বাণিজ্য সংবাদ

নোয়াখালীর ভূমি অফিসগুলোয় দুর্নীতি ও হয়রানির অভিযোগ

আকাশ মো. জসিম, নোয়াখালী: নোয়াখালীর ভূমি অফিসগুলোয় দুর্নীতি ও হয়রানি সীমাহীন পর্যায়ে পৌঁছেছে। সেবাগ্রহণকারীদের অভিযোগ, ঘুষ ছাড়া ভূমি অফিসে কোনো সেবা পাওয়া যায় না। এখানকার প্রায় ভূমি অফিসে দালাল চক্রের দৌরাত্ম্যের কাছে সেবাপ্রার্থীরা রীতিমতো জিম্মি হয়ে পড়েছে। ইউনিয়ন থেকে শুরু করে উপজেলা ও জেলা ভূমি অফিস এখন দুর্নীতি ও অনিয়মের আখড়ায় পরিণত হয়েছে। কোথাও কোনো অভিযোগ দিয়েও প্রতিকার নেই, যদিও সংশ্লিষ্ট ভূমি অফিস কর্তৃপক্ষ এসব অভিযোগ অস্বীকার করছে।
সূত্র জানায়, সম্প্রতি দেশের সব জেলাতে সরকারি সেবাদানকারী অফিস এবং প্রতিষ্ঠানে দুর্নীতি ও অনিয়ম বন্ধে দুদকের পক্ষ থেকে জেলা প্রশাসকদের যে চিঠি দেওয়া হচ্ছে, তার মধ্যে ভূমি অফিসগুলোর কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এর পরও দুর্নীতি ও জালিয়াতি বন্ধ হচ্ছে না।
ভূমি অফিসের দুর্নীতিসংক্রান্ত দুদকের বার্ষিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভূমি রেজিস্ট্রেশন, নামজারি, ভূমি অধিগ্রহণ, ভূমিকর, ভূমি রেকর্ড, খাসজমি এবং পরিত্যক্ত ও অর্পিত সম্পত্তি ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষ টাকা ছাড়া কোনো সেবা পায় না।
বিভিন্ন সময়ে এমন অভিযোগ পেয়ে অভিযান চালিয়ে অভিযোগের সত্যতা খুঁজে পেয়েছে দুদক। এসব ক্ষেত্রে ঘুষ ও দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের চিহ্নিত করে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হলেও কারও বিরুদ্ধে স্থায়ী কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এক অফিস থেকে শাস্তিমূলকভাবে বদলি করলেও ওই অসাধু কর্মকর্তারা নতুন অফিসে আগের মতোই ঘুষ ও অনিয়মের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে। অনেকে বছরের পর বছর একই অফিসে চাকরি করে অবৈধ সম্পদ গড়ে তুলেছে।
সম্প্রতি গত ২৯ এপ্রিল নোয়াখালীর বিচ্ছিন্ন দ্বীপ হাতিয়া উপজেলায় ভূমি কর্মকর্তাদের দুর্নীতি বন্ধের দাবিতে স্থানীয় এলাকাবাসী মানববন্ধন ও প্রতিবাদ কর্মসূচিও পালন করেছেন।
দুদকের প্রতিবেদন সূত্রে জানা যায়, ভূমি অফিসগুলোতে সবচেয়ে বেশি জালিয়াতির ঘটনা ঘটে নামজারি, ভূমি রেজিস্ট্রেশন, ভূমি অধিগ্রহণ, সরকারি খাসজমি, পরিত্যক্ত জমি ও অর্পিত সম্পত্তি ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে। নামজারিতে ঘুষ লেনদেন ওপেন সিক্রেট। ঘুষ ছাড়া কোনো নামজারি হয় না। এ ঘুষের সঙ্গে দালাল থেকে শুরু করে পদস্থ কর্মকর্তাদের একটি অংশ জড়িত।
অফিসের পিয়ন ও দালালদের মাধ্যম ছাড়া ভুক্তভোগীরা নামজারি করতে পারে না। টাকা দিতে না চাইলে নামজারিতে নানাভাবে হয়রানি করা হয়। ভূমি রেজিস্ট্রেশনেও জালিয়াতি করা হয়। জালিয়াতির মাধ্যমে সরকারি জমি যে কারও নামে এবং একজনের জমি অন্যের নামে রেজিস্ট্রেশন করে দেওয়া হয়। শুধু তাই নয়, ব্যক্তিমালিকানাধীন ও আদালতের ডিক্রিপ্রাপ্ত জমিও তহশিল অফিসগুলোর মাধ্যমে বন্দোবস্ত হয়ে চলছে, যা স্পষ্টত আদালত অবমাননার শামিল।
এ বিষয়ে জেলা প্রশাসন স্পষ্ট কোনো বক্তব্য না দিলেও সরকারের শতভাগ সুবিধাভোগী কোনো কর্মচারীর সংগঠন করা বেআইনি ও রাষ্ট্রীয় শৃঙ্খলাবিরোধী বলে মনে করেন নোয়াখালী আইনজীবী সমিতির আইনজীবী এবিএম শাহজাহান শাহিন। তিনি বলেন, স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান কিংবা আধাসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মচারীরা কোনো সংগঠন করতে পারে, কিন্তু রাষ্ট্রীয় কোনো কর্মচারীর ক্ষেত্রে এ ধরনের সংগঠন করা বেআইনি ও অন্যায়।
অনুসন্ধানে জানা যায়, কোনো কোনো ক্ষেত্রে কর আদায় না করে জালিয়াতির মাধ্যমে তা মওকুফ দেখানো হয়। ভূমি রেকর্ড টাকা ছাড়া হয় না। এসব জালিয়াতি নিয়ে দুদকে প্রায়ই অভিযোগ আসে। দুদক সূত্রে জানা যায়, খাস, পরিত্যক্ত ও অর্পিত সম্পত্তি ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি জালিয়াতির ঘটনা ঘটছে। টাকার বিনিময়ে ভূমি কর্মকর্তারা সরকারি খাসজমি যে কারও নামে বন্দোবস্ত দিচ্ছে।
একই ব্যক্তিকে বারবার বন্দোবস্ত দিচ্ছে। একাধিকবার বন্দোবস্ত নিয়ে ওসব জমিতে বহুতল ভবনও তৈরি করছে বন্দোবস্ত নেওয়া ব্যক্তিরা। অনেক পরিত্যক্ত জমি বছরের পর বছর বেদখলে থাকলেও সেগুলো উদ্ধারে ভূমি অফিসের কোনো উদ্যোগ নেই। জালিয়াতি করে অর্পিত সম্পত্তির নথিপত্র গায়েব করার অভিযোগও রয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, নোয়াখালীর প্রায় ভূমি অফিসের তহশিলদাররা পারে না এমন কোনো অপকর্ম নেই। আর এসব করে অনেক তহশিলদার কোটি কোটি টাকার মালিকও হয়েছে। এমনই একজন বেগমগঞ্জের বোরহান উদ্দিন। অনেকেই করেছেন আলিশান বাড়ি-গাড়িসহ বিভিন্ন এলাকায় মৎস্য ঘেরও।
নোয়াখালী দুদক সূত্র জানায়, প্রতিদিনই দেশের কোথাও না কোথাও ভূমি অফিসে অভিযান চালাচ্ছে দুদক। বিশেষ করে ইউনিয়ন ও উপজেলা পর্যায়ের ভূমি অফিসগুলোতে ব্যাপক জালিয়াতি, ঘুষ আদায় ও নানা অনিয়মের বিষয়ে অভিযোগ জমা পড়ছে। অভিযোগ পেয়ে দুদক নিয়মিত অভিযান চালিয়ে অনিয়ম প্রতিহত করতে সুপারিশ করছে সংশ্লিষ্ট মহলে, কিন্তু এর পরও কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয় না। অনেকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হলেও কিছুদিন পর আবার ‘যেই সেই’।
এসব নিয়ে জেলা প্রশাসক তš§য় দাস বলেন, কোনো সরকারি কর্মকর্তা কিংবা কর্মচারীর বিরুদ্ধে ঘুষ গ্রহণের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে আমরা অবশ্যই ব্যবস্থা নেব।

সর্বশেষ..