ফিল্টার মানেই বিশুদ্ধ নয়

নিয়ন্ত্রণহীন খাবার পানির ব্যবসা

জাকারিয়া পলাশ : রাজধানীসহ দেশের বড় শহরগুলোতে প্লাস্টিকের জারে বিক্রি হচ্ছে বিশুদ্ধ পানি। ফিল্টার পানি হিসেবে পরিচিত এই পানি অধিকাংশ ক্ষেত্রে বিশুদ্ধ নয়। বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন (বিএসটিআই) এসব পানির জারে নানা রকম ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়ার অস্তিত্ব পেয়েছে। তবুও অনুমোদনহীনভাবে চলছে অসংখ্য প্রতিষ্ঠান। কোনো রকম মান নিয়ন্ত্রণ না করেই জারে ভরে এসব পানি দোকানে দোকানে সরবরাহ করা হচ্ছে।
এদিকে ভ্রাম্যমাণ আদালতে জেল-জরিমানা করেও কোনো লাভ হচ্ছে না। বিভিন্ন দোকানের এসব ফিল্টার থেকে পানি পান করা থেকে বিরত থাকার আহŸান জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
জানা গেছে, গত দুই মাসে বিএসটিআই ও র‌্যাবের যৌথ উদ্যোগে এসব পানির কারখানা ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ১৯ বার মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হয়। এতে ৭৪টি প্রতিষ্ঠানে অভিযান চালানো হয়। এদের মধ্যে দূষিত ও অপরিশোধিত পানিকে জারে করে ফিল্টার হিসেবে বিক্রির দায়ে ২৬টি কারখানাকে সিলগালা করেছে বিএসটিআই। এছাড়া ৫৭ কর্মীকে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। প্রায় ২৭ হাজার পানির জার ধ্বংস করার পাশাপাশি ৩০ লক্ষাধিক টাকার জরিমানা আদায় করা হয়।
সরেজমিনে দেখা গেছে, রাজধানীর ফার্মগেটের মুরগিপট্টি এলাকায় একই রুমের মধ্যে তিনটি কারখানা ধুরয়েছে। কোনো ধরনের ল্যাবরেটরি ও যন্ত্রপাতি ছাড়াই সরাসরি পাইপের মাধ্যমে পানি জারে ভর্তি করা হচ্ছে সেখানে। সম্প্রতি সেখান থেকে ৯ জনকে ধরে তিন মাসের জেল দেন ভ্রাম্যমাণ আদালত। কিন্তু গত সপ্তাহে সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, সেখানে ফের চলছে জার ভর্তি করে পানির ব্যবসা। একইভাবে রাজধানীর মিরপুর, শাহজাদপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় চলছে এসব ব্যবসা।
শুধু খাবার পানির জারই নয়, নিত্যপ্রয়োজনীয় অন্যান্য খাদ্যপণ্যও মানহীনভাবে বিক্রি হচ্ছে বাজারে। এমনকি আকিজ, এস আলমসহ বিভিন্ন বড় গ্রæপের পণ্যও বিএসটিআই’র মান যাচাই পরীক্ষায় কৃতকার্য হতে পারছে না বলে সম্প্রতি শিল্প মন্ত্রণালয় থেকে তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে।
এ প্রসঙ্গে বিএসটিআই’র কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, পরীক্ষাগারে যখন পরীক্ষা করা হয় তখন কোনো পণ্যকে ভেজাল বলা হয় না। কিন্তু স্ট্যান্ডার্ড আর সাব-স্ট্যান্ডার্ড (কাক্সিক্ষত মানের নয়) বলা হয়। যেসব পণ্যে সব ধরনের উপাদান যথাযথ পরিমাণ থাকে সেগুলোকে স্ট্যান্ডার্ড পণ্য বলা হয়। আর অনেক পণ্যের মধ্যে প্রয়োজনীয় উপাদান যথাযথ পরিমাণে থাকছে না। কোনোটাতে পানির পরিমাণ বেশি থাকছে, কিংবা কোনো নির্দিষ্ট উপাদান কম থাকছে। সেগুলোকে সাব-স্ট্যান্ডার্ড বলা হয়। এখন সব ভেজাল পণ্যই সাব-স্ট্যান্ডার্ড, কিন্তু সব সাব-স্ট্যান্ডার্ড পণ্যকে ভেজাল বলা যায় না।
গবেষকরা জানান, বিভিন্ন কোম্পানির ড্রামজাত সয়াবিন তেল, পাম অয়েল, পাস্তুরিত দুধসহ প্রায় ১৫টি পণ্যকে অকৃতকার্য বলা হয়েছে, কারণ সেগুলো সাব-স্ট্যান্ডার্ড। তবে সেগুলো ভেজাল কি না তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। বিএসটিআই’র পরীক্ষায় ওইসব পণ্যে কোনো ক্ষতিকর জীবাণু পাওয়া যায়নি, তবে ভিটামিনের পরিমাণ কম পাওয়া গেছে। তবে বিশুদ্ধ পানি হিসেবে যেসব জার বিক্রি করা হচ্ছে, তাতে মারাত্মক ধরনের জীবাণু পাওয়া গেছে।
এ প্রসঙ্গে বিএসটিআই’র সহকারী পরিচালক (সিএম) মো. রেজাউল হক শেয়ার বিজকে বলেন, ‘অভিযান চালিয়েও নিয়ন্ত্রণে আনা যাচ্ছে না। আমরা কর্মীদের ধরে জেলে পাঠাচ্ছি। মালিককে খুঁজে পাচ্ছি না। পরের দিন আবার নতুন লোক নিয়োগ করে তারা একই ব্যবসা শুরু করছে।
এখন ভোক্তাপর্যায়ে সতেচনতা বৃদ্ধি প্রয়োজন। ভোক্তারা দোকান থেকে এসব পানি পান কমিয়ে দিলেই এগুলোর সরবরাহ কমবে। জরিমানা করেও কোনো লাভ হচ্ছে না।’ অবশ্য বোতলজাত মিনারেল ওয়াটারের ক্ষেত্রে নি¤œমানের পণ্য খুব একটা পাওয়া যায়নি বলে তিনি দাবি করেন।
বিএসটিআই’র কর্মকর্তারা জানান, পানি ছেঁকে পরিষ্কার করেই তারা জারে ভরে দেয়। ফলে খালি চোখে এসব জার পরিচ্ছন্ন দেখায়। কিন্তু পানি পরিষ্কার হলেই বিশুদ্ধ হয় না। পানিকে মাইক্রো নেট ফিল্টার, সফট নেট ফিল্টার, ইউভি, আরও প্রভৃতি ধাপে পরিশোধন করে জীবাণুমুক্ত করতে হয়, কিন্তু ওইসব প্রতিষ্ঠান তা করছে না।
কর্মকর্তারা জানান, অনেকে যথাযথ প্রক্রিয়ায় ল্যাবরেটরির সনদপত্র দেখিয়ে লাইসেন্স নেয়। কিন্তু পরে অনুসন্ধানে দেখা গেছে লাইসেন্সধারীরাও যথেচ্ছাচার করছে। এমন একটি লাইসেন্সধারীকেও তিন মাসের জেল দেওয়া হয়েছে সম্প্রতি। এখন এসব পানি যেসব দোকানে বিক্রি করা হচ্ছে, সেসব দোকানির বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া শুরু করা হবে বলে বিএসটিআই’র কর্মকর্তারা জানান।
এ বিষয়ে ভোক্তাদের সচেতন হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন ভোক্তা সংগঠন কনজুমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি গোলাম রহমান। তিনি বলেন, ‘ভোক্তাদের সচেতন হওয়ার কোনো বিকল্প নেই। ভোক্তাদের প্রেসার গ্রæপ হিসেবে তাদারকি প্রতিষ্ঠানগুলোকে অবহিত করতে হবে। তবে রমজানে ভোক্তাদের স্বার্থের কথা বিবেচনা করে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও তদারকি সংস্থাগুলোরও তৎপর হওয়া প্রয়োজন।’