নো ডিভিডেন্ড ঘোষণা করলেই বাড়ছে ক্ষোভ

মুস্তাফিজুর রহমান নাহিদ: প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে নো ডিভিডেন্ড ঘোষণা এলেও ক্ষোভে ফেটে পড়ছেন বিনিয়োগকারীরা। সবচেয়ে বেশি ক্ষোভ ঝাড়ছেন ওইসব কোম্পানির প্রতি, যারা অনেক ঢাকঢোল পিটিয়ে পুঁজিবাজারে এসে শেয়ারহোল্ডারদের নিরাশ করছে। নিজেদের সুবিধা লুটে নিয়ে হতাশ করছে বিনিয়োগকারীদের। আর এই ক্ষোভ প্রকাশের জন্য তারা বেছে নিচ্ছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম। এখানে তারা কোম্পানি ও তার কর্তৃপক্ষের নামে নানা ধরনের নেতিবাচক মন্তব্য করছে, যা সহজেই ভাইরাল হয়ে যাচ্ছে। এতে তোপের মুখে পড়ছে কর্তৃপক্ষ। তারা পড়ছে বিব্রতকর অবস্থায়।
সম্প্রতি ২০১৬ সালে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানি ইভিন্স টেক্সটাইল শেয়ারহোল্ডারদের জন্য নো ডিভিডেন্ড ঘোষণা করেছে। প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, তারা এ বছর শেয়ারহোল্ডারদের নগদ কিংবা বোনাস কোনো ধরনের লভ্যাংশ দিচ্ছে না। বিষয়টি প্রতারণার শামিল উল্লেখ করে ক্ষোভে ফুঁসছেন বিনিয়োগকারীরা। তারা অভিযোগ করছেন, কোম্পানি কর্তৃপক্ষ ইচ্ছাকৃতভাবে এমন করেছে। এ ধরনের কোম্পানি আসলে বিনিয়োগকারীদের স্বার্থে পুঁজিবাজারে আসে না। এদের উদ্দেশ্য থাকে ফায়দা হাসিল করা। এ ক্ষেত্রে তারা পুঁজিবাজারকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে। এ ধরনের কোম্পানির শাস্তি হওয়া দরকার বলে জানান তারা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এমন দাবি জানান তারা।
নো ডিভিডেন্ট ঘোষণা করায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বর্তমানে সবচেয়ে সমালোচনার শিকার হচ্ছেন ইভিন্স টেক্সটাইলের চেয়ারম্যান আনোয়ার-উল-আলম চৌধুরী পারভেজ। ফেসবুকে তাকে নিয়ে ছড়ানো হচ্ছে নানা নেতিবাচক মন্তব্য। ফেসবুকে তার ছবি পোস্ট করে মিজানুর রহমান নামে এক বিনিয়োগকারী লিখেছেন ‘কোট পরা লোকটিকে ভদ্র ও সাহেব ভাবলে ভুল করবেন। উনি একজন ছিনতাইকারী’। তাকে নিয়ে আরও যেসব মন্তব্য রয়েছে, তা পাঠযোগ্য নয়।
জানতে চাইলে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন বিনিয়োগকারী বলেন, ২০১০ সাল থেকে লোকসান দিতে দিতে আমাদের দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেছে। এরপর কোম্পানিগুলোর প্রতারণা আমাদের কাছে কাটা ঘায়ে নুনের ছিটা দেওয়ার শামিল। এসব কোম্পানির মালিক আসলে পুঁজিবাজারে আসেন প্রতারণার উদ্দেশ্যে। ব্যাংক থেকে টাকা আনলে তাদের সুদ দেওয়া লাগে। কিন্তু পুঁজিবাজারে এলে সেটা করতে হয় না। পক্ষান্তরে পায় কর সুবিধা। সে কারণে এরা সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আঁতাত করে বাজারে আসে। পরে বিনিয়োগকারীদের টাকা লুট করে চলে যায়। এটা বন্ধ হওয়া দরকার।
যোগাযোগ করা হলে আনোয়ার-উল-আলম চৌধুরী শেয়ার বিজকে বলেন, কোনো প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে নো ডিভিডেন্ট ঘোষণা এলে ওই কোম্পানির শেয়ারহোল্ডারদের মধ্যে ক্ষোভ থাকবে এটা স্বাভাবিক। তবে ভভিষ্যতে আমরা শেয়ারহোল্ডারদের জন্য ভালো কিছু করার চেষ্টা করব।
সম্প্রতি পুঁজিবাজারে লেনদেন শুরু হওয়া কোম্পানি এমএল ডায়িং নিয়েও রয়েছে বিনিয়োগকারীদের ক্ষোভ। প্রতিষ্ঠানটির শেয়ারের কাক্সিক্ষত দর না পেয়ে সামাজিক যোগযোগমাধ্যমে ক্ষোভ প্রকাশ করছেন বিনিয়োগকারীরা। একইভাবে গতকাল নোট ডিভিডেন্ট ঘোষণা করা নর্দার্ন জুট নিয়েও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন বিনিয়োগকারীরা।
এ প্রসঙ্গে লুৎফর রহমান নামে এক বিনিয়োগকারী বলেন, এ প্রতিষ্ঠানটি আমাদের সঙ্গে এভাবে প্রতারণা করবে ভাবিনি। কোম্পানি এটি ইচ্ছাকৃতভাবে করেছে। এ সুযোগে তারা শেয়ারের দর কমিয়ে নিজেরা কিনে নিতে চায়। আগামীতে নিজেদের ফায়দা হাসিলের জন্য হয়তো তারা ভালো ডিভিডেন্ট ঘোষণা করবে।
এদিকে বিষয়টি নিয়ে আলাপে বাজার-সংশ্লিষ্টরা জানান, দুর্বল কোম্পানির তালিকাভুক্তির কারণেই এমন অবস্থা হয়েছে। তাদের অভিমত, কোনো কোম্পানি পুঁজিবাজারে আসার আগে তার আর্থিক অবস্থা সম্পর্কে ভালো করে জেনে তারপরই তালিকাভুক্তির অনুমোদন দেওয়া উচিত।
এ প্রসঙ্গে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অর্থ উপদেষ্টা এবি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম শেয়ার বিজকে বলেন, কোম্পানিগুলো যখন বাজারে আসতে চায়, তখন ইস্যু ম্যানেজার থেকে শুরু করে অডিটরসহ সংশ্লিষ্ট সবাই কোম্পানির আর্থিক অবস্থার একটি সুন্দর বিবরণ উপস্থাপন করেন। বিএসইসির উচিত, এটা ভালো করে যাচাই-বাছাই করে নেওয়া। এছাড়া কোম্পানিগুলো শেয়ারহোল্ডারদের সঙ্গে লাভ- লোকসানের বিষয়ে কোনো লুকোচুরি করছে কিনা, তাও দেখা দরকার।
অর্থনীতিবিদ ও পুঁজিবাজার বিশ্লেষক আবু আহমেদ বলেন, কোম্পানিগুলোর আর্থিক অবস্থা খারাপ হওয়ার জন্য দায়ী মূলত প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যারা জড়িত রয়েছেন, তারা। তারা বাজারে আসার কিছুদিন পরই শেয়ার বিক্রি করে দেন। যে কারণে প্রতিষ্ঠানের আর্থিক অবস্থা দুর্বল হতে থাকে। বিএসইসির উচিত, কোম্পানি তালিকাভুক্ত হওয়ার পর কমপক্ষে চার বছর পর্যন্ত কোনো পরিচালক শেয়ার বিক্রি করতে পারবেন নাÑএমন নিয়ম করে দেওয়া।