ন্যায্যমূল্য প্রাপ্তিতে কৃষিপণ্য সংরক্ষণ রফতানি ও প্রক্রিয়াকরণ

নিতাই চন্দ্র রায়: কয়েক বছর ধরে দানা শস্যের তুলনায় বেশি মূল্য পাওয়ায় রাজশাহী, নওগাঁ, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, রংপুর, দিনাজপুর, মেহেরপুর, সাতক্ষীরা, কুষ্টিয়া, টাঙ্গাইল ও পার্বত্য এলাকায় আম চাষের জমি ও ফলন উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বৃদ্ধি পেয়েছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্যমতে, ২০১৪-১৫ অর্থবছরে বাংলাদেশে ১০ লাখ মেট্রিক টন আম উৎপাদন হয়। পরের বছর অর্থাৎ ২০১৫-১৬ অর্থবছরে ফলটির উৎপাদন বেড়ে দাঁড়ায় ১১ লাখ ৬১ হাজার ৬৮৫ টন। আর ২০১৬-১৭ অর্থবছরে দেশে আম উৎপাদন হয় ১২ লাখ টন। গত বছর বাংলাদেশ থেকে তিন লাখ ২৪ হাজার কেজি আম ইউরোপের বিভিন্ন দেশে রফতানি হওয়ায় আমচাষিদের মধ্যে ব্যাগিং পদ্ধতিতে বালাইনাশক মুক্ত নিরাপদ রফতানিযোগ্য আম চাষে আগ্রহ সৃষ্টি হয়।
অনুকূল আবহাওয়া, উচ্চফলনশীল জাতের চাষ বৃদ্ধি, চাষি প্রশিক্ষণ, সময়মতো পরিচর্যা গ্রহণের কারণে এ বছর আমের বাম্পার ফলন হয়েছে। আম উৎপাদনের অতীতের সব রেকর্ড ভঙ্গ করে এবার দেশে প্রায় এক লাখ হেক্টর জমি থেকে ১৩ লাখ টন আম উৎপাদন হবে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন। আমের বাম্পার ফলনেও চাষিদের মুখে হাসি নেই। এ বছর গত বছরের চেয়ে অর্ধেক দামে আম বিক্রি করে তারা উৎপাদন খরচও তুলতে পারছেন না। মেহেরপুরে গত বছর প্রতিমণ আম দুই হাজার টাকা মণ দরে বিক্রি হলেও এ বছর এক হাজার ২০০ টাকা মণ দরেও বিক্রি করা যাচ্ছে না। রাজশাহী, নাটোর, নওগাঁ, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও দিনাজপুরের অবস্থাও প্রায় একই রকম। গত বছর এসব জেলায় প্রতি কেজি আম্রপালি আম বিক্রি হয়েছিল ৪০ থেকে ৫০ টাকা কেজি দরে। কিন্তু এ বছর সেই আম ২০ থেকে ২৫ টাকা কেজি দামেও বিক্রি করা যাচ্ছে না। টাঙ্গাইলের সখিপুর উপজেলার একজন আমচাষি জানান, এক কেজি আম্রপালি আম উৎপাদনে খরচ হয় ৪৫ টাকা, অথচ এ বছর সেই আম বিক্রি করতে হচ্ছে মাত্র ২৫ টাকা কেজি দরে।
আর অল্প কিছুদিনের মধ্যেই ফলের রাজা আমের মৌসুম শেষ হয়ে যাবে। কৃষকরা যদি উৎপাদিত আম অন্তত এক মাস সংরক্ষণ করার সুযোগ পেতেন অথবা দেশের আম উৎপাদনকারী অঞ্চলে যদি প্রয়োজনীয় সংখ্যক প্রক্রিয়াকরণ শিল্প থাকত বা রফতানির পরিমাণ বাড়ানো যেত, তাহলে তাদের লোকসানের সম্মুখীন হতে হতো না। তারা পেতেন উৎপাদিত আমের যৌক্তিক মূল্য। ভোক্তারা পেতেন সুস্বাদু আম উপভোগের আরও এক মাস বেশি সময়। আম ছাড়াও পার্বত্য অঞ্চলে উৎপাদিত কলা, পেঁপে, আনারস, কাঁঠাল, লেবু, তরমুজ নিয়ে কৃষক একই রকম সমস্যায় পড়েন। মধুপুর ও ভাওয়ালের গড় এলাকায় উৎপাদিত আনারস ও কাঁঠালের ন্যায্যমূল্য পাচ্ছেন না কৃষক। বর্তমানে এসব এলাকায় একটি মাঝারি সাইজের কাঁঠাল বিক্রি হচ্ছে ৩০ থেকে ৩৫ টাকা দামে। আনারস বিক্রি হচ্ছে ২০ থেকে ৩০ টাকায়। আমাদের দেশে শীতের শেষে ফাল্গুন-চৈত্র মাসে বাজারে সরবরাহ বৃদ্ধির কারণে শাকসবজির দাম একবারে কমে যায়। ওই সময় মুলা, বাঁধাকপি ও গোল আলুর মতো সবজি পশুখাদ্য হিসেবে ব্যবহার করা হয়। পাকা টমেটো চাষ করে মাটির সঙ্গে মিশিয়ে ফেলা হয় ক্রেতার অভাবে। আবার বর্ষা ও শরৎকালে অতিবৃষ্টি ও বন্যার কারণে মাঠের সবজি বিনষ্ট হলে বাজারে শাকসবজির দাম হুহু করে বেড়ে যায়। তখন স্বাভাবিক দামের চেয়ে দ্বিগুণ-তিনগুণ দামে বিক্রি হয় শাকসবজি। এতে ভোক্তা সাধারণ ও কৃষক উভয় ক্ষতির শিকার হন।
উৎপাদিত পণ্য আহরণে পর্যাপ্ত বৈজ্ঞানিক প্রযুক্তি ও যন্ত্রপাতি ব্যবহার, হিমাগারের অপ্রতুলতা ও যোগাযোগ ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতার কারণে প্রতিবছর বাংলাদেশে কৃষিপণ্যের ১২ শতাংশ এবং শাকসবজির ২০ শতাংশ নষ্ট হচ্ছে। এতে কৃষকের পাশাপাশি ব্যাহত হচ্ছে ১৭ কোটি মানুষের খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তা। পরিস্থিতি উত্তরণে কৃষিপণ্য সংরক্ষণ ব্যবস্থা জোরদারের পাশাপাশি রফতানি বাড়াতে হবে। ইউএসএইডের এগ্রিকালচার ভ্যালু চেইন (এসিসি) প্রকল্পের সহযোগিতায় ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই) আয়োজিত গুড এগ্রিকালচারাল প্র্যাকটিস (গ্যাপ) শীর্ষক সেমিনারে বক্তরা এসব কথা বলেন। আমাদের খোরাকি কৃষি ক্রমশ অর্থনৈতিক কৃষির দিকে অগ্রসর হচ্ছে। ২০৩০ সালের মধ্যে কৃষি উৎপাদন দ্বিগুণ করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। কৃষিপণ্য রফতানি বৃদ্ধির লক্ষ্যে এর বহুমুখীকরণের প্রতি উদ্যোগক্তাদের গুরুত্ব দিতে হবে। বাাংলাদেশে কৃষি খাতে গ্যাপের বাস্তবায়ন এখন সময়ের দাবি। শিগগিরই কৃষিনীতি ২০১৮ ঘোষণা করা হবে, যেখানে গ্যাপ অন্তর্ভুক্ত থাকবে। বাংলাদেশে কৃষি খাত উন্নয়নে গ্যাপের ব্যবহার বৃদ্ধিতে অপর্যাপ্ত ধারণা ও প্রশিক্ষণের অভাব এবং সনদ প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানের স্বল্পতা রয়েছে। এসব সমস্যা সমাধানে সবাইকে একযোগে কাজ করতে হবে। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে মোট রফতানির মাত্র এক দশমিক ৫৯ শতাংশ কৃষিপণ্য রফতানির মাধ্যমে অর্জিত হয়েছে। কৃষিপণ্যের রফতানিতে আমাদের আরও বেশি গুরুত্ব দিতে হবে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের দেশগুলোতে কৃষিপণ্য রফতানি বাড়াতে গ্যাপ বাস্তবায়নে অধিক মনোযোগ দিতে হবে। উৎপাদন বৃদ্ধি, শাকসবজি সংরক্ষণ ও ফলমূল পাকানোর ক্ষেত্রে নানা ধরনের কেমিক্যাল ব্যবহার কৃষিপণ্য রফতানিতে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেছে। তাই কৃষিপণ্য উৎপাদন, প্রক্রিয়াকরণ, সংরক্ষণ, পরিবহন ও বাজারব্যবস্থাপনায় গুরুত্বারোপসহ কৃষি খাতের উদ্যোক্তাদের গ্যাপের ব্যবহার বাড়াতে হবে।
বর্তমানে বাংলাদেশে আড়াইশ’ উন্নতমানের মাঝারি খাদ্য উৎপাদনকারী শিল্প প্রতিষ্ঠান রয়েছে। কিন্তু এসব প্রতিষ্ঠানে দক্ষ জনবল এবং উন্নত প্রযুক্তির অভাব রয়েছে। এ কারণে প্রতিবছর প্রায় ছয় বিলিয়ন মার্কিন ডলার বিদেশে চলে যাচ্ছে। এ প্রবণতা ঠেকাতে কার্যকর ইউনিভার্সিটি-ইন্ডাস্ট্রি লিংকেজ স্থাপন করতে বলেছেন শিল্পমন্ত্রী আমির হোসেন আমু। সম্প্রতি ডেফোডিল বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘এনএফই ক্যারিয়ার এক্সপো-২০১৮’ উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তিনি এ আহ্বান জানান। বিশ্ববিদ্যালয়ের ফুড অ্যান্ড নিউট্রিশন ইঞ্জিনিয়ারিং (এনএফই) বিভাগ ওই একই দিনে ‘মাল্টি কমোডিটি সোলার ট্যানেল ড্রায়ার প্লান্ট’ প্রযুক্তির প্রদর্শনী ও উদ্বোধনের ব্যবস্থা করে। সিরডাপের সঙ্গে যৌথ গবেষণায় এ প্রযুক্তিটি উদ্ভাবন করেন ড্যাফোডিল বিশ্ববিদ্যালয়ের পুষ্টি ও খাদ্য প্রকৌশল বিভাগের গবেষকরা। এর ফলে বিভিন্ন মৌসুমি ফলসহ কৃষিজাত পণ্য সহজেই দীর্ঘদিন সংরক্ষণ করা যাবে। এর মাধ্যমে কৃষক, ক্রেতা-ভোক্তা, কৃষিশিল্প উদ্যোক্তা, নীতিনির্ধারকসহ সবাই উপকৃত হবেন। এটি দেশীয় খাদ্যশিল্পের আধুনিকায়ন, গুণগত পরিবর্তন ও উৎপাদিত পণ্যের মূল্য সংযোজনের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে। মাত্র সাত থেকে সাড়ে সাত লাখ টাকার দীর্ঘ মেয়াদে পচনশীল এসব পণ্য সংরক্ষণের এ প্রযুক্তি স্থাপন করা গেলে ন্যায্যমূল্যে পণ্য বিক্রির সুবিধা পাবেন কৃষক ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা। এ প্রযুক্তির একটি প্লান্টে ১৫০ কেজি সবজি সংরক্ষণ করা যাবে। মাশরুমের মতো হালকা পণ্য ৩০০ কেজি পর্যন্ত সংরক্ষণ সম্ভব হবে। ড্যাফোডিল বিশ্ববিদ্যালয় গত ফেব্রুয়ারি থেকে এপ্রিলের মধ্যে এই প্রযুক্তি দেশের উপযোগী করে স্থাপন করে সংরক্ষণ শুরু করে। সেখানে ফুলকপি, বাঁধাকপি, টমেটোসহ বিভিন্ন সবজি সংরক্ষণ করা হয়েছে। মাল্টি কমোডিটি সোলার টানেল ড্রায়ার প্লান্ট প্রযুক্তিতে চার থেকে ছয় মাস পর্যন্ত পচনশীল এসব পণ্য সংরক্ষণ করা যাবে। সংরক্ষণ করা এসব শাকসবজি, ফলমূল ও প্রাণিজ খাদ্যের কাঁচামাল সারা বছর স্থানীয় বাজারে বিক্রির পাশাপাশি রফতানি করা যাবে। সিরডাপ ও ডিআইইউ যৌথ এ প্রকল্পে উদ্যোক্তাদের প্রযুক্তি স্থাপনে এসএমই ঋণ দিয়ে সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছে দেশের তিনটি ব্যাংক। ব্যাংকগুলো হলো বেসিক ব্যাংক, আইএফআইসি ও ট্রাস্ট ব্যাংক। ব্যাংকগুলো সহজ শর্তে কম সুদে প্রযুক্তি স্থাপনে উদ্যোক্তাদের ঋণ সহায়তা দেবে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে রবি ও খরিপ মৌসুম মিলে সবজি উৎপাদন হচ্ছেÑএক কোটি ৬২ লাখ ৪২ হাজার ৩০০ টন এবং প্রতিবছর আট থেকে ১০ শতাংশ হারে বাড়ছে সবজি উৎপাদন। প্রায় ৫০টি দেশে প্রতিবছর গড়ে ১০ লাখ ডলারের সবজি রফতানি হচ্ছে। উপযুক্ত সংরক্ষণ প্রযুক্তির অভাবে উৎপাদন অনুযায়ী বাড়ছে না সবজি রফতানির পরিমাণ। এ প্রযুক্তিটি যথাযথভাবে কাজে লাগানো গেলে সবজি রফতানি কয়েকগুণ বাড়ানো সম্ভব হবে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্ট মহল।
রং, স্বাদ ও গন্ধে ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়া উপজেলার হলুদ উৎকৃষ্ট। ক’দিন আগে এক খুচরা ব্যবসায়ীর কাছ থেকে ১২০ টাকা কেজি দামে আমি দুই কেজি শুকনো হলুদ কিনি। আমি যে হলুদ খুচরা বিক্রেতার কাছ থেকে ১২০ টাকা কেজিতে কিনি, তা উৎপাদনকারী কৃষক প্রতি কেজি ১০০ টাকার বেশি দামে বিক্রি করতে পারেনি। প্রতি কেজি হলুদ মেশিনে গুঁড়া করতে খরচ হয় ৩০ টাকা। গুঁড়া করতে যদি ওজন ১০ শতাংশও ঘাটতি হয়, তবে প্রতি কেজি শুকনা হলুদ থেকে ৯০০ গ্রাম গুঁড়া হলুদ পাওয়া যাবে। বর্তমানে বাজারে রাঁধুনী ব্র্যান্ডের মোড়কজাত হলুদ বিক্রি হচ্ছে ১০০ গ্রামের প্রতি প্যাকেট ৪৫ টাকা দামে। সে হিসাবে ৯০০ গ্রাম প্যাকেটজাত গুঁড়া হলুদের দাম ৪০৫ টাকা। খুচরা বিক্রিতে ৪০৫ টাকার হলুদের মধ্য থেকে উৎপাদনকারী কৃষক পেলেন মাত্র ১০০ টাকা। বাকি ৩০৫ টাকা গেল প্রক্রিয়াকরণ শিল্পমালিক, পাইকারি ও খুচরা ব্যবসায়ীদের পকেটে। অন্যান্য কৃষি প্রক্রিয়াজাত পণ্যের ক্ষেত্রেও একই অবস্থা। আমাদের কথা উৎপাদনকারী কৃষককে কমপক্ষে প্রক্রিয়াকরণকৃত কৃষিপণ্যের খুচরা মূল্যের অর্ধেক দাম দিতে হবে। এছাড়া কৃষক বাঁচবে না। পণ্যের গুণগত মান বৃদ্ধির জন্য তার কাছ থেকে কোনো সহযোগিতা পাওয়া যাবে না। আমরা যতই বলি গ্যাপের কথা, রাসায়নিক বালাইনাশক মুক্ত নিরাপদ খাদ্যের কথা, জৈব কৃষির কথা, তা কৃষকের কাছে গুরুত্ব পাবে না।

সাবেক মহাব্যস্থাপক (কৃষি)
নর্থবেঙ্গল সুগার মিলস্ লি.
গোপালপুর, নাটোর
[email protected]