পঞ্চগড়ে শতকোটি টাকার হাইব্রিড টমেটো বিক্রির সম্ভাবনা

সামসউদ্দীন চৌধুরী কালাম, পঞ্চগড়: মৌসুমের শেষ দিকে এসে পঞ্চগড়ের হাইব্রিড জাতের নাবী টমেটোর চাহিদা বেড়ে গেছে। সেইসঙ্গে বেড়েছে দামও। এতে শিলাবৃষ্টিতে ক্ষতি কাটিয়ে উঠে লাভের মুখ দেখছেন পঞ্চগড়ের টমেটো চাষিরা। এ মৌসুমে প্রায় একশ কোটি টাকার টমেটো বিক্রির আশা করছেন চাষিরা।
এক মাস ধরে বাজারের চাহিদা মেটাচ্ছে পঞ্চগড়ের সবুজ সোনাখ্যাত হাইব্রিড টমেটো। বিশেষ করে রমজান মাসে টমেটোর চাহিদা থাকে বেশি। এ সময়ে পঞ্চগড়ের টমেটো বাজার দখল করেছে। ব্যবসায়ীরা আগের চেয়ে দ্বিগুণ দামে তাদের কাছ থেকে কাঁচা টমেটো কিনছেন। পঞ্চগড় সদর উপজেলার হাড়িভাসা, চাকলাহাট, কামাতকাজলদিঘি ও হাফিজাবাদ ইউনিয়নের পাঁচ শতাধিক টমেটোর আড়তে এখন শ্রমিকদের দম ফেলার সুযোগ নেই। আড়তে রাখা টমেটোর মধ্যে পাকা ও ভালো টমেটো বাছাই করে তা ঝুড়িতে ভরার দায়িত্ব পালন করছেন শ্রমিকরা। ট্রাকে ভর্তি করে এসব ঝুড়িভর্তি টমেটো চলে যাচ্ছে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে।
কৃষকরা জানিয়েছেন, পঞ্চগড়ে দেশের অন্যান্য জেলার চেয়ে শীত বেশিদিন স্থায়ী হওয়ায় কয়েক বছর ধরে এখানে নাবী হাইব্রিড জাতের টমেটো আবাদ হচ্ছে। এ সময়ে দেশের অন্য কোথাও টমেটো আবাদ না হওয়ায় পঞ্চগড়ের টমেটো প্রায় চার মাস দেশের বিভিন্ন স্থানের চাহিদা পূরণ করে আসছে। কম সময়ের মধ্যে অধিক লাভ হওয়ায় কৃষকরা শীতের শেষে এ জাতের টমেটো চাষ করছে। প্রতি একর জমিতে এক লাখ টাকা খরচ করে তারা বিক্রি করে প্রায় তিন লাখ টাকার টমেটো। খরচ বাদে প্রতি একর জমি থেকে লাভ আসে দুই লাখ টাকার মতো। এ কারণে এ মৌসুমে অন্যান্য আবাদ বাদ দিয়ে তারা টমেটো আবাদ করেছে। এবারও পঞ্চগড় জেলায় প্রায় তিন হাজার হেক্টর জমিতে হাইব্রিড নাবী টমেটো আবাদ হয়েছে। শুরুতে ব্যবসায়ীরা প্রতি মণ টমেটো কিনেছে মানভেদে ৩৮০ টাকা থেকে ৪২০ টাকায়। আর মৌসুমের শেষে ব্যবসায়ীরা সেই টমেটো মণপ্রতি কিনছে ৮০০ টাকা থেকে এক হাজার টাকায়।
জেলা সদরের হাড়িভাসা রোড ও চাকলা রোডের পাশের বিভিন্ন আড়ত ঘুরে দেখা গেছে, আড়তদার, ব্যবসায়ী ও শ্রমিকরা ব্যস্ত যে যার কাজ নিয়ে। ফড়িয়া ব্যবসায়ীরা ভ্যান আর পিকআপে করে কৃষকের জমি থেকে টমেটো কিনে আড়তে আনছে। আর আড়তদাররা সেই টমেটো নগদ টাকায় কিনে শ্রমিকদের দিয়ে আড়তের খড়ের ওপর বিছিয়ে রাখছে। প্রতি আড়তে কাজ করছে ৩০-৫০ জন শ্রমিক।
হাড়িভাসা রোডের বলেয়াপাড়া গ্রামে ব্যবসায়ী বাবুল হোসেনের সঙ্গে কথা হয়। তিনি জানান, শিলাবৃষ্টির কারণে এবার টমেটোর জোগান অনেক কম। মৌসুমের শুরুতে আমরা ছোট ব্যবসায়ীরা বিভিন্ন গ্রাম ঘুরে কৃষকদের কাছ থেকে সাড়ে ৩০০ টাকা থেকে শুরু করে ৪২০ টাকা মণ দরে টমেটো কিনে আড়তে দিতাম। সেখানে প্রতি মণ টমেটোর দাম পেতাম সাড়ে ৪০০ থেকে ৪৮০ টাকা পর্যন্ত। আর এখন মৌসুম শেষের দিকে হওয়ায় আমরা কৃষকদের কাছ থেকে ৮০০ থেকে সাড়ে ৮০০ টাকা মণ দরে কাঁচা টমেটো কিনছি। আর আড়তে সেই টমেটো বিক্রি করছি ৯০০ থেকে এক হাজার টাকায় পর্যন্ত।
আড়ত মালিক সফিউদ্দিন মিয়া বলেন, এখানকার উৎপাদিত টমেটো কিনে চট্টগ্রাম, নিমসা বাজার, কক্সবাজার, সিলেটসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে নিয়ে বিক্রি করছি। পঞ্চগড়ে আমার পাঁচটি আড়ত আছে। শিলাবৃষ্টির কারণে এবার টমেটোর জোগান কম। এছাড়া কয়েক বছর ধরে পঞ্চগড়ের দেখাদেখি দেশের বিভিন্ন স্থানে টমেটো আবাদ হচ্ছে। এ কারণে মৌসুমের শুরুতে চাহিদা কম ছিল। তিনি বলেন, ট্রাকভাড়া অনেক বেড়ে যাওয়ায় ব্যবসা করে আরাম পাচ্ছি না। সেখানে পৌঁছাতে প্রতি কেজি টমেটোর দাম দ্বিগুণ পড়ে যায়। মৌসুমের শুরুতে চাহিদা কম থাকায় অনেক টাকা লোকসান গুনতে হয়েছে। এখন রমজান মাস হওয়ায় টমেটোর চাহিদা বেড়ে গেছে।
এ নিয়ে কথা বললে জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপপরিচালক মো. শামছুল হক বলেন, শিলাবৃষ্টিতে ক্ষতি হয়ে আগের চেয়ে উৎপাদন কমে গেলেও বাজারে দাম ভালো থাকায় কৃষকরা লাভবান হচ্ছে। কৃষকদের সঠিক পরামর্শ দেওয়ায় এবার টমেটো ক্ষেতে রোগ-বালাইর আক্রমণ অনেক কম। মৌসুমের শেষে এসে টমেটোর চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় দামও অনেকে বেড়ে গেছে। এর সুবিধা পাচ্ছে কৃষকরা।