নীলফামারীর নীলকুঠি

তৈয়ব আলী সরকার: কৃষক বিদ্রোহ, নীল বিদ্রোহ, তেভাগা আন্দোলন, ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধ নীলফামারীর ইতিহাসের সঙ্গে মিশে রয়েছে।

জেলার মাটি উর্বর দো-আঁশ হওয়ায় এক সময়ে নীলের ব্যাপক উৎপাদন হতো। তাই ইংরেজ সাহেবদের বসবাস ও নীল চাষ পরিচালনার জন্য নীলকুঠি নির্মাণ করা হয়। প্রসঙ্গত ১৮০০ সালে নীলফামারীর নটখানায় নীলের একটি বড় খামার ছিল।

ঔপনিবেশিক স্থাপত্যশৈলীতে নির্মিত হয়েছিল এ কুঠি। দৈর্ঘ্য ৬৩ ফুট ও প্রস্থ ৫১ ফুট। এই টিনশেট ভবনে দুটি ফায়ার প্লেস, দুটি বেডরুম, একটি ড্রইংরুম, দুটি বাথরুম ও পেছনের দিকে একটি বারান্দা রয়েছে।

এখন ভবনটি দেখে বোঝার উপায় নেই, এর সঙ্গে নীলফামারীর কত ইতিহাস জড়িয়ে আছে। নীল চাষ শুরু হওয়ার পর কুঠির ইংরেজদের অনেক অত্যাচার-অন্যায় এর সঙ্গে মিশে আছে। এরপর পেরিয়ে গেছে অনেক সময়। ইতিহাসের বাঁকে হারিয়ে গেছে সেই দুঃসময়। বদলে গেছে নীলকুঠির বাসিন্দা। একসময় এটি মহকুমা প্রশাসকের বাস ভবন ছিল। ১৯৮৪ থেকে ১৯৮৮ সাল পর্যন্ত ছিল জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের বাসভবন। ১৯৯৯ সাল থেকে নীলফামারী অফিসার্স ক্লাব হিসেবে ব্যবহƒত হয়ে আসছে। অর্থাৎ ইতিহাসের সাক্ষী হতে চাইলে ঘুরে আসতে পারেন।

মজার ব্যাপার হচ্ছে, প্রায় দেড়শ বছরের পুরোনো ভবনটির চুন-সুরকি একটুও খসে পড়েনি। আজও তা অটুট রয়েছে। এখানে ভ্রমণের পাশাপাশি দেখে আসতে পারেন নীল সাগর, জাদুঘর, ধর্মপালের গড়, কুন্দুপুকুর মাজার, ময়নামতির দুর্গ, ভীমের মায়ের চুলা প্রভৃতি। জেলার ওপর দিয়ে বয়ে গেছে তিস্তা, ঘাঘটসহ কয়েকটি নদ-নদী। নীলফামারী শহরের উপকেন্দ্র সর্বমঙ্গলা নদীর তীরে শাখা-মাছা নামে দুটি নৌবন্দর ছিল। বন্দর থেকে নীলকরদের মালামাল আমদানি ও রফতানি হতো।

ইতিহাস থেকে জানা যায়, এ অঞ্চলে নীল চাষের খামার স্থাপন করে ইংরেজ নীলকররা। উর্বর ভূমি নীল চাষের অনুকূল হওয়ায় দেশের অন্য এলাকার তুলনায় নীলফামারীতে একাধিক নীলকুঠি ও নীল খামার গড়ে ওঠে। ঊনবিংশ শতকের শুরুতে জেলার দুরাকুটি, ডিমলা, কিশোরগঞ্জ, টেঙ্গনমারী, রামনগর, বাহালীপাড়া প্রভৃতি স্থানে নীলকুঠি স্থাপিত হয়।

দূর-দূরান্ত থেকে ভ্রমণপ্রিয় অনেক মানুষ নীলকুঠি দেখার জন্য ভিড় করেন।

 

যেভাবে যাবেন

নীলকুঠি আসা খুব সহজ। ঢাকা থেকে নীলফামারীগামী বাসে চড়ে রওনা দিতে পারেন। নীলফামারী বাসস্ট্যান্ডে নামুন। এখান থেকে হেঁটে অথবা রিকশায় ছয় থেকে সাত মিনিটের রাস্তা অতিক্রম করলেই পৌঁছে যাবেন নীলকুঠিতে। আশপাশে থাকা-খাওয়ার জন্য পাওয়া যাবে অনেক আবাসিক হোটেল ও রেঁস্তোরা।

পাদটীকা

১৮৪৭-৪৮ সালে অলাভজনক নীল চাষে আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন কৃষকরা। এ কারণে নীলকররা কৃষকদের ওপর অত্যাচার শুরু করেন। অনেকের মতে, ১৮৫৯-৬০ সালে কৃষকদের ব্যাপক বিদ্রোহের ফলে নীল চাষ বন্ধ হয়ে যায়। তখন নীলকররা যায় পালিয়ে। সেই ‘নীল খামার’ থেকে ‘নীলখামারি’ হয়ে আজকের নীলফামারী নামটি পেয়েছি আমরা।

নীলফামারী