‘নেতৃত্বের ভূমিকায় যেতে হলে মানবিক গুণাবলিসম্পন্ন হতে হবে’

একটি প্রতিষ্ঠানে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকজন বিভাগ-প্রধানের সাফল্যের ওপর নির্ভর করে ওই প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা বা সিইও’র সাফল্য। সিইও সফল হলে প্রতিষ্ঠানটির মুনাফা বেশি হয়। খুশি হন শেয়ারহোল্ডাররা। চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে সিইও’র সুনাম। প্রতিষ্ঠানের প্রধান অর্থ কর্মকর্তা (সিএফও), কোম্পানি সচিব, চিফ কমপ্লায়েন্স অফিসার, চিফ মার্কেটিং অফিসারসহ এইচআর প্রধানরা থাকেন পাদপ্রদীপের আড়ালে। টপ ম্যানেজমেন্টের বড় অংশ হলেও তারা আলোচনার বাইরে থাকতে পছন্দ করেন। অন্তর্মুখী এসব কর্মকর্তা সব সময় কেবল প্রতিষ্ঠানের লক্ষ্য বাস্তবায়নে ব্যস্ত থাকেন। সেসব কর্মকর্তাকে নিয়ে আমাদের নিয়মিত আয়োজন ‘টপ ম্যানেজমেন্ট’। শেয়ার বিজের সঙ্গে একান্ত সাক্ষাৎকারে এবার এসএসডি টেক লিমিটেডের প্রধান মানবসম্পদ (এইচআর) ব্যবস্থাপক আলেয়া পারভীন লীনা। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন মো. হাসানুজ্জামান পিয়াস

আলেয়া পারভীন লীনা এসএসডি টেক লিমিটেডের প্রধান মানবসম্পদ (এইচআর) ব্যবস্থাপক। দেশি-বিদেশি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে ১৭ বছর ধরে কাজ করছেন তিনি। এমবিএ করেছেন এইচআরএমের ওপর। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি দুই পুত্রসন্তানের মা। কর্মজীবনে এইচআর নিয়ে কাজ করলেও তিনি একজন প্রতিষ্ঠিত কলাম লেখক ও হিউম্যান রাইটস অ্যাক্টিভিস্ট। তিনি বিশ্বাস করেন, আত্মনির্ভরশীল হওয়ার প্রেরণা ও সৃজনশীল চিন্তা করতে পারার ক্ষমতাই মানুষের সফলতার ভিত গড়ে দেয়

শেয়ার বিজ: ক্যারিয়ারের পেছনের গল্প দিয়ে শুরু করতে চাই…
আলেয়া পারভীন লীনা: আমার জন্ম ও বেড়ে ওঠা কুমিল্লায়। এসএসসি পাস করেছি কুমিল্লার ফয়জুন্নেসা সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় থেকে। পরে ঢাকায় পরিবারসহ শিফট করা হয়। আমি এইচএসসি পাস করি ভিকারুন্নিসা নূন কলেজ থেকে। স্নাতক সম্পন্ন করি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। স্বপ্ন ছিল অর্থনীতি পড়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হব। নানা কারণে সে স্বপ্ন আর থাকেনি বা পূরণ হয়নি। বিশ্ববিদ্যালয়ে বিভিন্ন সামাজিক ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত ছিলাম। সেই থেকে মানুষের সঙ্গে, মানুষের নানা ইস্যু নিয়ে ও মানুষের অধিকার নিয়ে কাজ করার স্বপ্ন দেখি। ক্যারিয়ার বলতে যা বোঝায়, সেটা ঠিক পরিকল্পনা করে শুরু করেছি তা বলা যাবে না। টগবগে ছিলাম তখন, কিন্তু বাবা-মায়ের অধীনে ছিলাম বলে নিজের মতো করে সব সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা ছিল না। বাবা-মায়ের ইচ্ছে ছিল আমি নারী তাই ডেস্ক জব করতে হবে। তখন ইন্টারন্যাশনাল এনজিওতে জব পাওয়া ছিল স্বপ্নের মতো। আমিও সুযোগ পেয়েছিলাম, কিন্তু ফিল্ডে কাজ করতে হবে বলে অনুমতি পাইনি। অথচ আমার অর্থনৈতিক স্বাধীনতা প্রয়োজন। এই একটি কারণে পরবর্তীকালে যে চাকরি পেয়েছিলাম, সেটাতেই যোগ দিই। আমি স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করি ২০০১ সালে। রেজাল্ট বের হওয়ার আগেই যোগ দিয়েছিলাম একটি আমেরিকান-বাংলাদেশি ভেঞ্চারের অ্যাডমিন বিভাগে এক্সিকিউটিভ হিসেবে। বেতন যা দিতে চেয়েছিল সেটাতেই রাজি ছিলাম। বার্গেইনিং করার স^ভাব কখনই ছিল না, এখনও নেই। যাই হোক, অ্যাডমিন হয়ে গেল এইচআর। সেই থেকে আমার এইচআরে পথ চলা।

শেয়ার বিজ: প্রতিষ্ঠানের লক্ষ্য বাস্তবায়নে দক্ষ মানবসম্পদ ব্যবস্থাপকের ভূমিকা ও গুরুত্ব সম্পর্কে বলুন…
আলেয়া পারভীন: এইচআর বিভাগে মানুষকে নিয়েই কাজ করতে হয়। মানুষের নানা ইস্যু নিয়ে কাজ করে এ বিভাগ। মানুষকে সঠিকভাবে গাইড করা, প্রতিষ্ঠানের প্রতি অনুগত রাখতে সাহায্য করা, প্রতিষ্ঠানের লক্ষ্য, উদ্দেশ্য ও আদর্শের সঙ্গে প্রতিটি সদস্যকে অ্যালাইন রাখা এ কাজের মধ্যে পড়ে। কর্মীদের সুযোগ-সুবিধা দেখভাল, কর্তৃপক্ষ ও কর্মীদের মধ্যে সেতু হিসেবে কাজ করা এ বিভাগের মূল কাজ। আরেকটি কাজ করতে হয়, যেটি সবচেয়ে কঠিন, সেটি হচ্ছে টপ ম্যানেজমেন্টকে কর্মী-সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করা এবং বার্গেইনিং এজেন্ট হিসেবে নিজের যোগ্য জায়গাটিকে নিশ্চিত করা। দেখুন, যেকোনো মালিক বা সিইও যাই বলেন না কেন, তারা চান সব কর্মী সমানভাবে তাদের সেরাটা দেবে। প্রতিষ্ঠানের যেকোনো টার্গেটের সঙ্গে তাদের একনিষ্ঠ হয়ে কাজ করতে হবে। এজন্য প্রয়োজন সেই কর্মীটি কতটুকু দিতে প্রস্তুত আছে, তা নিশ্চিত করা। এই বিষয়গুলো নিয়ে কাজ করে মানবসম্পদ বিভাগ।

শেয়ার বিজ: কর্মক্ষেত্রে মানবসম্পদ ব্যবস্থাপকের জন্য চ্যালেঞ্জিং বিষয় কী?
আলেয়া পারভীন: বিভিন্ন প্রশাসনিক চ্যালেঞ্জের পাশাপাশি রয়েছে মানুষকে পরিচালনা করা। একেকজন কর্মী একেক পরিবেশ থেকে আসে। তাদের শিক্ষা, উদ্দেশ্য, বিশ্বাস, অর্জন, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা, নিজেকে নিয়ে ভাবনা-চিন্তা সবকিছুই আগে থেকে নির্ধারিত হয়ে আসে। এই মানুষদের নতুন করে নতুন একটি ভাবনার সঙ্গে পরিচিত করানো, নতুন কর্মপদ্ধতিতে অভ্যস্ত করা, নতুন টার্গেটের সঙ্গে নিজের টার্গেটকে অ্যালাইন করানো এই কাজগুলো সবচেয়ে চ্যালেঞ্জিং। কারণ আগে পরিষ্কার থাকতে হবে একজন লোক কেন তার এতদিনের জানাশোনা জগৎ থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করে নতুন শিক্ষার কিংবা নীতির সঙ্গে নিজেকে খাপ খাইয়ে নেবেন? এখানে যেমন প্রতিষ্ঠানের বেনিফিট ক্যালকুলেট করতে হবে, ঠিক তেমনি সেই ইনডিভিজুয়ালের বেনিফিটকেও হিসেবে রাখতে হবে। দিনে দিনে মানুষ আরও অনেক বেশি ক্যালকুলেটিভ হচ্ছে। গ্লোবাল হচ্ছে। সেই পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে যদি আপনার প্রতিষ্ঠান বা মানবসম্পদ বিভাগ নিজেদের আপডেট এবং আপগ্রেড না করতে পারে, তবে সেখানে সাফল্য আসা কঠিন।

শেয়ার বিজ: বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে অনেক নারীকর্মী নিয়োগ হলেও মধ্য বা উচ্চ পর্যায়ে ক্রমে এ সংখ্যার হার কম বা নেতৃত্ব দিচ্ছে এমন নারীকর্মীর সংখ্যা নগণ্য এমন হওয়ার কারণ কী বলে মনে করেন?
আলেয়া পারভীন: আমাদের দেশে এমনিতেই নারীদের সুযোগ তুলনামূলকভাবে কম। এমন না যে নারীরা অদক্ষ কিংবা কম শিক্ষিত অথবা পুরুষের তুলনায় তারা কিছু কম বোঝে। বিষয়টা হচ্ছে, আমাদের সমাজে ছোটবেলা থেকেই ছেলেরা যতটা সুযোগের মধ্যে বেড়ে ওঠে, একজন মেয়ে সে তুলনায় কিছুই পায় না। অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে, যোগ্যতার প্রমাণ দিয়ে কেউ কেউ সামনে আসে। আমাদের সমাজকাঠামো এখনও নারীকে নেতৃত্বের জায়গায় দেখতে অভ্যস্ত নয়। আমার নিজের কথা বলি আমি তখন এক জায়গায় বিভাগীয় প্রধান হিসেবে কাজ করতাম। বোর্ড মিটিং বা সিনিয়র লিডারদের মিটিংয়ে আমাকে কথা বলার সুযোগ কম দেওয়া হতো। দেখা যেত, এইচআরের প্রেজেন্টেশন রাখা হতো সবার শেষে। ততক্ষণে মিটিংয়ে উপস্থিত সবাই এক্সহস্টেড, শোনার মতো ধৈর্য নেই। তাই সিদ্ধান্ত নেওয়ার বেলায় বলা হতো, পরে দেখা যাবে। একদিন আমি এর প্রতিবাদ করলাম। আমাকে সরাসরি আরেকজন ডিপার্টমেন্ট হেড বললেন, আপনি তো মেয়েমানুষ। আপনার আবার কথা কী? বুঝে নেন, অবস্থাটা। তার মানে, নারী বলে আমার ডিপার্টমেন্টের বিষয়গুলোও অবহেলিত থাকবে। অথচ আমি কাজ করি অরগানাইজেশনের গোটা জনগোষ্ঠী নিয়ে, তারা কাজ করে একটি ক্ষুদ্র অংশ নিয়ে। এইচআর বিভাগের যদি মানুষের অধিকার নিয়ে কথা বলার সুযোগ না থাকে, তাহলে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। একজন নারী বলেই আমাকে যে উপেক্ষা করা হবে, সেটা তো হতে পারে না। তাছাড়া লিডারশিপ রোলে আবার জেন্ডারবৈষম্য কেন? এখানে যোগ্যতাই প্রধান। নারী বলে এই ভূমিকায় অতিরিক্ত কোনো সুবিধা নিচ্ছি না বা চাই না। তার মানে পুরোটাই মানসিকতার বিষয়। তবে আমি আশাবাদী এই ধারাবাহিকতার পরিবর্তন হবে। আমাদের দেশের নারীরা এখন অনেক এগিয়ে। শিক্ষা ও কর্মÑদুই জায়গাতেই তারা এগিয়ে রয়েছে। নেতৃত্বেও তারা এগিয়ে যাবে সব বাধা উপেক্ষা করে।

শেয়ার বিজ: টপ ম্যানেজমেন্টে নারী কর্মীদের আরও অংশগ্রহণের জন্য কী কী বিষয় জরুরি?
আলেয়া পারভীন: নারীদের যেমন এগিয়ে আসতে হবে, তেমনি কর্মক্ষেত্রে নারীর উপযোগী একটি পরিবেশ নিশ্চিত করাও জরুরি। নারীদের হেনস্তার হাত থেকে রক্ষার জন্য থাকা উচিত নীতিমালা এবং তার যথাযথ বাস্তবায়ন। নারীদের জন্য কিছু বিশেষ অবকাঠামোগত উন্নয়ন নিশ্চিত করা জরুরি। মাতৃত্বকালীন সময়ে নারীদের কিছু বিশেষ সুবিধা থাকা উচিত। একজন মা যেন নিশ্চিন্তে কর্মে মনোনিবেশ করতে পারেন সেজন্য যতটা সম্ভব তার ব্যক্তিগত অসুবিধাগুলোকে সঠিকভাবে অ্যাড্রেস করে সেই অনুযায়ী প্রশাসনিক সুবিধাগুলো সহজলভ্য করাও জরুরি। তার চেয়েও বেশি জরুরি প্রতিষ্ঠানে লিঙ্গ-সংবেদনশীলতা বাড়ানো। নারী হিসেবে নয়, একজন সহকর্মী হিসেবে তার যোগ্যতা ও কর্মকে বিবেচনা করার মতো মানসিক বিশ্বাস গড়ে তুলতে হবে। নারীর বেড়ে ওঠার মতো পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। তাহলে আরও বেশি পেশাজীবী নারী-নেতৃত্বের বিকাশ ঘটবে।

শেয়ার বিজ: কর্মক্ষেত্রে নারী কর্মীদের প্রেরণার জন্য কিছু বলুন…
আলেয়া পারভীন: দেখুন, আমি ব্যক্তিগতভাবে কাউকে অনুসরণ করি না বা পছন্দ করি না। প্রতিটি মানুষই অনন্য। তাদের নিজস্বতা থেকে শুরু করে গঠন ও বেড়ে ওঠা আলাদা। চিন্তার প্রকৃতি ও বিশ্বাস আলাদা। তাই সবাই সফল হতে চায়, তাদের নিজস্ব পরিকল্পনা থাকে এবং সে অনুযায়ী নিজেকে গড়ে তুলতে চেষ্টা করে। আমি ছোটবেলা থেকে কেবল একটা জিনিস চেয়েছি। আর সেটা হচ্ছে যেভাবেই হোক আমাকে আমার মতো করে নিজের পরিচয়ে দাঁড়াতে হবে। সবাই আমাকে লীনা হিসেবে চিনবে, অন্য কারও মতো করে নয়। তাই আমি বিশ্বাস করি, যিনি সামনে আসতে চান তার নিজের ওপর আস্থা, বিশ্বাস, স্বপ্ন ও দৃঢ়তা থাকতে হবে। তাহলে তিনি একদিন সফল হবেন। তবে তার আগে চাই নিজেকে সঠিকভাবে চিনতে পারা। আমি কে, কী আমার ক্ষমতা ও আমি কী হতে চাই, সেটা জানা থাকলে দুনিয়ায় কারও পরামর্শের প্রয়োজন পড়ে না। নিজেই নিজের রাস্তা খুঁজে নিতে পারবেন।

শেয়ার বিজ: সফল মানবসম্পদ ব্যবস্থাপক হতে হলে আপনার পরামর্শ?
আলেয়া পারভীন: কেবল মানবসম্পদ ব্যবস্থাপকই নয়, যেকোনো পদে নেতৃত্বের ভূমিকায় যেতে হলে তাকে মানবিক গুণাবলিসম্পন্ন মানুষ হতে হবে। অন্যের জায়গাকে নিজের মতো করে বোঝা ও ব্যাখ্যা করার মতো সামর্থ্য থাকতে হবে। যেকোনো সমস্যাকে আবেগ ও যুক্তির সংমিশ্রণে বিশ্লেষণ করার মতো দৃষ্টিভঙ্গি থাকাটা জরুরি। নির্মোহ ও নির্লিপ্ত থাকার কৌশল আবিষ্কার করতে হবে। একইসঙ্গে আন্তরিকতাকে বাদ দেওয়া যাবে না। পেশাদারিত্ব থাকা বাধ্যতামূলক। কাজের জায়গাকে ব্যক্তিগত বিষয় বা আলাপের মধ্যে না আনা ভালো। কর্মপরিবেশ যেমন বন্ধুভাবাপন্ন হবে, ঠিক তেমনি বজায় রাখতে হবে পেশাদারিত্বের দিকটিও। এখানে সবাই সবার বন্ধু, কিন্তু কেউ কারও দ্বারা প্রভাবিত নয়। একজন নেতার কাজ হচ্ছে টিমের সক্ষমতাকে বৃদ্ধি করা এবং সেইসঙ্গে নিজেকেও সেই লেভেলের জন্য সক্ষম করে গড়ে তুলতে পারা।