পতনের পুঁজিবাজারে খাতভিত্তিক লেনদেনে বিনিয়োগকারী

মুস্তাফিজুর রহমান নাহিদ: নির্বাচনের পর ঊর্ধ্বমুখী হলেও সম্প্রতি আবারও পতনের ধারায় রয়েছে পুঁজিবাজার। কমে গেছে বিনিয়োগকারীদের উপস্থিতি। এর জের ধরে পতন হচ্ছে তালিকাভুক্ত বেশিরভাগ কোম্পানির শেয়ারদরে। একই সঙ্গে কমছে সূচক ও লেনদেন। গত ছয় কার্যদিবসে ডিএসইর প্রধান সূচক কমেছে ৯৬ পয়েন্ট।
এদিকে পতনমুখী বাজারে খাতভিত্তিক লেনদেনে আগ্রহী হয়ে উঠেছেন সাধারণ বিনিয়োগকারীরা। লাভের আশায় তারা এক খাত থেকে দ্রুত অন্য খাতের শেয়ারে চলে যাচ্ছেন। এর ফলে সার্বিক বাজারের পতন হলেও ভিন্ন ভিন্ন সময়ে নির্দিষ্ট একটি খাতের শেয়ারদর বাড়তে দেখা যাচ্ছে।
প্রাপ্ত তথ্যমতে, নির্বাচনের আগে ডিএসইর প্রধান সূচকের অবস্থান ছিল পাঁচ হাজার ৩৮৫ পয়েন্টে। নির্বাচনের পর বাজার ঘুরে দাঁড়ালে সূচক বেড়ে পাঁচ হাজার ৯৫০ পয়েন্টে চলে যায়। নির্বাচনের ২৪ দিনের মধ্যে সূচকের উত্থান হয় ৫৬৫ পয়েন্ট। এরপরই বাজার তার আগের রূপে ফিরে গেছে। সে সময় ছন্দপতন দেখা দিয়ে তা এখনও অব্যাহত রয়েছে। গত ১৪ কার্যদিবসের ব্যবধানে ডিএসইর প্রধান সূচক কমেছে ২১৯ পয়েন্ট। দৈনিক গড়ে সূচকের পতন হয়েছে ১৫ দশমিক ৬৪ পয়েন্ট।
এদিকে নির্বাচনের পর সূচক বৃদ্ধির জের ধরে লেনদেন বেড়ে দ্বিগুণ হয়। নির্বাচনের আগে ডিএসইর লেনদেন ছিল ৫৩৮ কোটি টাকা। ২৭ জানুয়ারি লেনদেন বেড়ে হয় এক হাজার ১৯৮ কোটি টাকা। পরে পতনের জের ধরে লেনদেন কমে যায়। গতকাল ডিএসইতে মোট লেনদেন হয় ৯০১ কোটি টাকা।
অন্যদিকে বাজারসংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রকৃতপক্ষে বিনিয়োগকারীরা খাতভিত্তিক লেনদেন করছেন না। একটি চক্র কৃত্রিমভাবে খাতভিত্তিক শেয়ার নিয়ে কারসাজি করছে। আর এই ফাঁদে পা দিচ্ছেন সাধারণ বিনিয়োগকারীরা। এতে তারা লাভবান হওয়ার চেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন বেশি।
খাতভিত্তিক লেনদেন করার চেয়ে মৌলভিত্তিসম্পন্ন কোম্পানিতে বিনিয়োগ বুদ্ধিমানের কাজ বলে মনে করছেন বাজারসংশ্লিষ্টরা। তাদের অভিমত, বাছবিচার ছাড়া খাতভিত্তিক বিনিয়োগে একটা পর্যায়ে হিতে বিপরীত হতে পারে।
সম্প্রতি বাজারচিত্রে পরিলক্ষিত হয়, কিছুদিন আগে সবার নজর ছিল বস্ত্র খাতের শেয়ারে। এটি শুরু হয় নির্বাচনের কিছুদিন আগে। কিন্তু নির্বাচনের পরপরই এ খাতের দিকে আরও বেশি ঝুঁকে যান বিনিয়োগকারীরা। তখন কারণ ছাড়াই এ খাতের বেশিরভাগ কোম্পানির শেয়ারদর একযোগে বাড়তে থাকে। প্রায় প্রতিদিনই বিক্রেতা সংকট তৈরি হয় এসব শেয়ারের।
এর পরপরই বিনিয়োগকারীরা ঝুঁকে পড়েন ব্যাংক খাতের শেয়ারে। তখন ব্যাংক খাতের প্রায় সব কোম্পানির শেয়ারদর প্রায় একযোগে বাড়তে থাকে। ১০ টাকা বা এর কাছাকাছি থাকা বেশিরভাগ কোম্পানির শেয়ারদর বেড়ে ১৫ টাকার ওপরে চলে যায়। যদিও এসব শেয়ারদর বৃদ্ধি নিয়ে তেমন কোনো বিতর্ক দেখা যায়নি। কারণ দীর্ঘদিন থেকে ব্যাংক খাতের অধিকাংশ কোম্পানির শেয়ারদর তলানিতে ছিল।
ব্যাংক শেয়ারের দর বৃদ্ধির পর বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ দেখা যায় ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক খাতের শেয়ারের প্রতি। যে কারণে অন্য খাতের মতো এ খাতের অধিকাংশ কোম্পানির শেয়ারদর বাড়তে থাকে। বর্তমানে একচেটিয়া আধিপত্য বিস্তার করছে বিমা খাতের শেয়ার। প্রতিদিনই দর বৃদ্ধির তালিকায় থাকছে এসব কোম্পানি। গতকালও দিনজুড়ে এসব কোম্পানির শেয়ারের দাপট দেখা যায়। দিন শেষে দর বৃদ্ধির তালিকায় উঠে আসে এসব প্রতিষ্ঠানের নাম।
জানতে চাইলে ডিবিএ’র প্রেসিডেন্ট শাকিল রিজভী বলেন, কোনো কোম্পানিতে বিনিয়োগের আগে সেই কোম্পানির আর্থিক অবস্থা বিবেচনায় নিতে হবে। কোনো খাতের কিছু কোম্পানির শেয়ারদর বাড়ছে বলে ওই খাতের সব কোম্পানির শেয়ারদর বাড়বে, এমনটি ভাবা ঠিক নয়। বিশেষ করে দর বৃদ্ধি পাওয়া কোম্পানিতে শেষের দিকে যারা শেয়ার ক্রয় করেন তারাই বেশি বিপদে পড়েন। বিষয়টি বিনিয়োগকারীদের মাথায় রাখা দরকার।
এ প্রসঙ্গে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ডিএসইর একজন পরিচালক বলেন, বিমা খাতের অধিকাংশ কোম্পানির শেয়ারদর বৃদ্ধির কোনো যুক্তি নেই। বিনা কারণেই বাড়ছে এসব শেয়ারদর। মূলত বর্তমানে এই খাতসহ অন্য খাতগুলোয় জুয়াড়িদের উপস্থিতি সক্রিয়। তারা একটি সেক্টর ছেড়ে অন্য একটি সেক্টরে যাচ্ছে। এর সঙ্গে সঙ্গে বিনিয়োগকারীরাও পোর্টফোলিও পরিবর্তন করছেন। এটা একসময় তাদের বিপদের কারণ হতে পারে।
বাজারসংশ্লিষ্টরা বলেন, ব্যাংক খাতের মতো এই খাতের কিছু কোম্পানির শেয়ারদর বিনিয়োগের অনুকূলে রয়েছে। তবে বেশ কিছু কোম্পানির শেয়ারদর অকারণেই বেড়েছে, যার কোনো ভিত্তি নেই। বিনিয়োগকারীরা যে কোনো সময় এসব শেয়ার নিয়ে ভোগান্তিতে পড়তে পারেন।