ন্যূনতম মজুরি হোক শিল্প ও শ্রমিকবান্ধব

তৈরি পোশাক শিল্প দেশের অন্যতম ব্যবসাসফল খাত। পণ্য রফতানির সাড়ে ৮৩ শতাংশ আসে এ থেকে। তা সত্ত্বেও অধিকাংশ খাতের মতো ন্যুনতম মজুরি নিয়ে এ শিল্পে অসন্তোষ দীর্ঘদিনের। সম্প্রতি তৈরি পোশাকশিল্পে ন্যূনতম মজুরি ১০ হাজার ২৮ টাকা করার প্রস্তাব দিয়েছে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)। গত রোববার রাজধানীতে আয়োজিত ‘মিনিমাম ওয়েজ অ্যান্ড লাইভলিহুড কন্ডিশনস অব আরএমজি ওয়ার্কার্স’ শীর্ষক সংলাপে এ প্রস্তাব তুলে ধরা হয়। আসলে এ খাতের ন্যূনতম মজুরি ইস্যুতে বিভিন্ন পক্ষ থেকে বিভিন্ন সুপারিশ এসেছে। গণমাধ্যমেও ব্যাপারটি গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরা হয়েছে। এখন এসবের সমন্বয়ে সরকারকে একটি বাস্তবসম্মত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে হবে।
আড়াই লাখ কোটি টাকা রফতানি আয়ের এই খাতের শ্রমিকের সর্বনি¤œ মজুরি অনেক খাতের তুলনায় কম। লোকসানে থাকা সরকারি কারখানার শ্রমিকদের বেতনও প্রায় দ্বিগুণ করা হয়েছে। সেখানে লাভজনক অ্যাপারেল খাতে এত কম মজুরি মানানসই নয়। এ অবস্থায় এ খাতের শ্রমিকরা বঞ্চিত বোধ করবেন, এটাই স্বাভাবিক। বর্তমানে বিশ্বে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ পোশাক রফতানিকারক দেশ বাংলাদেশ। কম মজুরি দেওয়ার ক্ষেত্রেও বাংলাদেশ (শ্রীলঙ্কার পরে) দ্বিতীয়। এ অবস্থায় শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধিতে মালিকপক্ষের অনাগ্রহের কারণ খতিয়ে দেখার অবকাশ রয়েছে। মজুরি কম হওয়ার কারণ হিসেবে তাদের পক্ষ থেকে নিজ সক্ষমতার অভাবকে বারবার দেখানো হচ্ছে। এতে কিছু সত্যতা হয়তো আছে। দেশে উৎপাদিত তৈরি পোশাকের বিক্রয়মূল্যের একটি বড় অংশ বিদেশি বায়াররা নিয়ে যাচ্ছেন। এক্ষেত্রে গার্মেন্ট মালিকদের অংশ বাড়ানো গেলে মজুরি বৃদ্ধিতে তাদের সক্ষমতা বাড়তে পারে অবশ্য। এটাও খুব জোর দিয়ে বলা যায় না। কারণ মজুরি বৃদ্ধিতে মালিকদের ইতিবাচক মানসিকতা একটি বড় প্রভাবক। আবার কম মজুরি প্রস্তাবের পক্ষে প্রতিযোগী দেশগুলোর চেয়ে আমাদের পোশাক শ্রমিকদের নি¤œ উৎপাদনশীলতাকে কারণ হিসেবে দেখানো হয়েছে। এটি ঠিক, বিভিন্ন কারণে অন্যান্য খাতের মতো পোশাক শিল্পেও অটোমেশন বাড়ছে। কিন্তু আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারে শ্রমিকদের দক্ষতার অভাবে প্রত্যাশিত উৎপাদনশীলতা পাওয়া যাচ্ছে না। কিন্তু এটা কোনো অজুহাত হতে পারে না। নিজেদের স্বার্থেই মালিকপক্ষকে এখন শ্রমিকদের এ ঘাটতি পূরণে পদক্ষেপ নিতে হবে। শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষ কর্মীবাহিনী গড়ে তোলায় বিনিয়োগ বাড়াতে হবে সরকারকেও।
মালিকপক্ষকে এটাও অনুধাবন করতে হবে, কেবল মজুরি বৃদ্ধি শ্রমিকদের জীবনমান উন্নয়নে একমাত্র করণীয় নয়। এতে অনেকভাবেই অবদান রাখা সম্ভব। সিপিডির ওই সংলাপে বিশেষজ্ঞরা মূলত এ ব্যাপারটি তুলে ধরেছেন। তাদের জরিপে মজুরি কম হওয়ার কারণে শ্রমিকদের ভোগান্তির চিত্র উঠে এসেছে। মজুরি বৃদ্ধির পাশাপাশি তাদের জীবনমান বাড়াতেও এ খাতের মালিকদের মনোযোগী হতে হবে। এজন্য তাদের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন দরকার বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। শ্রমঘন এ খাত বিরাট সংখ্যক মানুষের কর্মসংস্থান করছে। রফতানি আয়ের পরে এটিই এ খাতের সবচেয়ে বড় দিক। তাই এতে শ্রমিকবান্ধব নীতি অনুসরণ করা হলে তা অনেকের কল্যাণে ভূমিকা রাখবে। মালিকরা অবশ্যই তাদের ব্যবসায়িক স্বার্থ দেখবেন। কিন্তু শ্রমিকদের জীবন ব্যবস্থাপনায় সহায়তাও তাদের অন্যতম দায়িত্ব। শ্রমিকদের শিক্ষা, প্রশিক্ষণ, কর্মপরিবেশ, আবাসন, স্বাস্থ্য ও পুষ্টি উন্নয়ন করতে মালিকপক্ষ বিভিন্ন পদক্ষেপ নিতে পারে। এতে একদিকে শ্রমিকদের জীবনযাত্রার ব্যয় কমে, অন্যদিকে তাদের জীবনমান বাড়ে। প্রতিষ্ঠানের প্রতি তাদের নিবেদিত মনোভাবও তৈরি হয় এতে। এর প্রভাব পড়ে উৎপাদনশীলতায়। আজকাল কোনো কোনো শিল্পমালিক এ ধরনের ব্যবস্থা নিচ্ছেন। এর সুফলও তারা পাচ্ছেন নিশ্চয়ই। দক্ষ কর্মীদের ধরে রাখতে প্রণোদনার ব্যবস্থাও থাকা উচিত। সর্বোপরি, শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের স্বার্থ সমুন্নত রেখে একটি বাস্তবসম্মত ও শ্রমিকবান্ধব সিদ্ধান্তের বাস্তবায়ন হোকÑএটাই প্রত্যাশা।