নিয়ন্ত্রক নয় শুধু কি বিচার চলবে নিয়ন্ত্রিতদের?

ড. আর এম দেবনাথ: সবার বিচার আছে। নিয়ন্ত্রক বা নিয়ন্ত্রণ সংস্থার (রেগুলেটরি অথরিটি) বিচার আছে কি? জাতীয় সংসদের সদস্য যারা সরকারে থাকেন, দেশ পরিচালনা করেন, আমরা যাদের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হই তাদেরও বিচার আছে। দেশ পরিচালনায় ব্যর্থ হলে অথবা দেশ পরিচালনায় গাফিলতি করলে পাঁচ বছর পর ভোটাররা ইচ্ছে করলে তাদের ক্ষমতাচ্যুত করতে পারেন। এভাবে তাদের যথাযথ বিচারের ব্যবস্থা আছে। কিন্তু একজন সচিব, অতিরিক্ত সচিব ইত্যাদি শ্রেণির লোক যারা আজকে সমাজকল্যাণ দেখেন, কালকে বিজ্ঞান মন্ত্রণালয় দেখেন, পরশু দেখেন জলবায়ু বিভাগÑতারা তাদের নির্দিষ্ট দায়িত্ব পালনে অকৃতকার্য হলে কি কোনো বিচারের ব্যবস্থা আছে? দুর্নীতি ইত্যাদির কথা বলছি না; মন্ত্রণালয়ের কাজ ও লক্ষ্যমাত্রা পূরণে ব্যর্থ হলে তার কি কোনো বিচার হয়?
ধরা যাক ব্যাংকিং মন্ত্রণালয়ের কথা। ব্যাংকিং ও বিমা ব্যবসা তারা দেখাশোনা করে। দিনকে দিন খেলাপি ঋণ বাড়ছে, প্রভিশনিং করার অর্থ নেই, ব্যাংকের পুঁজিস্বল্পতা হচ্ছে, ব্যাংক চলছে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে, অনিয়ম ও দুর্নীতি বৃদ্ধি পাচ্ছে, দেশের এক-দুটি অঞ্চল ঋণ পাচ্ছে বেশি, কিছু কোম্পানি/ব্যক্তি ঋণ পাচ্ছে বেশিÑএসব ক্ষেত্রে ব্যাংকিং মন্ত্রণালয়ের সচিবের দায়িত্ব কী? তার দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতার বিচার কী? বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, তারা দায়িত্ব চাপিয়ে দিচ্ছেন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ওপর। আসলেও তো তাই। ব্যাংক নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব, আইনি দায়িত্ব, ১৯৯১ সালের ব্যাংক কোম্পানি আইনে প্রদত্ত দায়িত্ব তাদের। তারা বলতে চাইছেন, আইনি দায়িত্ব আমাদের ঠিকই আছে; কিন্তু প্রশাসনিকভাবে ‘আদেশ’ জারি করে সরকারি ব্যাংকের সব নিয়ন্ত্রণ নিয়ে গেছে মন্ত্রণালয়। সরকারি ব্যাংকগুলো এখন ‘কোম্পানি’, লিমিটেড কোম্পানি। এসব চলার কথা কোম্পানি আইন মোতাবেক। অথচ ‘ডিজিএম’ থেকে এমডি পর্যন্ত চাকরি, পদায়ন, শাস্তি সব মন্ত্রণালয়ের হাতে। নতুন চাকরি দেওয়ার ক্ষমতাও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মাধ্যমে মন্ত্রণালয়ের হাতে। অতএব ব্যর্থতার দায়িত্ব কার? ব্যর্থতার জন্য তার বিচার হবে? এসব প্রশ্ন সর্বত্র।
আমরা সবাই সব দোষ খুঁজি ব্যাংকারদের। তাদের বিচারও হয়। বহু সরকারি ব্যাংকারের ‘অবসরকালীন সুবিধা’ পর্যন্ত আটকে থাকে ‘বিচারের’ অধীনে। তাহলেই প্রশ্ন, ব্যাংকিং খাত আজকের দিনে যেসব সমস্যায় ভুগছে, তার জন্য কি শুধু বাণিজ্যিক ব্যাংক দায়ী? সরকারি অনেক ব্যাংকে বহুদিন ধরে ‘অবজার্ভার’ বা পর্যবেক্ষক বসানো আছে। তারা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তা। সেসব ব্যাংক চলে ‘মেমোরেন্ডাম অব আন্ডারস্ট্যান্ডিং (এমওইউ)’-এর মাধ্যমে, যা ‘মনিটর’ করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। ‘অবজার্ভার’ যারা, তাদের হুকুম ছাড়া ব্যাংক চলে না। এছাড়া প্রত্যেক ব্যাংকে প্রতিবছর ‘কমপ্রিহেনসিভ অডিট’ হয়। এটা করে বাংলাদেশ ব্যাংক। এর মাধ্যমে বড় বড় শাখা ‘নিরীক্ষিত’ হয়। ব্যাংকের হিসাবের খাতা তৈরি করে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের হিসাব বিভাগ। তা অডিট করে বাইরের চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টরা। এরা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অনুমোদিত ফার্ম। তারা ভুলভ্রান্তি ধরে অথবা ছাড়ে। সেই চূড়ান্ত হিসাব ব্যাংকিং মন্ত্রণালয় দেখে, তাতে সই করে বার্ষিক সভায়। তারপর যায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক পাই-পাই করে হিসাব পরীক্ষা করে বিশেষ করে আয়-ব্যয়, বড় বড় ঋণ, শ্রেণিবিন্যাসকরণ, প্রভিশনিং। দেখে, নিট মুনাফা ঠিক আছে কি না। এরপর সরকারি ব্যাংকের ‘ব্যালান্সশিট’ অনুমোদিত হয়, মানুষ তা দেখে। অধিকন্তু খাতাপত্র চেক করে, অডিট করে সরকারের কমার্শিয়াল অডিট বিভাগ। এ অবস্থায় প্রশ্ন, সরকারি ব্যাংকের ব্যর্থতা, অদক্ষতা, পুঁজি স্বল্পতা, দুর্নীতি ও অনিয়মের জন্য কার বিচার হওয়া উচিত? শুধু কি নিজ নিজ ব্যাংকের? না নিয়ন্ত্রণে যারা আছে সবার বিচার হওয়া উচিত? এ প্রশ্নটির নিষ্পত্তি হওয়া দরকার। কারণ, দেখা যাচ্ছে ব্যাংকের পরিস্থিতি দিনকে দিন বহুলভাবে সমালোচিত হচ্ছে। চারদিকে শুধু নেতিবাচক আলোচনা ব্যাংক নিয়ে। দেশের অর্থনীতির অনেক খাত আছে, প্রশাসনের অনেক খাত আছে। কিন্তু দেখা যাচ্ছে, ব্যাংক ও শিক্ষা খাত ছাড়া আর কারো সম্পর্কে বিশেষ আলোচনা নেই। তবে কি এটাই বাস্তবতা? সব চলছে ঠিকমতো, শুধু এই দুটো খাত চলছে না? যদি তা-ই হয়, তাহলে তো বিচারের প্রশ্ন আসেই। অন্যদের কথা এ মুহূর্তে বাদ দিই। ব্যাংক খাতের আলোচনাতেই সীমাবদ্ধ থাকি।
উপরে যে সমস্যাগুলোর কথা বললাম, তার জন্য কে দায়ী নির্ণয় করা দরকার। যেমন, এ মুহূর্তে সমালোচনা হচ্ছে, ব্যাংকে তারল্য সংকট চলছে। এ তারল্য সংকটকে যদি ধরে নিই আসলেই তারল্য সংকট, তাহলে তার বিচারই প্রথম করতে হয়। দেখা যাচ্ছে, ব্যাংকগুলোর মধ্যে অনেকেই আমানতের জন্য ছোটাছুটি করছে। তারা তাদের কর্মী ও কর্মচারীদের লাগিয়ে দিয়েছে অসম্ভব টার্গেট দিয়ে আমানত জোগাড় করো। অথচ দু’দিন আগেও আমানতকারীরা ব্যাংকের দরজা পেরোতে পারেনি। পত্রপাঠ তারা আমানতকারীদের বিদায় করেছে। তাদের আমানতের কোনো প্রয়োজন নেই। আমানতের ওপর সুদের হার তারা নামায় ৩-৪ শতাংশে। অথচ মূল্যস্ফীতির হার ৬-৭ শতাংশ! নামিয়েছে ভালো কথা। এর সুবিধা কি ব্যবসায়ীরা পেয়েছে? পেয়েছে যৎসামান্য। ফাঁকে তারা তাদের নিট মুনাফা করেছে স্ফীত। এমন একটা ভয়ঙ্কর অবস্থা গেছে আমানতকারীদের। তাদের ভাত নেই। ছুটে গিয়েছে তারা সরকারের সঞ্চয়পত্রের দিকে। বিশ্বব্যাংক ঘেঁষা অর্থনীতিবিদরা তখন চিৎকার করেছেন, বলেছেন দেশের সর্বনাশ হতে যাচ্ছে। সরকারের সুদ খরচ বাড়ছে। এখন তারা কোথায়? এখন তো আমানতের সুদের হার সঞ্চয়পত্রে সুদের প্রায় সমান। এখন রব নেই কেন? দেখা যাচ্ছে, ব্যাংকাররা নেমেছে ‘ভিক্ষা’ অর্থাৎ আমানতের জন্য। কেন এ অবস্থা হলো? দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, এর জন্য কে দায়ী? শুধু কি বাণিজ্যিক ব্যাংকের ব্যাংকাররা, না আরও কাউকে দায়িত্ব নিতে হবে?
পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে, বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো বিগত এক বছরে ঋণ দিয়েছে যথেচ্ছভাবে। অথচ বিপরীতে আমনত সংগ্রহ করেছে কম। এটা কী করে সম্ভব? ১০০ টাকা আমনত থাকলে কত টাকা সর্বোচ্চ ঋণ দেওয়া যাবে, সে সম্পর্কে বিধিবিধান আছে। এ বিধান কেন্দ্রীয় ব্যাংকের। তা না মানলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের বিচার করতে পারে। তা পারে নানাভাবে। ব্যাংকগুলোকে নানাভাবে শাস্তি দিতে পারে। প্রয়োজনে তারা প্রধান নির্বাহীকে শোকজ করতে পারে। সরকারি ও বেসরকারি ব্যাংকের প্রধান নির্বাহীকে চাকরিচ্যুত করতে পারে। বেসরকারি ব্যাংকের বোর্ড বাতিল করতে পারে, পরিচালক ও চেয়ারম্যানের চাকরি খেতে পারে, ব্যাংকের ঋণদানের ক্ষমতা হ্রাস করতে পারে। তাদেরকে বলতে পারে আমনত আনার জন্য, ঋণ না দেওয়ার জন্য। এত ক্ষমতাশালী প্রতিষ্ঠান হচ্ছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। দেখা যাচ্ছে, তাদের ঋণনীতি আছে। তা বাৎসরিক হয়, ষাš§াসিকও হয়। ঋণের লক্ষ্যমাত্রাও আছে। অথচ লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ২-৩ শতাংশ বেশি ঋণ দিয়ে দিচ্ছে অনেক ব্যাংক। কেন্দ্রীয় ব্যাংক বলছে, এটা এখন সমন্বয় করতে হবে ডিসেম্বরের মধ্যে। আগে বলেছিল জুনের মধ্যে। দেশে এমন কী ঘটল যে, ছয় মাস পেছাতে হলো সমন্বয়ের তারিখ? সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, অতিরিক্ত ঋণ কীভাবে ব্যাংকগুলো দিতে পারল? এ অতিরিক্ত ঋণ দেওয়ার ফলে ব্যাংক খাতে এখন এক ধরনের অস্থিতিশীলতা দেখা দিয়েছে।
অনেক ব্যাংকের আমানত সংকট হচ্ছে, ফান্ড সংকট হচ্ছে। একটি ব্যাংক তো তাদের আমানতকারীদের টাকা ফেরত দিতে পারছে না। ব্যাংকটি সরকারি ব্যাংক থেকে আমানত (আন্তঃব্যাংক) নিয়েছিল। সরকারি ব্যাংক আতঙ্কিত হয়ে তাদের আমানত ফেরত চেয়েছে। গভর্নর পর্যন্ত একে অযৌক্তিক বলে মনে করছেন। অথচ সমস্যায় থাকা ব্যাংকটির সমস্যা সমাধানে কিছুই করা যাচ্ছে না। হয় তাকে মরতে দিতে হবে অথবা একে বাঁচাতে হবে। অতীতে বাংলাদেশ ব্যাংক অনেক ব্যাংককে বাঁচিয়েছে। ইস্টার্ন ব্যাংক, ওরিয়েন্টাল ব্যাংক (ইসলামিক আইসিবি ব্যাংক), কমার্স ব্যাংক, এনবিবিএল ব্যাংক ইত্যাদি এর প্রমাণ। সেই পথ ধরা যায়। তা না করে সমস্যাটা ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে। সৃষ্টি হয়েছে আমানত/ফান্ডের সংকট। যদি সময়মতো ‘ঋণপ্রবাহ বৃদ্ধির’ মাত্রাতিরিক্ত হার নিয়ন্ত্রণ করা হতো, অবিবেচক ব্যাংকের গলা চেপে ধরা হতো, তাহলে কি আজকের ঘটনা ঘটত? আমি মনে করি, তা হতো না। এ অবস্থায় প্রশ্ন, এ ধরনের সংকট, খারাপ পরিস্থিতির জন্য কি শুধু বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো দায়ী? তাদেরই কেবল বিচার হবে? না নিয়ন্ত্রক সংস্থার কোনো বিচার হবে? নিয়ন্ত্রক সংস্থা দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ, অথচ তার কোনো বিচার নেইÑএমন ঘটনা ব্যাংক খাতকে ক্রমে ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলছে। নিয়ন্ত্রণ সংস্থা ‘নিয়ন্ত্রণ’ করবে, মনিটর করবে। এ কাজে তাদের ব্যর্থতা থাকলে তাদেরকে দায়িত্ব নিতে হবে। বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে ডেকে ‘শাসিয়ে’ দেওয়া সহজ। এ কাজটি অনেকদিন ধরেই করা হচ্ছে। এর থেকে উত্তরণ ঘটানো দরকার।
একই কথা ‘বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন’ (বিএসইসি) সম্পর্কেও খাটে। লিমিটেড কোম্পানির উদ্যোক্তা-মালিকদের নি¤œতম শেয়ার নেই তাদের কোম্পানিতে। এটা আজকের দিন পর্যন্ত নিশ্চিত করা যায়নি। এ অবস্থায় প্রশ্ন মানুষ করবেই, ‘নিয়ন্ত্রণ সংস্থা’ বা রেগুলেটরি অথরিটির কি কোনো বিচার হবে না? কেবল কি বিচার হবে নিয়ন্ত্রিতদের?
অর্থনীতিবিষয়ক কলাম লেখক
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষক