবহারিক নির্যাতন করাই যেসব পণ্যের একমাত্র ব্যবহারযোগ্যতা তা নিষিদ্ধ হবে।
তবে এই আইনের চূড়ান্ত লক্ষ্য থাকবে এসব হাতিয়ারের উৎপাদন ধীরে ধীরে একেবারে শূন্যের কোঠায় নিয়ে আসা। এই কার্যক্রমে সারা পৃথিবীকে একটি আইনের আওতায় আনতে জাতিসংঘের এই প্রক্রিয়াটি খুবই কার্যকরী। পুরো পৃথিবীকে নির্যাতন মুক্ত করতে আমাদের অগ্রযাত্রার খুব কাছে পৌঁছে যাওয়ার ভালো পদক্ষেপও বলতে হয়। তবে এই আইনের মাধ্যমে পুরো পৃথিবীকে একটি গণ্ডির মধ্যে আনার কাজটি একেবারে সহজ হবে না। কিন্তু ‘আর্মস ট্রেইড ট্রিটি’ ও ‘কনভেনশন অন ইন্টারন্যাশনাল ট্রেইড ইন অ্যান্ডাঞ্জার্ড স্পেসিস অব ওয়াইল্ড ফনা অ্যান্ড ফ্লোরা’-এর মতো আন্তর্জাতিক সম্মেলনে প্রমাণিত হয়েছে, আন্তর্জাতিক পর্যায়ের বিস্তৃত একটি প্রতিশ্রুতিতে বাণিজ্য হতে পারে অনেক বেশি দায়িত্বশীল ও মানবিক। নির্যাতনের হাতিয়ার বাণিজ্যে আমরা যদি এমন একটি সফলতা আনতে চাই তবে সারা পৃথিবীর সব রাষ্ট্রের সব সরকারের সহযোগিতার প্রয়োজন রয়েছে।
মানতে হবে, এই প্রক্রিয়ার শুরু থেকেই ইউরোপীয় ইউনিয়ন অগ্রদূতের মতো ভূমিকা পালন করে যাচ্ছে। তার এখন অবধি এই সমুদয় কার্যক্রমের নেতৃত্বের দায়ভার নিজেদের কাঁধে রাখার প্রতিশ্রুতি দিয়ে চলেছে। তারা কার্যক্রম যে কোনো পরিস্থিতিতেই চালিয়ে যাবে। পৃথিবীর যে কোনো রাষ্ট্রের যে কোনো সরকারের সঙ্গেই তারা এটা নিয়ে কাজ করবে। তারা আসলে যে কোনো মূল্যেই নির্যাতনের হাতিয়ার বাণিজ্য বন্ধ করার জন্যই কাজ করতে বদ্ধপরিকর। বলা চলে এটাই হলো আমাদের মূল্যবোধভিত্তিক বিস্তৃত বাণিজ্য কর্মসূচির কেন্দ্রীয় বৈশিষ্ট্য।
হ্যাঁ এটা সত্য যে, আইন করেই নির্যাতনের হাতিয়ার ব্যবহার শেষ করা যাবে না। এমনকি নির্যাতনের চর্চাও শেষ হবে না। কিন্তু যারা এর প্রস্তুতকারক, যারা এর বাণিজ্য করে চলেছে, কিংবা নির্যাতনের সংস্কৃতি যারা কানে কুলুপ এঁটে চর্চা করছে তাদের সমগ্র কার্যক্রমে একটি কাঠিন্য আসবে। দিনে দিনে আরও বেশি কঠিন হয়ে পড়বে তাদের কার্যক্রম। ব্যয়ও বেড়ে যাবে যখন এর উৎপাদন কমে আসবে। আবার নির্যাতন কমে এলে উৎপাদকের লাভের অংশ সংকুচিত হবে। ফলে তারা অন্য কোনো ব্যবসায় ঝুঁকে পড়বে। আর তখনই কেবল আমাদের চূড়ান্ত বিজয় আসবে। সেই বিজয়ের স্বার্থে যারা অত্যাচারের শিকার, অত্যাচারিত হচ্ছেন এবং বিশ্বব্যাপী সব সরকারই আসুন এই কার্যক্রমে ঐক্যবদ্ধ হই। বিজয় ছিনিয়ে আনি।

লেখক: ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাণিজ্যবিষয়ক কমিশনার এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নবিষয়ক সাবেক সুইডিশ মন্ত্রী।

প্রজেক্ট সিন্ডিকেট থেকে
ভাষান্তর: মিজানুর রহমান শেলী

সর্বশেষ..