সারা বাংলা

নীলফামারীতে ধানের কম দামে বিপাকে বোরো চাষি

তৈয়ব আলী সরকার, নীলফামারী: এবার আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় নীলফামারীতে বোরো ধানের ব্যাপক ফলন হয়েছে। কিন্তু প্রতি মণ ধান ৩০০ টাকা দরে বিক্রি হলেও বাজারে পাইকার মিলছে না। ধানের রেকর্ডসংখ্যক কম দামে চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন কৃষক। এতে আগামীতে ধান চাষ করবেন কি না তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় রয়েছেন তারা।
নীলফামারীতে চলতি বোরো মৌসুমে ধান কাটা ও মাড়াইয়ের কাজ সপ্তাহ খানেকের মধ্যেই পুরোদমে শুরু হবে। এদিকে, বিআর-২৮ জাতের ধান কাটা ও মাড়াইয়ের কাজ শুরু হয়েছে। কিন্তু এখনই শ্রমিক সংকটে পড়েছেন কৃষক। পুরো দমে ধান কাটা-মাড়াই শুরু হলে কী তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় রয়েছেন তারা। এদিকে প্রতি মণ ধান ৩০০ টাকা দরে বিক্রি হলেও বাজারে পাইকার মিলছে না। ফলে কৃষক কী করবেন ভেবে পাচ্ছেন না।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর সূত্র জানায়, এবার জেলায় চলতি বোরো মৌসুমে ৮২ হাজার ৬৪৫ হেক্টর জমিতে বোরো ধানের আবাদ হয়েছে। আর কয়েক দিনের মধ্যে হাইব্রিট এসিআই ১, ২, ৩, ৪ ও হিরা ১, ২, ৩ পুরোদমে কাটা ও মাড়াই শুরু হবে।
নীলফামারী সদরের রামনগর ইউনিয়নের উত্তর রামনগর গ্রামের ধান ব্যবসায়ী আবদুর রাজ্জাক জানান, সরকারিভাবে সরাসরি কৃষকের কাজ থেকে ধান ক্রয় করা হলে বাজারে এ মন্দাভাব থাকবে না। কিছুটা হলেও ধানের বাজারে প্রভাব পড়বে। স্বস্তি ফিরে আসবে কৃষকের ঘরে। এ অঞ্চলের মানুষের প্রধান ফসল হলো ধান ও পাট। পাট চাষেও কৃষকরা বারবার ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় অন্য ফসল চাষে ঝুঁকছেন।
ডিমলা উপজেলার খগাখড়িবাড়ী গ্রামের কৃষক মাজেদুল ইসলাম জানান, চলতি মৌসুমে আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় এবার বোরোর ব্যাপক ফলন হয়েছে। তিনি তিন বিঘা জমিতে বিআর-২৮ ধান আবাদ করে বিঘাপ্রতি ২০-২২ মণ ফলন পেয়েছেন। কিন্তু বাজারে দাম না থাকায় শ্রমিকের হাজিরা, কীটনাশক ও সারের দোকানের বাকির টাকা দিতে পারছেন না। আবার শ্রমিক সংকট তো লেগেই আছে। দুই মণ ধানে একটি হাজিরা তবুও পাওয়া যাচ্ছে না। বীজতলা থেকে শুরু করে ধান ঘরে তোলা পর্যন্ত এক বিঘা জমিতে খরচ হয় প্রায় ১০-১২ হাজার টাকা। সেই টাকা এখন পাবেন কোথায়। জেলার বাজারে প্রতি মণ ধান বিক্রি হচ্ছে প্রকার ভেদে ৩০০-৩৫০ টাকা। এতে প্রতি মণ ধানে দুই থেকে ৩০০ টাকা লোকশান গুনতে হচ্ছে।
অপরদিকে, জলঢাকার শৌলমারী ইউপি চেয়ারম্যান প্রণোজিৎ রায় শ্রমিক সংকটের বিষয়ে জানান, প্রতিবারের মতো এবারো চলতি বোরো মৌসুমে সরকারের ৪০ দিন কর্মসূচির কাজ চলছে। এছাড়া অনেকেই শহরে রিকশা, ব্যাটারিচালিত ভ্যান, অটোরিকশা, নছিমন, করিমনসহ যানবাহন চালিয়ে আয় রোজগার করছে। তাহলে কেন তারা পরের জমিতে হারভাঙা পরিশ্রম করতে যাবে।
তিনি জানান, বিশেষ করে নীলফারারীতে উত্তরা ইপিজেড ও স্থানীয় পর্যায়ে ছোট ছোট নানা ধরনের কলকারখানা ও গার্মেন্ট শিল্প গড়ে উঠায় শ্রমিক সংকট দেখা দিয়েছে। এলাকার নারী পুরুষ চাকরি নিয়ে ব্যস্ত সময় পার করছে। তারা সকাল সাড়ে ৭টায় চলে যায় আর সন্ধ্যায় ফিরে আসে। তাই কৃষি শ্রমিক সংকট হওয়াটাই স্বাভাবিক।
একই এলাকার কৃষক আজিজুল ইসলাম জানান, সরকার প্রতিবারের মতো এবারেও ২৬ টাকা প্রতি কেজি ধান কেনার ঘোষণা দিলেও তা এখন পর্যন্ত ক্রয় করছে না। সরকার যদি সময়মতো ধান কিনতো তাহলে হয়তো কৃষক ধানের দাম পেত। কৃষকের ঘরের ধান ফুরিয়ে বাজারে দাম বাড়লে কৃষকের কোন লাভ নেই। কৃষক এখন ধান বিক্রি করে শ্রমিকের হাজিরার টাকা সেচ, সার, নিড়ানী ও বীজের পাওনা টাকা পরিশোধ করতে হয়। তাই বাধ্য হয়ে কম দামেই ধান বিক্রি করতে বাধ্য হয় কৃষক।
সদরের রামনগর ইউনিয়নের বাহালী পাড়া কাছাড়ি বাজারের আড়তদার রেজাউল ইসলাম জানান, সরকার ধান কেনার ঘোষণা দিলেও এখন পর্যন্ত ধান না কেনায় মোকামগুলোতে ধানের একদম চাহিদা নেই। কেউ ধান নিতে চাচ্ছে না। অন্য বছর প্রতিদিন পাঁচ-সাত ট্রাক ধান দিতেন কিন্তু এবার এখনও এক মণ ধানও কেনেননি। শুঙ্ক বিআর-২৮ জাতের ধান প্রতি মণ ৪০০-৪৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। আর হাইব্রিট (হিরা) জাতের ধান পানির দামে দিলেও খুচরা পাইকাররা নেয় না। আশা করি, সরকার ধান ক্রয় শুরু করলে দাম কিছুটা বাড়বে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের কর্মকর্তা আবুল কালাম আজাদ জানান, জেলায় এবারে ৮১ হাজার ৬১৩ হেক্টর জমি চাষের লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে মাঠে নামেন কৃষি বিভাগ। তবে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ৮২ হাজার ৬৪৫ হেক্টর জমিতে বোরো ধানের আবাদ হয়েছে। এতে এক হাজার ৩২ হেক্টর জমির ধান বেশি উৎপাদন (অর্জিত) হয়েছে। জেলাজুড়ে এবার বোরোর ব্যাপক ফলন হয়েছে। ধানের বাজার কম-বেশির ব্যাপারে তাদের কোনো হাত নেই। জেলা ধান ক্রয় কমিটি রয়েছে বিষয়টি তারাই দেখবে।
জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক কাজী সাইফুদ্দিন ওরফে অভি জানান, জেলায় চলতি বোরো মৌসুমে দুই হাজার ৬১২ টন ধান ক্রয়ের বরাদ্দ পেয়েছেন। এছাড়া সিদ্ধ চাল ১৭ হাজার ৯৫৯ টন ও আতপ চাল ৬১২ টন চাল ক্রয় করা হবে। উপজেলাভিত্তিক স্থানীয় কৃষি অফিস কৃষকের নামের তালিকা তৈরি করার জন্য নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তালিকা পাওয়ার পর ক্রয় কমিটির মিটিং হবে। সেই তালিকা অনুযায়ী ধান ক্রয় শুরু হবে।

সর্বশেষ..



/* ]]> */