পথের কাঁটা অপসারণ

দুঃসাহসী সওদাগর: পর্ব-৪১

শামসুন নাহার: কেবল আর্থিক চাপমুক্ত হওয়াই আম্বানির মতো ব্যবসায়ীর জন্য যথেষ্ট নয়। শেয়ারমূল্য এখন স্বাভাবিক, অন্য সব কোম্পানির মতোই। কিন্তু তাতেই যদি সন্তুষ্ট হতে পারতেন তিনি তাহলে তো আর এ উপাখ্যান লেখা হতো না। নয়াদিল্লির সঙ্গে পুনরায় সম্পর্ক স্থাপন করতে হবে। ইন্দিরার মৃত্যুর পর মুখের ওপর বন্ধ হয়ে যাওয়া দুয়ারগুলো খুলতে হবে। আর এজন্য প্রধান চাবিকাঠি হলেন রাজীব গান্ধী। কিন্তু এ ভদ্রলোককে কব্জা করা কঠিন। হবেই না বা কেন। রাজীবের কাছে ধীরুভাই যেন সাক্ষাৎ শয়তানের প্রতিমূর্তি। লাইসেন্স দুর্নীতির মূল হোতা। রাজীবের মনে এমন ধারণা দেওয়া

হয়েছে যে আম্বানিই কংগ্রেসকে ডুবিয়েছেন, নেতাদের পথভ্রষ্ট করেছেন।

প্রধানমন্ত্রীর ঘরে জন্মে এবং রাজনীতির আবহে বড় হয়েও রাজীবের মধ্যে নিষ্ঠুরতা ছিল না, যেটা ইন্দিরা ও তার ছোট ছেলে সঞ্জয়ের মধ্যে ছিল অনেক বেশি। রাজীব বরং প্রযুক্তি ও প্রকৃতি নিয়ে মেতে থাকতেন। শখের ফটোগ্রাফি করতেন। ক্ষমতার উচ্চে আসীন হওয়ার উচ্চাকাক্সক্ষাই তার ছিল না কখনও। উচ্চাকাক্সক্ষার অভাবেই হয়তো কেমব্রিজ থেকে মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংটা শেষ পর্যন্ত সম্পন্ন করতে পারেননি। সঞ্জয়ের মৃত্যুর পর একরকম জোর করেই তাকে রাজনীতির মাঠে নামানো হয়েছে। তার আগ পর্যন্ত ইন্ডিয়ান এয়ারলাইনসের প্লেন চালানো নিয়ে খুশিই ছিলেন রাজীব।

ক্ষমতায় এসেই দলের মধ্যে বেশ কিছু বড় পরিবর্তন এনেছেন রাজীব। ইন্দিরার একান্ত বলয়ের প্রচণ্ড ক্ষমতাসীন কয়েকজন নেতাকে অপসারণ করেছেন। তাদের স্থলাভিষিক্ত করেছেন নিজের মনোনীত পছন্দের ব্যক্তিদের। তা সত্ত্বেও মনের অন্তরালে রাজীব ছিলেন ভীষণ আতঙ্কপ্রবণ। যখনই কোনো জনহিতৈষী পরিকল্পনা ভেস্তে গেছে, বিগড়ে গেছে কোনো কারণে, প্রচণ্ড হতাশ হয়ে পড়েছেন রাজীব। আরেকটি ব্যাপার হলো, কংগ্রেস পার্টিতে বিশেষত নেহরু-গান্ধী পরিবারের আশপাশে চাটুকারের অভাব ছিল না কোনো কালেই। এদের কারণেই প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে পার্টির মজবুত যোগাযোগ কঠিন হয়ে পড়েছিল। এরা তোষামোদী ও প্রশংসায় পঞ্চমুখ। কিন্তু প্রধানমন্ত্রীর কানে কানে সত্য কথাটি বলে দেওয়ার মতো কেউ ছিল না।

১৯৮৫ সালের ডিসেম্বরে কংগ্রেসের শতবর্ষপূর্তির সম্মেলনে দুর্নীতির বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছিলেন রাজীব গান্ধী। ক্ষমতার অপব্যবহারকারী নেতা ও তাদের সহায়তায় ফুলে-ফেঁপে ওঠা ব্যবসায়ী শ্রেণির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে, বলেছিলেন তার বক্তব্যে। কিন্তু কয়েক মাসের মধ্যে নিজের দলের নেতাকর্মীরাই তার এ বক্তব্য নিয়ে হাসাহাসি করেছে। দ্বিতীয় বাজেটের পরপরই ভিপি সিং যেভাবে ট্যাক্স ও বৈদেশিক মুদ্রা অভিযান চালিয়েছেন তাতে সবগুলো বড় ব্যবসায়ী গ্রুপ চরম অসন্তোষ প্রকাশ করেছে। তাদের পক্ষ থেকে একের পর এক অভিযোগ এসেছে। ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে গাদাগাদা মামলা দেওয়া হয়েছে। তার মধ্যে অল্পই পূর্ণাঙ্গ নিষ্পত্তিতে পৌঁছাতে পেরেছে। অথচ মামলা হতে না হতেই (অপরাধ প্রমাণিত হওয়ার আগেই) তাড়াহুড়া করে ব্যবসায়ীদের গ্রেফতার করা হয়েছে, অর্থ ও মালামাল বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে, জরিমানা হয়েছে কোটি কোটি রুপি। এছাড়া পত্রপত্রিকায় প্রচারের কারণে সমগ্র দেশবাসীর সামনে অপমানিতও হতে হয়েছে। এ নিয়ে বেশ চাপে ছিলেন প্রধানমন্ত্রী।

১৯৮৬ সালের এপ্রিলে ইন্দিরা গান্ধীর বিশ্বস্ত মহলের নেতারা বিদ্রোহ করতে যাচ্ছেন বলে খবর বের হলো প্রত্রিকায়। এ মর্মে প্রণব মুখার্জির একটি সাক্ষাৎকার প্রকাশের পর দল থেকে বহিষ্কার করা হলো তাকে। তার মাস দুয়েক পরে তুতোভাই অরুণ নেহরুর সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করেন রাজীব। অরুণের সঙ্গে সুসম্পর্ক ছিল আম্বানির। অক্টোবরে বিদ্যুৎ মন্ত্রণালয় থেকেও বাদ দেওয়া হয় অরুণকে।

ভারতের রাজনীতিতে এ রদবদল খুবই গুরুত্ববহ। টাইমস অব ইন্ডিয়ার সম্পাদক গিরিলাল জেইন মন্তব্য করেন, পুঁজিপতিদের জন্য প্রধানমন্ত্রীর দুয়ার এখন বন্ধ। অনেক বুদ্ধিজীবীরাই অনুমান করলেন যে, রাজীব ভয়ঙ্কর খেলায় নেমেছেন। তার দুঃসময়ের শুরু হলো। সেপ্টেম্বরের শুরুতে গুরুমূর্তির রিপোর্টের বয়ান শুনতে চাইলেন রাজীব। আর অক্টোবরেই ধীরুভাইয়ের সঙ্গে বৈঠক করলেন। তাদের বৈঠকে প্রকৃতপক্ষে কী কথা হয়েছে, তা জানা যায়নি। কিন্তু অবাক হতে হয়, আম্বানি এমন কি বললেন যে রাজীবের দিক থেকে ইতিবাচক সাড়া পেয়ে গেলেন। নয়াদিল্লিতে তাদের এ বৈঠক নিয়ে কিছু গল্প প্রচলিত রয়েছে। রাজীবের সঙ্গে প্রথম আনুষ্ঠানিক বৈঠকেই ধীরুভাই নাকি উদাসীন ভঙ্গিতে বলেছিলেন, অনেক দিন ধরে আপনার মায়ের বিরাট একটি ফান্ড পড়ে আছে আমার কাছে। এটা নিয়ে কী করি বলুন তো? এ গল্পটি সত্যও হতে পারে আবার নাও পারে। তবে এমন কিছু ঘটে থাকলে অবাক হওয়ার কিছু নেই। ধীরুভাইয়ের পক্ষে এটি সম্ভব। তাছাড়া কারখানা সম্প্রসারণের জন্য রাজীবের মুখ থেকে তখন ‘হ্যাঁ’ শব্দটি বের করা দরকার ছিল।

যাই হোক, চালাকি করে বা যে করেই রাজীবের সঙ্গে মোটামুটি সন্ধি করতে সক্ষম হয়েছিলেন ধীরুভাই। পার্টির মধ্যে যে বিদ্রোহ দানা বেঁধে উঠেছে তাতে হতাশ ছিলেন রাজীব। এরকম অবস্থায় ধীরুভাই হয়তো রাজীবকে বোঝাতে পেরেছিলেন যে, তাদের দু’জনের পতনের মূলে একই পক্ষ কাজ করছে। ওদিকে অর্থমন্ত্রী ভিপি সিং যে মুম্বাই ফিল্মের মেগাস্টার অমিতাভ বচ্চনের ব্যাপারে গোপন তদন্ত শুরু করেছেন তা কোনোভাবে জেনে গেছেন আম্বানি। রাজীবই অমিতাভকে কংগ্রেসের টিকিট দিয়ে রাজনীতিতে এনেছেন ১৯৮৪ সালে। বচ্চন পরিবারের সঙ্গে নেহরু পরিবারের ঘনিষ্ঠতা অনেক দিনের। দু’পরিবারই এসেছে গঙ্গা-যমুনার মিলনস্থলে গড়ে ওঠা প্রাচীন তীর্থস্থান এলাহাবাদ থেকে। অমিতাভ ও রাজীব একসঙ্গে বেড়ে উঠেছেন। জনপ্রিয় এই চিত্রনায়ক উত্তর প্রদেশের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী এইচএন বহুগুণাকে পরাজিত করে ৬২ দশমিক দুই শতাংশ ভোট পেয়ে এলাহাবাদে জয় লাভ করেন। তার এই অসাধারণ জনপ্রিয়তা ভিপি সিংয়ের জন্য হুমকির কারণ হয়ে পড়ল। ধারণা করাই যায়, এরপর উত্তর প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রিত্বের জন্য নির্বাচন করলেও হয়তো জনগণের সমর্থন পেতেই পারতেন অমিতাভ। ১৯৮৬ সালের শেষের দিকে সিংয়ের তদন্ত কর্মকর্তাদের একটি দল কোনো প্রকার প্রমাণাদি ছাড়াই অভিযোগ আনল যে, অমিতাভ ও তার সুইজারল্যান্ড প্রবাসী ভাই অজিতাভ বচ্চন বিশাল পরিমাণ অর্থ সুইস ব্যাংকে জমা করেছেন। দলটি তাদের পরবর্তী রিপোর্টে উল্লেখ করে যে, অক্টোবরে রাজীবের সঙ্গে ধীরুভাইয়ের বৈঠকের উদ্যোগটি নিয়েছিলেন মূলত অমিতাভ বচ্চন। এরপর সংসদের বিধানসভায় একজন মন্ত্রী জানান যে, প্রধানমন্ত্রীর আয়ত্তে পরিচালিত সেন্ট্রাল ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (সিবিআই) একটি তদন্ত হাতে নিয়েছে। এতে খতিয়ে দেখা হবে, সরকারি গোপনীয় নথিপত্র কোনোভাবে গুরুমূর্তির হাতে যাচ্ছে কি না। এ সন্দেহের মূল কারণ, অক্টোবরে এক্সপ্রেসে প্রকাশিত গুরুমূর্তির ‘চোরাকারবারি করে আনা প্লান্ট’ সিরিজের রিপোর্টগুলো। ধারণা করা হচ্ছে, শিল্প মন্ত্রণালয়ের ডিরেক্টরেট-জেনারেল অব টেকনিক্যাল ডেভেলপমেন্ট (ডিজিটিডি) থেকে গোপন তথ্য রিপোর্টারের কাছে ফাঁস করা হয়েছে। এ মর্মে ডিজিটিডি একটি অভিযোগ দায়ের করে। এর কয়েক দিনের মধ্যেই গুরুমূর্তির অফিসে অভিযান চালিয়ে কিছু ডকুমেন্টও উদ্ধার করে সিবিআই।

ওদিকে এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টর ভুরে লাল যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ঘুরে ঘুরে একাকার করছিলেন। তিনি বুঝতে পারলেন তাকে রিলায়ান্সের কোনো এজেন্ট কপি করছে। নিজেকে ভুরে লালের সহকারী পরিচয় দিয়ে কেউ একজন সুইজারল্যান্ডের বার্নে গিয়ে হাজির হয়েছেন। অমিতাভের ব্যাপারে সুইস ব্যাংকে অনুসন্ধান করছেন তিনি। এটা জানার পর অমিতাভ সতর্ক হলেন। সেখানকার ভারতীয় এমবাসিও নয়াদিল্লিতে খোঁজখবর করল। রাজীব গান্ধী তখন সপরিবারে আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জে গেছেন নববর্ষের ছুটি কাটাতে। অমিতাভ সেখানে গিয়ে রাজীবের সঙ্গে কথা বললেন। রাজীব বুঝলেন, ব্যবসায়ীদের নিয়ে অনুসন্ধান বাড়াবাড়ি পর্যায়ে চলে গিয়েছে। এ মিশন তাকে ডুবাবে। জানুয়ারির মাঝামাঝি দিল্লি ফিরে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন পাকিস্তান ইস্যু নিয়ে। পশ্চিম সীমান্ত উত্তেজনা যদিও তখন শেষ হয়েছে, তবু আরও বিস্তৃত এলাকায় ট্যাংক ছড়িয়ে রেখেছে পাকিস্তান সেনাবাহিনী। এ হুমকি মোকাবিলায় জরুরি ভিত্তিতে মন্ত্রী পরিষদের সভা আহ্বান করলেন প্রধানমন্ত্রী। বৈঠকের এক পর্যায়ে হুট করেই ভিপি সিংকে বললেন, অর্থ সম্পর্কিত বিষয় বাদ দিয়ে প্রতিরক্ষার দায়িত্ব নিন। অর্থমন্ত্রণালয় আমি দেখছি। তখনকার পরিস্থিতিতে ভিপি সিংয়ের পক্ষে প্রত্যাখ্যান করা সম্ভব ছিল না। প্রতিরক্ষার মতো ক্ষেত্রে একজন সিনিয়র মন্ত্রীর সার্বক্ষণিক তদারকি আসলেই প্রয়োজন ছিল। সুতরাং পরদিনই অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে স্থানান্তর করা হলো তাকে।