সারা বাংলা

নিষেধাজ্ঞার মধ্যেই মেঘনায় অবাধে চিংড়ি রেণু আহরণ

জুনায়েদ আহম্মেদ, লক্ষ্মীপুর: লক্ষ্মীপুরে মৌসুমের শুরুতেই নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে মেঘনা নদীতে অবাধে চিংড়িসহ বিভিন্ন প্রজাতির রেণু ও পোনা আহরণ করা হচ্ছে। এতে রেণু নিধনের পাশাপাশি ধ্বংস হচ্ছে বিভিন্ন প্রজাতির মৎস্য পোনা। বৈশাখ থেকে আষাঢ় পর্যন্ত এ তিন মাস মেঘনায় পোনা ধরা নিষেধ থাকলেও মেঘনা পাড়ের হাজার হাজার জেলে অবাধে চিংড়ি পোনা আহরণ করছেন। তবে আইনের যথাযথ প্রয়োগ না থাকায় দিন দিন পোনা নিধনকারীদের সংখ্যাও বেড়ে যাচ্ছে।
জানা গেছে, লক্ষ্মীপুরের রামগতি উপজেলার আলেকজান্ডার থেকে চাঁদপুরের হাইমচর পর্যন্ত ১০০ কিলোমিটার নদী এলাকায় গলদা চিংড়ি পোনার অবাধ বিচরণ ক্ষেত্র। ২০০০ সালের ২১ সেপ্টেম্বর মৎস্য ও পশুসম্পদ মন্ত্রণালয়ের এক প্রজ্ঞাপনে দেশের উপকূলীয় এলাকায় বৈশাখ থেকে আষাঢ় পর্যন্ত তিন মাস মাছের পোনা আহরণ নিষিদ্ধ করা হয়। কিন্তু নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে লক্ষ্মীপুরের রামগতি উপজেলার আলেকজান্ডার থেকে শুরু করে রায়পুর উপজেলার হাজীমাড়া পর্যন্ত মেঘনা নদী ও সংযোগ খাল থেকে গলদা চিংড়ির রেণু এবং পোনা আহরণ করছেন কিছু অসাধু আড়তদার ও জেলে। শুধু তাই নয়, এ মৌসুমে স্থানীয় প্রভাবশালীরা নদীর পাড়ে পোনা শিকারের জন্য প্রতি ১০ হাত জায়গা ২০ হাজার টাকায় আড়তদারদের ইজারা দেন।
জোয়ার-ভাটা হিসাব কষে প্রতিদিন দুই দফায় মেঘনা নদীর পাড়ের শিশুসহ প্রায় ২০ হাজার জেলে মশারি, নেট জাল, ছাকনি ও চাদর দিয়ে পানি ছেঁকে এ পোনা শিকার করছেন। এ সময় চিংড়ি পোনার পাশাপাশি বিভিন্ন প্রজাতির রেণু পোনাও নষ্ট হচ্ছে। মহাজনের দাদনের টাকা পরিশোধ করতে জেলেরা সব বাধা-নিষেধ অমান্য করে রেণু পোনা আহরণ করছেন। ফলে দিন দিন মেঘনা নদীতে ইলিশসহ বিভিন্ন মাছের সংখ্যা কমে যাচ্ছে।
ভোলা, বরিশাল, খুলনা, বাগেরহাট ও সাতক্ষীরা এলাকায় চিংড়ি পোনার দাম ও চাহিদা বেশি। আর মহাজনরা আগাম ঋণ দেওয়ায় পোনা শিকারে জেলেদেরও দিন দিন আগ্রহ বাড়ছে। তাই নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে লক্ষ্মীপুর সদরের বুড়ির ঘাট, রায়পুরের হাজীমারা, কমলনগরের মতিরহাট, সাহেবের হাট, লুধুয়া মাছঘাট এলাকা ও রামগতি উপজেলার চরগজারিয়াসহ মেঘনা নদী এবং সংযোগ খালে অবাধে রেণু পোনা শিকার চলছে।
প্রতিদিন জেলে ও শিশুরা ঠেলা জাল, মশারি ও চাকনি জালসহ বিভিন্ন উপায়ে পোনা আহরণ করেন। জাল ফেলে পোনা আটকানোর পর থালায় নিয়ে একটি চামচ বা শামুকের খোলসের মাধ্যমে চিংড়ির পোনা সংগ্রহ করা হচ্ছে। আর থালায় মারা যাচ্ছে মাছের পোনা। প্রতিটি চিংড়ি পোনা এক থেকে দেড় টাকা দরে বিক্রি করে তারা প্রতিদিন আয় করেন ৪০০-৫০০ টাকা।
লক্ষ্মীপুরে মেঘনার তীরবর্তী ছোট ছোট শিশুরা হাতে বই, খাতা, কলম না ধরে কাঁধে তুলছে জাল। শিশুশ্রমের ব্যাপারে সরকার নানামুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করলেও তার ছোঁয়া লাগেনি উপকূলীয় এ এলাকায়। মেঘনা নদী থেকে রেণু পোনার মাধ্যমে অর্থ উপার্জনকে কেন্দ্র করে ক্রমান্বয়ে বাড়ছে শিশু জেলের সংখ্যা। আর অবাধে রেণু পোনা নিধনের কারণে জীববৈচিত্র্য হারানোর পাশাপাশি মেঘনা নদীতে মৌসুমে কাক্সিক্ষত মাছ না পাওয়ারও শঙ্কা রয়েছে।
কমলনগর উপজেলার বাতিরখাল নামক স্থানে গিয়ে দেখা যায়, নরম হাতে পোনা আহরণের মতো কঠিন কাজে ব্যস্ত আট বছর বয়সী জামাল। সে জীবনের ঝুঁকি উপেক্ষা করে নদীতে পোনা আহরণ করছে। এ সময় নদীতে জাল টেনে পোনা আহরণে সহযোগিতা করছে তার ছোট ভাই মোবারক (৭) ও একই গ্রামের রহমান (৬)। তাদের মতো এমন অনেক শিশু প্রতিদিন দুই দফায় মেঘনা নদী থেকে রেণু পোনা আহরণ করছে।
খুলনা থেকে চিংড়ির রেণু কিনতে আসা জাকির মাঝি জানান, লক্ষ্মীপুরে মেঘনা নদী থেকে আহরণকৃত চিংড়ি পোনার মান উন্নত। এ পোনাগুলো খুব দ্রুত বড় হয়। এ কারণে ঘের মালিকদের কাছে এর চাহিদাও বেশি।
কমলনগর উপজেলার চরকালকিনি ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মো. সাইফুল্লাহ জানান, নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও এ মৌসুমে মেঘনাপাড়ের জেলেরা মশারি, নেট জাল, ছাকনি ও চাদর দিয়ে এ পোনা আহরণ করেন। এ জালগুলো ঘন সুতায় তৈরি বলে এতে মাছের ডিম পর্যন্ত উঠে আসে। এ সময় জেলেরা কোটি কোটি টাকার গলদা চিংড়ির পোনা ধরলেও পাশাপাশি কয়েকশ কোটি টাকার বিভিন্ন প্রজাতির মাছের পোনা নিধন করেন। রাতের অন্ধকারে এ অঞ্চল থেকে প্রতিদিন ট্রাকভর্তি চিংড়ি রেণু খুলনা, সাতক্ষীরাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে পাচার হচ্ছে।
অবাধে রেণু পোনা আহরণ সম্পর্কে জানতে চাইলে জেলা মৎস্য কর্মকর্তা এসএম মহিব উল্ল্যাহ জানান, নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও এ মৌসুমে মেঘনা পাড়ের শিশুরা পোনা শিকার করছে। তবে আইন প্রয়োগের পাশাপাশি জনসচেতনতা বাড়ানো প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি।

সর্বশেষ..



/* ]]> */