করপোরেট টক

পথচলার ৩৩ বছর সাধারণ বিমায় সফল গ্রীন ডেল্টা

বাংলাদেশের শীর্ষস্থানীয় বেসরকারি সাধারণ বিমা প্রতিষ্ঠান গ্রীন ডেল্টা ইন্স্যুরেন্স। প্রতিষ্ঠানটির বিস্তারিত তুলে ধরেছেন শরিফুল ইসলাম পলাশ

গ্রীন ডেল্টা ইন্স্যুরেন্স বাংলাদেশের শীর্ষস্থানীয় বেসরকারি সাধারণ বিমা প্রতিষ্ঠান। তিন দশক আগে ১৯৮৬ সালের ১ জানুয়ারি বাণিজ্যিক কার্যক্রম শুরু করে গ্রীন ডেল্টা ইন্স্যুরেন্স। ৩৩ বছরের পথপরিক্রমায় তিন কোটি টাকা পরিশোধিত মূলধন নিয়ে শুরু করা গ্রীন ডেল্টা এখন প্রায় ৮৯ কোটি টাকা মূলধনের প্রতিষ্ঠান। চারটি সহযোগী প্রতিষ্ঠান নিয়ে বেশ ব্যবসাসফল গ্রুপও গ্রীন ডেল্টা। বর্র্তমানে বিশ্বব্যাংকের ইন্টারন্যাশনাল ফাইন্যান্স করপোরেশনের (আইএফসি) সঙ্গে ‘ইক্যুইটি পার্টনার’ হিসেবেও কাজ করছে এ গ্রুপটি।
প্রতিষ্ঠানটির স্বপ্নদ্রষ্টা বিমাব্যক্তিত্ব নাসির এ চৌধুরী। জার্মানির মালিকানাধীন একটি প্রতিষ্ঠানে চাকরিরত অবস্থায় অনেকটা চ্যালেঞ্জ নিয়েই বিমা ব্যবসা শুরু করেন তিনি। ব্যবসা সম্পর্কে উল্লেখ করার মতো কোনো ধারণা না থাকলেও প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী গ্রুপগুলোর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে টিকে আছেন। ৩৩ বছরের বেশি সময়ের পথচলায় গ্রীণ ডেল্টাই হয়ে উঠেছে সাধারণ বিমা শিল্পের পথপ্রদর্শক।
শুরুটা ভীষণ চ্যালেঞ্জের হলেও
কর্মদক্ষতা, অধ্যবসায় আর অক্লান্ত পরিশ্রমের কারণে স্বল্প সময়ের মধ্যে মানুষের আস্থা অর্জন করতে পেরেছে গ্রীন ডেল্টা। মূলত সময়ের সঙ্গে এগিয়ে থাকার চেষ্টাই কোম্পানিটিকে এগিয়ে নিয়েছে। এজন্য নিত্যনতুন বিমা পণ্য, দাবি পরিশোধের ঝামেলাহীন পদ্ধতি, তথ্যপ্রযুক্তির সর্বোত্তম ব্যবহার ও প্রশিক্ষিত জনবলসহ বেশ কয়েকটি বিষয়ের ওপর জোর দিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।
শুধু একটি ব্যবসার ওপর নির্ভরশীল না হয়ে বেশকিছু খাতে বিনিয়োগ করেছে গ্রীণ ডেল্টা। পুঁজিবাজারে শেয়ার লেনদেনের জন্য গ্রীন ডেল্টা সিকিউরিটিজ লিমিটেড রয়েছে তাদের। ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংকিংয়ের জন্য রয়েছে গ্রীণ ডেল্টা ক্যাপিটাল লিমিটেড। স্বাস্থ্যসেবা বিষয়ে জিডি অ্যাসিস্ট প্রতিষ্ঠা করেছে। বিমা বিষয়ে প্রশিক্ষণে যুক্তরাজ্যের একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করার জন্য প্রফেশনাল অ্যাডভান্স বাংলাদেশ লিমিটেডসহ চারটি সহযোগী প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছে। এর বাইরে আর্থিক প্রতিষ্ঠান ডেল্টা ব্র্যাক হাউজিং, বেসরকারি জীবন বিমা কোম্পানি প্রগ্রেসিভ লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি লিমিটেডসহ আরও কয়েকটি কোম্পানিতে অংশীদারিত্ব রয়েছে তাদের।
প্রতিষ্ঠা থেকে গ্রীন ডেল্টার নেতৃত্বে ছিলেন নাসির এ চৌধুরী। বয়সের কারণে তিনি মুখ্য নির্বাহীর পদ থেকে সরে যাওয়ার পর হাল ধরেন তার মেয়ে ফারজানা চৌধুরী। তিনি ডেল্টা-ব্র্যাক হাউজিংয়ের মাধ্যমে কর্মজীবন শুরু করেছিলেন। পথচলার তিন দশকে এসে ছয় শতাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারী, গ্রাহক ও বিনিয়োগকারী নিয়ে একটি বৃহৎ পরিবারে রূপ নিয়েছে গ্রীন ডেল্টা।
প্রতিষ্ঠানটিতে চেয়ারম্যানের দায়িত্বে রয়েছেন মো. আবদুল করিম। ভাইস চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করছেন শামসুন নাহার বেগম চৌধুরী। পরিচালনা পর্ষদে আরও রয়েছেন খুরশিদা চৌধুরী, দিলরুবা চৌধুরী, ইকবাল খান (জামাল), কামরান ইদ্রিস চৌধুরী, মেসবাহ দিলওয়ার রহমান, মারুফা আনোয়ার, রাজিয়া রহমান, ফয়সাল আহমেদ চৌধুরী ও আবুল হাসান চৌধুরী। প্রতিষ্ঠানটির সিনিয়র ম্যানেজমেন্ট টিমে আরও রয়েছেন এএসএ মুইজ, একেএম ইফতেখান আহমদ, সৈয়দ মঈনুদ্দিন আহমেদ, ওয়াফি শফিক মেহনাজ খান,
মো. রফিকুল ইসলাম, মো. আনিসুর রহমান, কবীর আহমেদ চৌধুরী ও মনির আহমেদ।
নতুনত্বের অংশ হিসেবে ‘সবার জন্য বিমা’ স্লোগান নিয়ে কাজ করা কোম্পানিটির উল্লেখযোগ্য একটি নবতর পণ্য ‘নিবেদিতা’। এটি শুধু নারীদের জন্য একটি সমন্বিত বিমা পলিসি। বাংলাদেশে এ ধরনের পলিসি এটিই প্রথম। বৈষম্যের শিকার নারীদের নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্যের কথা চিন্তা করে ওই পলিসি আনা হয়েছে। নিবেদিতার মাধ্যমে একজন নারী অ্যাসিড-সন্ত্রাস, ধর্ষণ ও অন্য বিপদে কাভারেজ সুবিধা পাবে। এছাড়া গর্ভকালীন মৃত্যুসহ অন্য দুর্ঘটনায়ও নারীরা ওই বিমার আওতায় আসবে। শুধু বিমা সুবিধাই নয়, একজন নারীর সঙ্গী হিসেবে কাজ করে তাদের আত্মনির্ভরশীল হতে সহায়তা করবে নিবেদিতা। এজন্য অ্যাপও তৈরি করা হয়েছে। নিবেদিতা ছাড়াও বেশ কয়েকটি নতুন পণ্য রয়েছে গ্রীন ডেল্টা ইন্সুরেন্সের।
তৃণমূল মানুষের দোরগোড়ায় স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দিতে প্রথম বেসরকারি কোম্পানি হিসেবে ‘নিরাময়’ নামে পরীক্ষামূলক স্বাস্থ্যবিমা শুরু করেছে গ্রীন ডেল্টা ইন্স্যুরেন্স। এর সফলতার জের ধরে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের পরীক্ষামূলক ‘স্বাস্থ্য সুরক্ষা প্রকল্প (এসকেএস)’ বাস্তবায়ন করছে এ প্রতিষ্ঠান। পাশাপাশি আবহাওয়ার সূচকনির্ভর শস্যবিমা প্রকল্প বাস্তবায়নেও কাজ করছে কোম্পানিটি।
১৯৮৯ সালে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত গ্রীন ডেল্টার বর্তমান রিজার্ভের পরিমাণ প্রায় ৫৪৫ কোটি টাকা। ২০১৮ সালের ৩১ ডিসেম্বর সমাপ্ত অর্থবছরে প্রায় ২৯ কোটি টাকা মুনাফা করেছে কোম্পানিটি। এর বিপরীতে বিনিয়োগকারীদের ১০ শতাংশ নগদ ও ১০ শতাংশ বোনাস লভ্যাংশ দিয়েছে। ‘এ’ ক্যাটেগরিতে থাকা ওই কোম্পানির মোট শেয়ারের এক-তৃতীয়াংশই উদ্যোক্তা ও পরিচালকদের হাতে রয়েছে।


অর্জন-স্বীকৃতি
গ্রীন ডেল্টার অর্জন ও স্বীকৃতির ঝুলিটা একই খাতের অন্য কোম্পানির তুলনায় অনেক বেশি পূর্ণ। নতুন পণ্যসেবা চালু ও সময়োপযোগী পরিকল্পনার কারণে দেশি-বিদেশি বিভিন্ন সংস্থার স্বীকৃতি ও পুরস্কার অর্জন করেছে প্রতিষ্ঠানটি। এমন কয়েকটি পুরস্কারের তথ্য:

২০১০
#২০১০ সালের ২০ ডিসেম্বর ‘টোটাল কোয়ালিটি ম্যানেজমেন্ট (টিএমকিউ) সিল’ অর্জন করে গ্রীন ডেল্টা। উন্নততর কার্যক্রম ও গ্রাহক সন্তুষ্টির কারণে ওই স্বীকৃতি পায় কোম্পানিটি। গুণগত মান ও পণ্যের নামকরণে সেরা হওয়ায় ‘প্লাটিনাম টেকনোলজি অ্যাওয়ার্ড’ দেওয়া হয়। বার্লিনের ‘অ্যাসোসিয়েশন আদারওয়েজ’ নামের একটি প্রতিষ্ঠান ওই পুরস্কার দেয়। ২০১১ সালেও একই পুরস্কার পেয়েছে গ্রীন ডেল্টা
# আর্থিক প্রতিবেদন বিবেচনায় নিয়ে ওই বছরের ডিসেম্বরে বিমা খাতের কোম্পানি হিসেবে ‘বেস্ট পাবলিশড অ্যাকাউন্টন্স’ ক্যাটেগরিতে প্রথম পুরস্কার পায়

২০১১
# নেতৃত্ব ও দক্ষ ব্যবস্থাপনা, গুণগত মান ও শক্তিশালী বিপণন ব্যবস্থার কারণে যুক্তরাষ্ট্রের ওয়ার্ল্ড বিজনেস কনফেডারেশন অব বিজনেসের ‘দ্য বিজ অ্যাওয়ার্ড ২০১১’ অর্জন
# বিমা খাতের কোম্পানি হিসেবে আইসিএমএবি বেস্ট করপোরেট অ্যাওয়ার্ড পায় কোম্পানিটি। এরপর আরও দু’দফায় আইসিএমএবি’র দেওয়া করপোরেট অ্যাওয়ার্ড নিজেদের ঝুলিতে পুরেছে। এরপর ২০১৮ সালেও ওই প্রতিষ্ঠান ‘বেস্ট করপোরেট অ্যাওয়ার্ড ২০১৭’ পেয়েছে
# সেরা আর্থিক হিসাবের জন্য ওই বছর সাউথ এশিয়ান ফেডারেশন অব অ্যাকাউন্টসের (সাফা) দেওয়া ‘সার্টিফিকেট অব মেরিট’ অ্যাওয়ার্ড পেয়েছে গ্রীন ডেল্টা। ২০১৪ সালেও সাফা’র দেওয়া প্রথম পুরস্কার পায়

২০১৪
# দেশের সেরা সাধারণ বিমা কোম্পানি হিসেবে গ্রীন ডেল্টা ইন্টারন্যাশনাল ফাইন্যান্স ম্যাগাজিনের অ্যাওয়ার্ড পেয়েছে। ২০১৫ সালে দ্বিতীয়বারের মতো ওই অ্যাওয়ার্ড অর্জন করে
# দেশের প্রথম সাধারণ বিমা কোম্পানি হিসেবে ক্রেডিট রেটিংয়ে ‘এএএ’ পেয়েছে। ২০১৮ সালেও একই অবস্থান ধরে রাখে কোম্পানিটি
# সেরা আর্থিক প্রতিবেদনের জন্য বিমা খাতের কোম্পানি হিসেবে আইসিএবি’র প্রথম পুরস্কার পেয়েছে। এরপর ২০১৫, ২০১৬ ও ২০১৮ সালেও একই পুরস্কার পেয়েছে

২০১৫
# সেরা সাধারণ বিমা কোম্পানি হিসেবে ‘ওয়ার্ল্ড ফাইন্যান্স অ্যাওয়ার্ড’ অর্জন
# আর্থিক প্রতিবেদনের জন্য ইন্টারন্যাশনাল এআরসি অ্যাওয়ার্ড অর্জন। ২০১৬ সালেও একই পুরস্কার পেয়েছে কোম্পানিটি
# প্রাতিষ্ঠানিক সুশাসনের জন্য
আইসিএসবি’র ‘করপোরেট গভর্ন্যান্স এক্সিলেন্স অ্যাওয়ার্ড’ পেয়েছে। এর পর থেকে প্রতি বছরই বিমা কোম্পানি ক্যাটেগরিতে প্রথম হচ্ছে গ্রীন ডেল্টা

২০১৮
# আবহাওয়ার সূচকভিত্তিক কৃষি বিমার জন্য গ্রীন ডেল্টা মেটলাইফ ফাউন্ডেশনের দেওয়া ‘ইনক্লুশন পালস অ্যাওয়ার্ড’ পেয়েছে
#তিন ক্যাটেগরিতে ইমার্জিং এশিয়া ইন্স্যুরেন্স অ্যাওয়ার্ড লাভ করে
# ওয়ার্ল্ড এইচআরডি কংগ্রেসের ‘বাংলাদেশ বেস্ট এমপ্লয়ার ব্র্যান্ড অ্যাওয়ার্ড’ অর্জন।

একনজরে গ্রীন ডেল্টা ইন্স্যুরেন্স

১৯৮৫: সাধারণ বিমা কোম্পানি হিসেবে ১৪ ডিসেম্বর নিবন্ধন পায় গ্রীন ডেল্টা ইন্স্যুরেন্স
১৯৮৬: ১ জানুয়ারি বাণিজ্যিক পথচলা শুরু। পরদিন (২ জানুয়ারি) প্রথম বিমা চুক্তি করে
১৯৮৯: ১৯ আগস্ট তালিকাভুক্তির জন্য বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের প্রত্যয়নপত্র পায়। ওই বছরের ৩১ ডিসেম্বর মূলধন ৬০ কোটি টাকায় উন্নীত করে প্রতিষ্ঠানটি
১৯৯০: ১২ জানুয়ারি ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) তালিকাভুক্ত হয়। প্রথম শেয়ার লেনদেন হয় ১৪ জানুয়ারি
১৯৯৫: চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে ২১ জানুয়ারি তালিকাভুক্ত হয়। পরদিন প্রথম শেয়ার লেনদেন হয়
১৯৯৭: নন-ব্যাংকিং আর্থিক প্রতিষ্ঠান ডেল্টা-ব্র্যাক হাউজিংয়ে ওই বছরের অক্টোবরে ইকুইটি ইনভেস্টর হিসেবে বিনিয়োগ করে
২০০৪: দ্বিতীয় দফায় পুঁজি উত্তোলনের জন্য ৫ মে রাইট শেয়ার ছাড়ে
২০০৫: ১১ মে ইসলামী ইন্স্যুরেন্স স্কিম চালু করে। ১২ মে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের সদস্যপদ নেয়। এরপর ১২ জুন যৌথ মালিকানায় নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে গ্রীন ডেল্টা এইমস লিমিটেড গড়ে তোলে। ১৩ অক্টোবর গ্রীন ডেল্টা ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস চালু করে। পরের বছরের ১ জুলাই এ সেবার বাণিজ্যিক পথচলা শুরু হয়। আর ওই বছরের ডিসেম্বর শেষে কোম্পানিটির মূলধন ১০ কোটি ৮০ লাখ টাকা বৃদ্ধি পায়
২০১০: গ্রীন ডেল্টা মিউচুয়াল ফান্ড ৩০ মার্চ বিএসইসির অনুমোদন পায়। ওই ফান্ডটির আকার ১৫০ কোটি টাকা
২০১৩: প্রথম বাংলাদেশি বিমা কোম্পানি হিসেবে মার্চে বিশ্বব্যাংকের ইন্টারন্যাশনাল ফাইন্যান্স করপোরেশনের (আইএফসি) সঙ্গে ‘ইকুইটি পার্টনার’ হিসেবে চুক্তি করে
২০১৫: আকিজ গ্রুপের ঢাকা টোব্যাকো লিমিটেডের সঙ্গে বিমা চুক্তি অনুযায়ী ওই বছরের ফেব্রুয়ারিতে প্রায় ৬৮ কোটি টাকা বিমা দাবি পরিশোধ করে। এটি বড় অঙ্কের বিমা দাবিগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য।

সর্বশেষ..