নীতিগত কারণে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ সম্ভব হচ্ছে না

প্রতি রবি থেকে বৃহস্পতিবার পুঁজিবাজারের বিভিন্ন ইস্যু নিয়ে এনটিভি ‘মার্কেট ওয়াচ’ অনুষ্ঠানটি সম্প্রচার করে। বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ বিবেচনায় তার গুরুত্বপূর্ণ অংশ নিয়ে শেয়ার বিজের নিয়মিত আয়োজন ‘এনটিভি মার্কেট ওয়াচ’ পাঠকের সামনে তুলে ধরা হলো:

দেশের বাজারে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের বিনিয়োগের ক্ষেত্রে নীতিগত কিছু বাধা আছে। আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর বিনিয়োগ সীমা বাজারমূল্যে ধরা হয়। ১০ টাকার একটি শেয়ারদর ৩০-৪০ টাকা হতেই পারে। আর যখন শেয়ারটির দর বাড়ছে তখন আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর বিনিয়োগ সীমা অতিক্রম করে যাচ্ছে। যে কারণে ইচ্ছার বিরুদ্ধেও তাদের শেয়ার বিক্রি করতে হচ্ছে। বিনিয়োগ সংক্রান্ত নীতিমালার কারণে পুঁজিবাজারে দীর্ঘমেয়াদে বিনিয়োগ করতে পারছে না আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো। গতকাল এনটিভির মার্কেট ওয়াচ অনুষ্ঠানে বিষয়টি আলোচিত হয়। অনুষ্ঠানে আলোচক ছিলেন বাংলাদেশ টেকনিক্যাল অ্যানালিস্ট অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক মুহাম্মদ মহসীন এবং আইসিএবির ভাইস প্রেসিডেন্ট মাহমুদ উল হাসান খসরু, এফসিএ। অনুষ্ঠানটি গ্রন্থনা, সঞ্চলনা ও সম্পাদনা করেন হাসিব হাসান।

মুহাম্মদ মহসীন বলেন, অনেক দিন ধরে পুঁজিবাজারের লেনদেন ৩০০ থেকে ৬০০ কোটি টাকার মধ্যে আটকে আছে। কেন এমন হচ্ছে তা প্রকৃত বিশ্লেষণ ছাড়া বের করে আনা দুঃসাধ্য। তবে ব্যাংক খাতের বিভিন্ন কেলেঙ্কারি বা সমস্যার কারণে বাজারের এমন অবস্থা হতে পারে। এ বারের মুদ্রানীতিতে সুদের হার বাড়িয়ে দেওয়ার ইঙ্গিত ছিল। যে কারণে সুদের হার বেড়ে গিয়েছে। আর সুদের হার যত বাড়ে পুঁজিবাজারে তত নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। কিন্তু যখন ব্যাংক খাতের মালিকপক্ষ চাপ দিয়ে ক্যাশ রিজার্ভ রেশিও (সিআরআর) এক শতাংশ কমিয়ে নিলে জানা যায়, ব্যাংক খাতে ১০ হাজার কোটি টাকা মুক্ত হবে মানি মার্কেটে আসার জন্য। এতে ধারণা করা হয়েছিল পুঁজিবাজারে কিছুটা ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। কিন্তু সে রকম কিছু ঘটেনি। পুঁজিবাজারে টার্নওভার থেকে শুরু করে শেয়ারদরসহ সব ক্ষেত্রেই স্বল্প সময়ে যে ওঠানামা হয় সেটি আসলে চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে সামঞ্জস্য না থাকার কারণে। আর শর্টরান চাহিদা ও সরবরাহে কেন অমিল হয় সেটি খুঁজে বের করা খুবই কষ্টকর। ব্যাংক খাত বাজারে বড় ভূমিকা রাখে। ফলে ব্যাংক খাতের যে কোনো সমস্যায় বাজার অনেক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তাছাড়া ক্যাপিটাল মার্কেটে বিনিয়োগকারীদের মনোভাব বা মানসিকতাও একটি বড় ভূমিকা পালন করে। সূচক ছয় হাজার ৩০০-৪০০ পয়েন্ট থেকে পাঁচ হাজার ৪০০-৫০০ পয়েন্টে নেমে আসায় বিনিয়োগকারীদের মধ্যে একটি নেতিবাচক মনোভাবের সৃষ্টি হয়েছে। তাই অনেক প্রাতিষ্ঠানিক ও বড় ব্যক্তি বিনিয়োগকারীরা তাদের অর্থ বন্ড বা এফডিআরের মতো জায়গায় বিনিয়োগ করছে। যে কারণে ক্যাপিটাল মার্কেটে আশানুরূপ ক্যাশপ্রবাহ লক্ষ্য করা যাচ্ছে না। এছাড়া আমাদের দেশের বাজারে ইনসাইডার ট্রেডিং ঘটে প্রচুর। আর এ ইনসাইডার ট্রেডিংয়ের কারণে প্রকৃত টার্নওভার কত সেটি বের করা খুবই কষ্টকর হয়ে যায়। দেখা যায়, কোনো গ্রুপ ইনসাইডার ট্রেডিং করে পাঁচ থেকে ১০ কোটি টাকা আয় করেছে। অন্যদিকে ওই গ্রুপ দোষী সাব্যস্ত হওয়ার পর তাদের জরিমানা করা হয় পাঁচ থেকে ১০ লাখ টাকা। যে কারণে তারা বিষয়টি আমলেই নেয় না এবং কোনো ভয়ও পায় না।
মাহমুদউল হাসান খসরু বলেন, পুঁজিবাজার ভালো করার জন্য বাজারের প্রতি বিনিয়োগকারীদের আস্থা একটি বড় বিষয়। দেশের বাজারে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের বিনিয়োগের ক্ষেত্রে নীতিগত কিছু বাধাও আছে। বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো এক্সপোজার সীমার কারণে বিনিয়োগ করতে পারছে না। নীতিমালা অনুযায়ী দেশের বাজারে বিনিয়োগ সীমা বাজারমূল্যে ধরা হয়। এটি আসলে ক্রয়মূল্যে ধরা উচিত। কারণ একটি ১০ টাকার শেয়ার ৩০-৪০ টাকা হতেই পারে। আর যখন শেয়ারটির দর বাড়ছে তখন আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর বিনিয়োগ সীমা অতিক্রম করে যাচ্ছে। যে কারণে ইচ্ছার বিরুদ্ধেও তাদের শেয়ার বিক্রি করতে হচ্ছে। এতে পুঁজিবাজার যে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের জায়গা বলা হলেও নীতিগত কারণে তা সম্ভব হচ্ছে না।

শ্রুতিলিখন: রাহাতুল ইসলাম