পণ্য বহুমুখীকরণ ও নতুন বাণিজ্য গন্তব্য অনুসন্ধান যখন জরুরি

এমএ খালেক: প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা রাজধানীর আগারগাঁওয়ে মাসব্যাপী আন্তর্জাতিক বাণিজ্যমেলা উদ্বোধনকালে তার সরকারের অর্থনৈতিক সাফল্য তুলে ধরেন। তিনি বলেন, অর্থনৈতিক উন্নয়নের গতি ত্বরান্বিত করা ও ব্যাপকভিত্তিক কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য রফতানি পণ্যের বহুমুখীকরণের কোনো বিকল্প নেই। একই সঙ্গে তিনি নতুন নতুন রফতানি গন্তব্য খুঁজে বের করতে সংশ্লিষ্টদের পরামর্শ দেন। তার এ পরামর্শ বাস্তবধর্মী ও সময়োপযোগী, এতে সন্দেহ নেই। অনেক দিন ধরেই দেশের অর্থনীতিবিদ ও বাণিজ্য বিশেষজ্ঞরা এ ধরনের পরামর্শ দিয়ে আসছেন। কিন্তু অবস্থার তেমন উন্নতি হয়নি। আমরা এখনও সীমিতসংখ্যক দেশ ও অঞ্চলের ওপর নির্ভর করে বাণিজ্য বৃদ্ধির প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। ফলে আমাদের রফতানি সম্ভাবনা পুরোমাত্রায় কাজে লাগানো যাচ্ছে না। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, বিশেষ করে পণ্য ও সেবা রফতানির ক্ষেত্রে বাংলাদেশ সম্ভাবনাময় একটি দেশ। ভৌগোলিক অবস্থানগত সুবিধার কারণে রফতানিনির্ভর দেশ হওয়ার যেসব উপকরণ প্রয়োজন, তার প্রায় সবই বাংলাদেশের রয়েছে। কিন্তু সঠিক ও কার্যকর পরিকল্পনার অভাবে এ সম্ভাবনাকে এত দিন কাজে লাগানো যায়নি। স্বাধীনতার পর থেকে এ পর্যন্ত বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ভলিউম অনেকগুণ বেড়েছে। কিন্তু এখনও আমাদের রফতানিনির্ভরতা সামান্যসংখ্যক পণ্য এবং সীমিতসংখ্যক দেশ ও অঞ্চলের ওপর নির্ভরশীল। কোনোভাবেই আমরা এ অবস্থা থেকে উত্তরণ ঘটাতে পারছি না।

স্বাধীনতার আগে, এমনকি সত্তরের দশক পর্যন্ত বাংলাদেশের রফতানি বাণিজ্য মূলত পাটনির্ভর ছিল। ওই সময় রফতানি পণ্যতালিকা তৈরি করতে গেলে নিশ্চিতভাবেই পাট, চা ও চামড়ার নাম চলে আসত। অর্থাৎ তখন বাংলাদেশের রফতানি পণ্যতালিকা এ তিনটি পণ্যকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত হতো। এরপর এক সময় আমরা পাটের ঐতিহ্য হারিয়েছি। বাংলাদেশ এখন আর পাট রফতানির ক্ষেত্রে শীর্ষস্থানীয় দেশ নয়। ভারত, চীন, মিয়ানমার, এমনকি ব্রাজিলের মতো দেশ এখন বিশ্ব পাটবাজারে নেতৃত্ব দিচ্ছে। অথচ পৃথিবীর সবচেয়ে উন্নত মানের পাট উৎপাদিত হয় বাংলাদেশে। কিন্তু পাটের বিকল্প ও বহুমুখী ব্যবহার উদ্ভাবন করতে না পারায় আমরা এর রফতানিতে ক্রমে পিছিয়ে পড়ছি। অথচ পরিবেশ সচেতনতা বৃদ্ধির ফলে বিশ্বব্যাপী পাটজাত পণ্যের ব্যবহার বেড়ে চলেছে। বাংলাদেশের পণ্য রফতানি তালিকায় পাটের স্থান দখল করে নিয়েছে তৈরি পোশাক। মূলত ৭০ দশকের মাঝামাঝি সময় থেকে বাংলাদেশ তৈরি পোশাক রফতানি শুরু করে। অতি অল্প সময়ের মধ্যেই তৈরি পোশাক রফতানির ক্ষেত্রে বিশ্ববাসীর মনোযোগ আকর্ষণ করতে সমর্থ হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ও ব্যুরো অব ইকোনমিকসের পরিচালক ড. শফিক উজ জামানের সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে আলাপ হলে তিনি বলেন, বাংলাদেশের রফতানি বাণিজ্য কার্যত তৈরি পোশাকনির্ভর হয়ে পড়েছে। এটা মোটেও ভালো লক্ষণ নয়। কারণ এক পণ্য রফতানিনির্ভরতা কোনো দেশের অর্থনীতির জন্য মঙ্গলজনক হতে পারে না। কোনো কারণে সংশ্লিষ্ট পণ্যটির রফতানি বিপর্যয়ে পতিত হলে পুরো রফতানি কার্যক্রম মুখ থুবড়ে পড়তে বাধ্য। তিনি আরও বলেন, এক সময় বাংলাদেশ পাট রফতানির ওপর নির্ভরশীল ছিল। পাট রফতানিনির্ভরতার সুবিধা ছিল এই যে, পণ্যটি সম্পূর্ণরূপে স্থানীয় কাঁচামালনির্ভর। ফলে এ থেকে আহরিত পুরো বৈদেশিক মুদ্রা জাতীয় অর্থনীতিতে মূল্য সংযোজন করত। কিন্তু তৈরি পোশাক শিল্পের বেশিরভাগ কাঁচামাল ও ক্যাপিটাল মেশিনারিজ আমদানি করতে হয়। ফলে এ খাতে মূল্য সংযোজনের হার তুলনামূলক খুবই কম। তিনি বলেন, বর্তমানে মোট রফতানি আয়ের ক্ষেত্রে তৈরি পোশাক খাতের অবদান ৮২ দশমিক ৪৫ শতাংশ। তবে গত অর্থবছরে রফতানি প্রবৃদ্ধি অনেকটাই কমে গেছে। এর প্রবৃদ্ধি এভাবে কমে যাওয়াকে আমি বিপর্যয় বলব না। বরং বলবÑরফতানি প্রবৃদ্ধি শ্লথ হয়ে পড়েছে। এটা বাড়ানোর জন্য কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।

যে কোনো অর্থনীতির জন্য প্রবৃদ্ধি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়; কিন্তু আমার মনে হয় প্রবৃদ্ধির প্রভাব সব ক্ষেত্রে সমভাবে পড়ছে না। ফলে প্রবৃদ্ধি যেভাবে বাড়ছে, সেভাবে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হচ্ছে না। দারিদ্র্য বিমোচন হচ্ছে না। অথচ এ মুহূর্তে দারিদ্র্য বিমোচন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এজেন্ডা। আর দারিদ্র্য বিমোচনের প্রধান উপায় হচ্ছে ব্যাপকভিত্তিক কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করতে পারা। প্রবৃদ্ধি যদি কর্মসংস্থানকেন্দ্রিক না হয়, তাহলে দারিদ্র্য বিমোচন কোনোভাবেই সম্ভব নয়। তৈরি পোশাক শিল্পে প্রবৃদ্ধি বাড়ছে; কিন্তু সেখানে অটোমেশনও বৃদ্ধি পাচ্ছে। ফলে নতুন শ্রমিক নিয়োগ কমে যাচ্ছে। তাছাড়া ভবিষ্যতে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক আন্তর্জাতিক বাজারে বড় চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে যাচ্ছে। নতুন নতুন দেশ বিশ্ববাজারে তৈরি পোশাক নিয়ে আসছে। যারা পুরোনো প্রতিযোগী, তারাও নব-উদ্যমে রফতানি কার্যক্রম শুরু করেছে। তাদের উদ্দেশ্য হচ্ছে শীর্ষস্থান দখল করা। এ ক্ষেত্রে ভারতের কথা উল্লেখ করা যেতে পারে। ভারত তৈরি পোশাক রফতানির ক্ষেত্রে বাংলাদেশের জন্য বিরাট চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে। ভারত সরকার পোশাক রফতানি বাড়াতে নানা ধরনের প্রণোদনা দিচ্ছে। চলতি অর্থবছরে পোশাক শিল্পের জন্য ছয় হাজার কোটি ভারতীয় রুপি ভর্তুকি দিয়েছে তারা। ফলে তাদের তৈরি পোশাক রফতানি প্রবৃদ্ধি দ্রুতগতিতে বাড়ছে। দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় দেশ ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, ভিয়েতনাম, থাইল্যান্ড আন্তর্জাতিক বাজারে নতুন চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করেছে। বিশেষ করে ভিয়েতনামের তৈরি পোশাক রফতানি প্রতি বছর গড়ে ১০ হতে ১২ শতাংশ বৃদ্ধি পাচ্ছে। মিয়ানমার, কম্বোডিয়াও তৈরি পোশাকশিল্পে ভালো করছে। এসব দেশেও বাংলাদেশের মতো সস্তা শ্রমিক আছে। তবে আমাদের দেশের রফতানি বাণিজ্যের সবচেয়ে বড় সীমাবদ্ধতা হচ্ছে পণ্যের বহুমুখীকরণের অভাব। একই সঙ্গে আমরা বাজার বহুমুখীকরণে পিছিয়ে আছি। বর্তমানে বাজার বহুমুখীকরণে যদিও অগ্রগতি হয়েছে; কিন্তু তা সামান্য। আগে মোট রফতানি পণ্যের প্রায় ৫০ শতাংশ ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলোয় যেত। আর ২০ শতাংশ রফতানি হতো আমেরিকায়। এ দুটি বাজারে বাংলাদেশের ৭০ হতে ৭৫ শতাংশ পণ্য রফতানি হতো। এখন কিছু পণ্য ল্যাটিন আমেরিকার দেশগুলোয় যাচ্ছে। আর্জেন্টিনা, ব্রাজিল, জাপান, মালয়েশিয়া প্রভৃতি দেশে পণ্য রফতানি হচ্ছে; যদিও এর পরিমাণ খুব সামান্য। বাজার বহুমুখীকরণে কিছুটা সাফল্য অর্জিত হলেও রফতানি পণ্য বহুমুখীকরণে তেমন সাফল্য অর্জিত হয়নি। রফতানি পণ্যতালিকার ৮২ দশমিক ৪৫ শতাংশ জুড়ে রয়েছে তৈরি পোশাকসামগ্রী। পাট থেকে আসছে তিন শতাংশ রফতানি আয়। চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য থেকে তিন দশমিক সাত শতাংশ। অবশিষ্ট রফতানি আয় আসে অন্যান্য পণ্য থেকে।

বাংলাদেশের রফতানি সম্ভাবনা অত্যন্ত উজ্জ্বল। কিন্তু সে সম্ভাবনাকে আমরা সঠিকভাবে কাজে লাগাতে পারছি না। এ থেকে উত্তরণে রফতানি পণ্য বহুমুখীকরণের কোনো বিকল্প নেই। বিশেষ করে সেসব পণ্য রফতানি তালিকায় স্থান দিতে হবে, যেগুলোর কাঁচামাল স্থানীয়ভাবে সংগ্রহ করা যেতে পারে। অর্থাৎ সে পণ্যই রফতানি করতে হবে, যা অর্থনীতিতে অধিক হারে মূল্য সংযোজন করতে পারে। পাটের ক্ষেত্রে মূল্য সংযোজনের হার ৮০-৯০ শতাংশ। অন্যদিকে তৈরি পোশাকের ক্ষেত্রে এ হার হচ্ছে ৩০ থেকে ৩৫ শতাংশ। রফতানি পণ্যতালিকায় আমাদের সেসব পণ্যের প্রতি দৃষ্টি দিতে হবে, যেগুলোর মূল্য সংযোজনের হার পাটের মতো না হলেও বেশি। ৮০’র দশক থেকে বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশিল্প ক্রমে বিশ্বের বুকে স্থান করে নিয়েছে। কিন্তু কম মূল্য সংযোজন হারের পাশাপাশি এ খাতে যারা কর্মরত, তাদের বেশিরভাগই অদক্ষ শ্রমিক। কারিগরিভাবে দক্ষ লোকবলের অভাবও কম নয়। দক্ষ লোকবল রীতিমতো আমদানি করতে হয়। ফলে প্রতি বছর এদের বেতন-ভাতা বাবদ প্রচুর পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় করতে হয়। বাংলাদেশ বর্তমানে তৈরি পোশাক রফতানির ক্ষেত্রে বিশ্বে দ্বিতীয়। চীনের পরই এর অবস্থান। বিশ্বে প্রতি বছর যে পোশাক রফতানি হয়, দেশটি তার ৩৫ শতাংশ দখল করে আছে। অন্যদিকে বাংলাদেশের দখলে আছে ছয় শতাংশ বাজার। ভবিষ্যতেও তৈরি পোশাক রফতানির এ সুযোগ থাকবে। কিন্তু আমাদের এখন হাই ভ্যালু এডিশন তৈরি পোশাকশিল্পের দিকে দৃষ্টি দিতে হবে। সাম্প্রতিক সময়ে আমরা স্থানীয় কাঁচামালনির্ভর শিল্পের প্রতি কিছুটা হলেও অবহেলা প্রদর্শন করছি। এটা দূর করতে হবে। স্থানীয় কাঁচামালনির্ভর শিল্পে জোর দিতে হবে। বাংলাদেশ পাট উৎপাদনে বিশ্বের সেরা। আমাদের পাট অত্যন্ত উন্নত মানের। কিন্তু আন্তর্জাতিক পাটবাজার ভারত ও চীনের দখলে চলে গেছে। ব্রাজিলও পাট উৎপাদন করছে। এ অবস্থায় পাটের আন্তর্জাতিক বাজারে অবস্থান পুনরুদ্ধার করতে হবে আমাদের। আমাদের পাট ও পাটনির্ভর পণ্য রফতানির ওপর জোর দিতে হবে। একইভাবে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য রফতানিতে গুরুত্বারোপ করতে হবে। বাংলাদেশে উৎপাদিত চামড়া আন্তর্জাতিক মানের। ৯০ দশকের আগে বাংলাদেশ থেকে মূলত কাঁচা চামড়া রফতানি হতো। এরপর ওয়েট ব্লু চামড়া রফতানি বন্ধ করে দেওয়া হয়। অনেকেই সে সময় মনে করেছিলেন, ভবিষ্যতে বাংলাদেশ হয়তো বিশ্ববাজারে তার অবস্থান হারাবে। কিন্তু দেশটি প্রক্রিয়াজাত চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য রফতানি করে আগের চেয়ে অনেক বেশি আয় করছে। তৈরি পোশাকের মতোই আন্তর্জাতিক বাজারে চামড়াজাত পণ্যের চাহিদা কখনও হ্রাস পাবে না। কাজেই আমরা ইচ্ছা করলেই এ খাত থেকে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা আয় করতে পারি। তবে আমাদের চামড়াশিল্পের বিকাশে পরিকল্পিত উদ্যোগ নিতে হবে। আর একটি বিষয়, চামড়াজাত পণ্য উৎপাদন বাড়াব; কিন্তু তা হতে হবে পরিবেশ রক্ষা করে। পরিবেশের ক্ষতি করে কোনো উৎপাদন প্রক্রিয়া চালানো যাবে না।

 

অর্থনীতিবিষয়ক কলাম লেখক