নেপালের নিয়ন্ত্রণ কক্ষের ৬ কর্মকর্তা বদলি

উড়োজাহাজ দুর্ঘটনা

শেয়ার বিজ ডেস্ক: নেপালের রাজধানী কাঠমান্ডুর ত্রিভুবন বিমানবন্দরে বাংলাদেশি উড়োজাহাজ বিধ্বস্ত হওয়ার ঘটনায় নিহতদের তালিকা প্রকাশ করেছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। এতে ২৬ বাংলাদেশির মৃত্যু নিশ্চিত হওয়া গেছে। বাকি ১০ জন বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। এদিকে এ দুর্ঘটনায় বিমানের পাইলটের ভুল ছিল না বলে দাবি করেছে ইউএস-বাংলা এয়ার কর্তৃপক্ষ। অন্যদিকে দুর্ঘটনার সময়ে বিমানবন্দরের নিয়ন্ত্রণ কক্ষের দায়িত্বে থাকা ছয় কর্মকর্তাকে বদলি করা হয়েছে বলে নেপালি গণমাধ্যম সূত্রে জানা গেছে।
কাঠমান্ডুর বাংলাদেশ হাইকমিশন থেকে পাঠানো তথ্যমতে, উড়োজাহাজে থাকা ৩৬ বাংলাদেশির মধ্যে চারজন ক্রু এবং ৩২ জন যাত্রী ছিলেন। ক্রুদের চারজনই মৃত্যুবরণ করেছেন। এছাড়া ২২ যাত্রীর মৃত্যু হয়েছে। আহত অবস্থায় হাসপাতালে আছেন ১০ জন। হাইকমিশনের ফার্স্ট সেক্রেটারি অসিত বরণ সরকার এ প্রসঙ্গে গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ১০ জনই গুরুতর আহত।
এদিকে ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনসের জনসংযোগ বিভাগের মহাব্যবস্থাপক কামরুল হাসান ঢাকায় সাংবাদিকদের বলেন, আহত ১০ জনের মধ্যে ইমরানা কবির হাসি, শাহরিন আহমেদ, শেখ রাশেদ রুবাইয়াত, আলমুন নাহার অ্যানি, মেহেদী হাসান, সাঈদা কামরুন্নাহার স্বর্ণা, কবির হোসেন ও মো. শাহীন বেপারি কাঠমান্ডু মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। এছাড়া নরভিক হাসপাতালে ইয়াকুব আলী এবং ওম হাসপাতালে রিজওয়ানুল হক চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
যাত্রীর মধ্যে ফয়সাল আহমেদ, আলিফুজ্জামান, বিলকিস আরা, বেগম হুরুন নাহার, বিলকিস বানু, আখতারা বেগম, নাজিয়া আফরিন চৌধুরী, উম্মে সালমা, রকিবুল হাসান, হাসান ইমাম, মো. নজরুল ইসলাম, আঁখি মনি, মিনহাজ বিন নাসির, ফারুক হোসেন প্রিয়ক, তার মেয়ে প্রিয়š§য়ী তামারা (শিশু), মতিউর রহমান, এসএম মাহমুদুর রহমান, তাহিরা তানভিন শশী রেজা, পিয়াস রায়, মো. নুরুজ্জামান, রফিক জামান, তার স্ত্রী সানজিদা হক বিপাশা, তাদের ছেলে অনিরুদ্ধ জামান (শিশু) মারা গেছেন। তাদের মধ্যে নাজিয়া আফরিন চৌধুরী ও উম্মে সালমা পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ে কর্মরত ছিলেন। সানজিদা হক বিপাশা কর্মরত ছিলেন নাগরিক সংগঠন সুশাসনের জন্য নাগরিক-সুজনে।
ইউএস-বাংলার পাইলট আবিদ সুলতান ও ফার্স্ট অফিসার পৃথুলা রশিদ, ক্রু খাজা হোসেন মো. শাফি ও শারমিন আক্তার নাবিলাকে নিয়ে ফ্লাইট বিএস২১১ পরিচালনা করছিলেন। তাদের সবাই মারা গেছেন বলে জানিয়েছে ইউএস-বাংলা কর্তৃপক্ষ। কামরুল হাসান জানান, ‘ফরেনসিক প্রতিবেদনসহ মেডিক্যাল প্রসিডিউর শেষ হওয়ার পর তাদের মরদেহ বাংলাদেশে নিয়ে আসা হবে। আহতদের চিকিৎসার সব ধরনের সহযোগিতা দিতে ইউএস-বাংলা প্রস্তুত রয়েছে বলেও তিনি জানান। এছাড়া ইউএস-বাংলার সিইও ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা মঙ্গলবার সকালে কাঠমান্ডুতে পৌঁছেছেন এবং সেখানে তারা তদন্ত কার্যক্রম পরিচালনায় সহযোগিতা করছেন বলে জানান তিনি। সূত্রমতে, মঙ্গলবার বেলা ১১টার দিকে ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনসের সাতজন প্রতিনিধি ও ৪৬ জন স্বজন নিয়ে ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনসের নিয়মিত ফ্লাইট কাঠমান্ডু পৌঁছেছে। কোম্পানিটি জানিয়েছে, নিহতদের মরদেহ যথাযথ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে স্বজনদের হাতে তুলে দেওয়া হবে।

পাইলটের দোষ নেই দাবি ইউএস-বাংলার

ফ্লাইট ক্যাপ্টেন আবিদ সুলতানের দিক থেকে কোনো ভুলভ্রান্তি ছিল না বলেই মনে করছে ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনস কর্তৃপক্ষ। ইউএস-বাংলার কর্মকর্তা কামরুল ইসলামের ভাষ্যমতে, ইউএস-বাংলার ড্যাশ-৮ কিউ-৪০০ মডেলের বিমানে তিনি ১৭০০ ঘণ্টা ফ্লাই করেছেন। বাংলাদেশের এভিয়েশনে ৫০০০ ঘণ্টার উপরে কাজ করেছেন। কাঠমান্ডু এয়ারফিল্ডে শতাধিক ল্যান্ডিং ওনার আছে। এয়ারফিল্ড, এয়ারক্রাফট ওনার জন্য নতুন কিছু না। আমাদের মনে হয় না, এখানে ক্যাপ্টেনের কোনো ভুলভ্রান্তি আছে।
উল্লেখ্য, পাইলটের শেষ মুহূর্তের কথোপকথনের একটি রেকর্ড এরই মধ্যে প্রকাশ পেয়েছে, যাতে মনে হয় রানওয়েতে নামা নিয়ে বিভ্রান্তি তৈরি হয়ে থাকতে পারে। বিষয়টি নিয়ে কামরুল বলেন, ‘এটিসি কন্ট্রোল ও পাইলটের লাস্ট মিনিটগুলোর কনভারসেশন ভাইটাল এভিডেন্স হিসেবে কাজ করবে। ব্ল্যাকবক্স উদ্ধার হয়েছে। ইউটিউবে অডিও এসেছে, আমরা সেটা শুনেছি। সেখানে ডেফিনেটলি একটা কনফিউশন আছে। সেখানে নেপালি মিডিয়াসহ বিশ্ব গণমাধ্যমে এটিসি কন্ট্রোলকে কিছুটা দোষারোপ করা হচ্ছে। আমরাও বলছি, এ ধরনের অবস্থার মধ্যে এটিসি কন্ট্রোল থেকেও মিসগাইডেড হতে পারে। ব্ল্যাকবক্স রিডিং সময়ের ব্যাপার। আশা করছি, আমরা পজিটিভ কোনো আউটপুট পাব। প্রকৃত দোষী কে তা বেরিয়ে আসবে। তবে ত্রিভুবন বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ বলেছে, যে দিক দিয়ে বিমানটির রানওয়েতে নামার কথা ছিল, পাইলট নেমেছেন তার উল্টো দিক দিয়ে। নেপালি কর্তৃপক্ষ ইতোমধ্যে ১৬ বছরের পুরোনো ওই উড়োজাহাজের ব্ল্যাকবক্স উদ্ধার করেছে। দুর্ঘটনার কারণ খতিয়ে দেখতে তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন নেপালের প্রধানমন্ত্রী খড়গা প্রসাদ শর্মা অলি।
এদিকে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) চেয়ারম্যান এম নাইম হাসান গতকাল সাংবাদিকদের বলেছেন, বিধ্বস্ত বিমানটির ক্যাপ্টেন আবিদ সুলতান বৈমানিক হিসেবে ভালো ছিলেন। ভালো ক্রিকেট খেলতে পারত। আমার ছাত্র ছিল। অনেকেই বলেছে সে ড্যাশ-৮-এর ভালো পাইলট ছিল।
বিমানের ত্রুটি থাকার সম্ভাবনাও নাকচ করেন বেবিচক চেয়ারম্যান। তিনি বলেন, বিমান সাধারণত কখনও পুরোনো হয় না। বিমানের মেইন জিনিস হলো ইঞ্জিন। ইঞ্জিনের একটা লাইফ আছে। ইঞ্জিন বদল করে আরেকটা লাগালে বিমান নতুন হয়ে যাবে। ৭৪৭ কত পুরোনো এয়ারক্রাফট, কত ভালো চলছে। তিনি আরও বলেন, সিভিল এভিয়েশন থেকে এয়ারওয়ার্দী সার্টিফিকেট না পেলে কেউ ফ্লাই করতে পারবে না। এই এয়ারক্রাফটের ব্যাপারে বলতে পারি এটা সকালে দুটো সর্টিং করে এসেছে। অলরেডি এটা তো টেস্টেড। সকালে ঢাকা-চট্টগ্রাম দুবার যাওয়াার পর এটা ছিল তার তৃতীয় ফ্লাইট। উড়োজাহাজটি ভালো ছিল, এটা তো নিঃসন্দেহে প্রমাণিত। যাত্রীদের বিমা সুবিধার প্রশ্নে তিনি বলেন, ইউএস-বাংলার যাত্রীদের বিমা করা ছিল। সাধারণত দুই ধরনের বিমা থাকে। একটা প্যাসেঞ্জারের, অন্যটা প্লেনের নিজস্ব বিমা। ইউএস বাংলারও আছে। তারা যথেষ্ট অ্যাকটিভ। তারা পরিস্থিতি মোকাবিলায় যথাসাধ্য চেষ্টা করছেন।

নেপালের ৬ কর্মকর্তাকে বদলি

এদিকে দেশটির ইংরেজি নিউজ পোর্টাল মাই রিপাবলিকার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভয়াবহ ওই দুর্ঘটনা প্রত্যক্ষ করার ধাক্কা ‘সামলে ওঠার সুযোগ দিতে’ বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ তাদের বদলির সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তবে নেপালের বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের উপমহাপরিচালক রাজন পোখরেল জানিয়েছেন, আলোচিত অডিও রেকর্ডের সঙ্গে ছয় কর্মকর্তাকে বদলির কোনো সম্পর্ক নেই। দুর্ভাগ্যজনক এমন দুর্ঘটনার পর মানসিক চাপ লাঘবের এটাই প্রচলিত নিয়ম। তিনি বলেছেন, ‘তাদের সামনে বড় ধরনের একটি বিপর্যয় ঘটেছে। তাদের মনের ওপর এতে বড় ধরনের চাপ পড়েছে। এ কারণে আমরা তাদের অন্য বিভাগে বদলি করেছি।’ ত্রিভুবন বিমানবন্দরের জেনারেল ম্যানেজার রাজ কুমার ছেত্রীর বরাত দিয়ে স্থানীয় সংবাদমাধ্যমগুলো জানিয়েছে, তদন্তকারীরা সোমবারই ধ্বংসস্তূপ থেকে ফ্লাইটের ডেটা রেকর্ডার উদ্ধার করেছেন। এ দুর্ঘটনার কারণ খতিয়ে দেখতে ছয় সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি করেছে নেপাল সরকার। দেশটির বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের সাবেক মহাপরিচালক যজ্ঞ প্রসাদ গৌতমের নেতৃত্বে ওই কমিটি ইতোমধ্যে কাজ শুরু করেছে। তাদের দ্রুততম সময়ের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে।
দেশে-বিদেশে শোক
দুর্ঘটনায় নিহতদের প্রতি শোক ও তাদের পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানিয়েছেন দেশে-বিদেশে অনেকেই। রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন এক শোকবার্তা পাঠিয়েছেন রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর কাছে। তাতে তিনি শোক জানিয়েছেন। এছাড়া নিহতদের সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো প্রিয়জনদের মৃত্যুতে শোক পালনে নানা কর্মসূচি ঘোষণা করেছেন। গতকাল দুপুরে পরিকল্পনা বিভাগের সম্মেলন কক্ষে বিসিএস ইকোনমিক অ্যাসোসিয়েশনের জরুরি সভায় অ্যাসোসিয়েশনের সদস্যরা ইকনমিক ক্যাডারের দুই কর্মকর্তার মৃত্যুতে তিন দিনব্যাপী বিভাগীয় শোক ঘোষণা করেন। তারা গতকাল মঙ্গলবার থেকে বৃহস্পতিবার পর্যন্ত শোক পালন এবং কালো ব্যাজ ধারণের পাশাপাশি নাজিয়া আফরিন চৌধুরী ও উম্মে সালমার নামে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের দুটি সম্মেলন কক্ষের নামকরণ, পরবর্তী সময়ে একনেক সভায় শোক প্রস্তাব উত্থাপন, শোকসভা, মিলাদ ও দোয়া, পরিবারদ্বয়কে আর্থিক অনুদান প্রদানসহ নানা কর্মসূচির ঘোষণা করেন। এছাড়া সুশাসনের জন্য নাগরিক-সুজনের সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার তার সহকর্মী বিপাশার মৃত্যুতে শোক জ্ঞাপন করেছেন।