সারা বাংলা

নীলফামারীর মৎস্য বীজ উৎপাদন খামারে স্থবিরতা

তৈয়ব আলী সরকার, নীলফামারী: নীলফামারীর মৎস্য বীজ উৎপাদন খামারে মাছের রেণু থেকে পোনা উৎপাদন স্থবির হয়ে পড়েছে। প্রয়োজনীয় জনবল ও কারিগরি উপকরণের অভাবে আশানুরূপ পোনা উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে বলে মনে করেন খামারের ব্যবস্থাপক খায়রুল আলম।
খামার ব্যবস্থাপকের কার্যালয়ে গিয়ে জানা যায়, এক কোটি সাত লাখ টাকা ব্যয়ে আট একর ৩৩ শতাংশ জমির ওপর খামারটি তৈরি করা হয়। জেলায় মাছের পোনা বা রেণুর চাহিদা মিটিয়ে অন্য জেলায় পোনা সরবরাহের লক্ষ্যে এ খামার স্থাপন করা হয়। কিন্ত সেই লক্ষ্যে পৌঁছা তো দূরের কথা স্থানীয় পর্যায়ে চাহিদা মেটাতে ব্যর্থ হয়েছে খামারটি।
সূত্র জানায়, খামারে রয়েছে আটটি পুকুর। সেখানে মাছের রেণু উৎপাদন করে পর্যায়ক্রমে পুকুরে ছাড়তে হয়। রেণু থেকে ধানি পোনা করতে পুকুরে পানির পরিমাণ লাগে প্রায় আড়াই ফুট। কিন্তু (পুকুরে) সেখানে পানি না থাকায় পোনা উৎপাদন দিনের পর দিন ব্যাহত হচ্ছে। পানি সংকটের কারণে এমনটি হচ্ছে বলে ধারণা করেন পাম্প অপারেটর শাহানুর আলম।
খামার ব্যবস্থাপক জানান, এ খামারে তিন ধরনের রেণু উৎপাদন করা হয়। এর মধ্যে রুই, মৃগেল, কার্প জাতীয় পোনা উৎপাদন করা হয়। খামারের ৬ নং, ৭ নং ও ৮ নং পুকুরে পানি না থাকায় কোনোভাবেই মা (ব্রুড) মাছের চাষ করা সম্ভব হচ্ছে না। আর ব্রুড মাছ উৎপাদন না হলে রেণু বা পোনা আশা করা যায় না।
গতকাল মঙ্গলবার সরেজমিনে দেখা যায়, ছয়জন লোকবলের মধ্যে তিনজন উপস্থিত রয়েছেন। এর মধ্যে খামার ব্যবস্থাপক, ফিল্ড এসিস্টেন্ট ও পাম্প অপারেটর কর্মরত আছেন। কিন্তু লোকবল প্যান্ডান্ট অনুযায়ী খামারে ছয়জন কর্মকর্তা, কর্মচারী থাকার কথা। প্রয়োজনীয় সংখ্যক জনবল না থাকায় রেণু থেকে উৎপাদন স্থবির হয়ে পড়েছে।
স্থবিরতার কারণ সম্পর্কে খামার ব্যবস্থাপক জানান, পুকুরে পর্যাপ্ত পানির অভাব, প্রয়োজনীয় পানির পাম্প, অক্সিজেন সিলিন্ডার ও রেফ্রিজারেটর (ফ্রিজ) নেই। এসব কারণে খামারটি এখন সি গ্রেডে অবস্থান করছে। প্রতিদিন ৪-৫ জন শ্রমিকের প্রয়োজন হয়। কিন্তু অর্থের অভাবে দুজন শ্রমিক দিয়ে হাজিরা ভিত্তিতে কাজ চালিয়ে নেওয়া হয়। তাদের বেতন ভাতা দিতে গিয়ে হিমশিম খেতে হয়।
পাম্প অপারেট শাহানুর আলম জানান, দিন রাত্রী পরিশ্রম করে পুকুরে পানি দিয়েও মাছের পোনা বাঁচানো যাচ্ছে না। কারণ পুকুরের গভীরতা না থাকায় বারবার সেচ দিয়ে পানি ধরে রাখা যায় না। মা (ব্রুড) মাছের পুকুরে প্রায় ছয়-সাত ফুট পানি থাকার কথা থাকলেও পাম্পের অভাবে ওই পরিমাণ পানি দেওয়া সম্ভব হয় না। ওই পুকুরগুলোতে বর্তমানে পানির পরিমাণ দুই থেকে আড়াই ফুট। এখানে পুরোনো একটি পাম্প দিয়ে পানি উত্তোলন মোটেই সম্ভব না। আরও দু’একটি নতুন পাম্প থাকলে শতভাগ রেণু বা পোনা উৎপাদন করা যেত।
জেলা সদরের ডুলিয়ার বাজারের মৎস্যচাষি সিদ্দিক মিয়া জানান, স্থানীয় বাজারে পোনা বা রেণুর চাহিদা মিটিয়ে এখানকার উৎপাদিত পোনা অন্য জেলায় যাওয়ার কথা থাকলেও তা মোটেই সম্ভব হচ্ছে না। তাই বিভিন্ন হ্যাচারি থেকে চড়া দামে পোনা কিনে পুকুরে ছাড়তে হচ্ছে তাদের। সরকারের এ উদ্যোগ মোটেই কাজে আসেনি। কোটি টাকা ব্যয়ে তৈরি এ প্রকল্পের এখন স্থবিরতা দেখা দিয়েছে।
স্থানীয়রা জানান, খামারটি পরিপূর্ণ চালু হলে এখানকার মৎস্যচাষি ও শিক্ষিত বেকার যুবকরা খামারের সহযোগিতা নিয়ে কর্মসংস্থানের সুযোগ করতে পারত। এতে দেশে বাড়তি বেকারত্বের বোঝা কিছুটা হলেও কমত। দেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হলে নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হতে পারত।
গতকাল সকালে খামারে কথা হয়, দিনাজপুরের চিরিরবন্দর উপজেলার মৎস্যচাষি আবদুল হালিমের সঙ্গে। তিনি জানান, এটি একটি সম্ভাবনাময় মৎস্য বীজ উৎপাদন খামার। গত বছর এখান থেকে পোনা কিনে এক বিঘা আয়তনে পুকুরে ছেড়েছিলেন। সেই পোনা পুকুরে শতভাগ জীবিত ছিল। ওই সময় লক্ষাধিক টাকার মাছ বিক্রি করে লাভবান হয়েছেন। তাই এবারও এ খামারে পোনা কিনতে এসেছেন।
অব্যবস্থাপনার কথা স্বীকার করে সদর উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা ওবায়দুল হক জানান, সমস্যার কথা মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ে বারবার জানিয়েও কোনো কাজ হচ্ছে না।
জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. আশরাফুজ্জামান জানান, দেশে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদের অফুরন্ত সম্ভাবনা রয়েছে। এ জন্য সরকার স্থানীয়ভাবে সারা দেশে ছোট বড় মিলে ১৪৮টি মৎস্য বীজ উৎপাদন খামার তৈরি করে মাছ চাষে কৃষকদের উদ্বুদ্ধ করতে এসব প্রকল্প হাতে নিয়েছে। দেশে মাছের উৎপাদন বৃদ্ধিতে সরকার নিরলস কাজ
করে যাচ্ছে।

ট্যাগ »

সর্বশেষ..