পদ্মা সেতুর ১২ পিলারের উদ্বোধন রোববার

নিজস্ব প্রতিবেদক: পদ্মা সেতুতে পিলার থাকবে ৪২টি। আর এ পিলারগুলোর ওপর বসানো হবে ৪১টি স্প্যান। তার ওপর পৃথক দোতলাবিশিষ্ট রেলপথ ও সড়কপথ নির্মাণ করা হবে। যদিও এখন পর্যন্ত সেতুটির ১২টি পিলার নির্মাণ সম্পন্ন হয়েছে আর স্প্যান বসেছে পাঁচটি। এ পর্যন্ত ৬০ শতাংশ কাজ সম্পন্ন হয়েছে। সড়ক ও রেলপথ নির্মাণের কিছুই সম্পন্ন হয়নি। এ অবস্থাতেই পদ্মা সেতুর ৬০ শতাংশ কাজের উদ্বোধন করা হবে আগামী রোববার।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, চলতি বছর নভেম্বরে পদ্মা সেতুর কাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল। তবে নির্ধারিত সময়ে এটি শেষ করা সম্ভব নয় বলে গত বছরই জানিয়ে দেয় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান চায়না মেজর ব্রিজ ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানি। এক্ষেত্রে কমপক্ষে দুই বছর অতিরিক্ত সময় লাগবে বলে জানিয়েছিল ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। তবে প্রকল্পটির ব্যবস্থাপনা পরামর্শক যুক্তরাজ্যভিত্তিক রেন্ডাল লিমিটেড অ্যান্ড অ্যাসোসিয়েটস বলছে বিদ্যমান গতিতে কাজ চললে পদ্মা সেতুর নির্মাণকাজ শেষ হতে আরও ছয় থেকে সাত বছর লাগবে।
গত ২ অক্টোবর সেতু ভবনে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেন, আগামী ১৩ অক্টোবর প্রধানমন্ত্রী পদ্মা সেতুর চলমান কাজের শুভ উদ্বোধন করবেন এবং কাজের অগ্রগতি পরিদর্শন করবেন। এ প্রকল্পের আওতায় মূল সেতুর ৭০ শতাংশ ও সার্বিক অগ্রগতি বর্তমানে ৫৯ শতাংশ হয়েছে। আগামী ১৩ অক্টোবরের মধ্যে অগ্রগতি বেড়ে ৬০ শতাংশে দাঁড়াবে। গত ১৮ সেপ্টেম্বর সংসদেও একই তথ্য জানান তিনি। তবে তা একদিন পিছিয়ে ১৪ অক্টোবর পুনর্নির্ধারণ করা হয়েছে।
যদিও ওবায়দুল কাদেরের বক্তব্যের সঙ্গে একমত নন পদ্মা সেতু প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা। তারা বলছেন, ৬০ শতাংশ নির্মাণকাজের উদ্বোধন তথ্যটি সঠিক নয়। মূলত পদ্মা সেতুর নামফলক উম্মোচন করা হবে শনিবার। সেতুটির নাম শেখ হাসিনার নামে প্রস্তাব করা হয়েছিল। তবে প্রধানমন্ত্রী এতে সম্মত হননি। তাই পদ্মা নদীর নামেই সেতুটির নামফলক করা হয়েছে, যা উ চন করা হবে ওই দিন।
তথ্যমতে, পদ্মা নদীর জাজিরা প্রান্তে ৩৭ থেকে ৪২নং পর্যন্ত মোট ছয়টি পিলার নির্মাণ সম্পন্ন হয়েছে। এগুলোর ওপর পাঁচটি স্প্যান বসানো হয়েছে। প্রথম স্প্যান বসে গত বছর সেপ্টেম্বরে। এর পর চলতি বছর জানুয়ারি, মার্চ, মে ও জুনে আরও চারটি স্প্যান বসে। নির্মাণ সম্পন্ন হওয়া ১২টি পিলারের মধ্যে বাকি ছয়টি মাওয়া প্রান্তে (৩ থেকে ৮নং)। এর মধ্যে ৩, ৪ ও ৫নং পিলারের ওপর স্প্যান বসানোর প্রস্তুতি চলছে। এছাড়া বেশ কয়েকটি স্প্যান প্রস্তুত করা হয়েছে। আরও ছয়টি তৈরির কাজ চলছে।
এদিকে সেতুতে ৪১টি স্প্যান বসানো হলে ট্রেন চলার জন্য তার ওপর দুই হাজার ৯৫৯টি রেল সø্যাব বসানো হবে। এক্ষেত্রে পরীক্ষামূলকভাবে মাত্র আটটি সø্যাব বসানো হয়েছে। রেল সø্যাবের ওপর গাড়ি চলার রাস্তা নির্মাণে আরও কাঠামো স্থাপন করতে হবে। এর বাইরেও আরও কিছু অবকাঠামো নির্মাণ করতে হবে সেতুটিতে।
পদ্মা সেতুর ৪২টি পিলারের জন্য ২৯৮টি পাইল নির্মাণ করতে হবে। এর মধ্যে দুই-তৃতীয়াংশ নির্মাণকাজ সম্পন্ন হয়েছে, বাকিগুলোর কাজ চলছে। এছাড়া মাওয়া ও জাজিরায় উড়ালপথের (ভায়াডাক্ট) জন্য যথাক্রমে ৪০টি ও ৩৭টি পিলার নির্মাণ করতে হবে। এগুলোর জন্য যথাক্রমে ১৯৩টি ও ১৭২টি পাইল নির্মাণ করতে হবে। এগুলোর বেশিরভাগের কাজই শুরু হয়নি।
তথ্যমতে, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি পদ্মা সেতুর অগ্রগতি তুলে ধরে সেতু বিভাগে প্রতিবেদন জমা দেয় ব্যবস্থাপনা পরামর্শক। এতে বলা হয়, ‘গত ২৫ থেকে ২৭ জানুয়ারি পদ্মা সেতুর প্যানেল অব এক্সপার্টের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। ওই বৈঠকে পদ্মা সেতুর পরামর্শক প্রতিষ্ঠান কোরিয়ান এক্সপ্রেসওয়ে করপোরেশন অ্যান্ড অ্যাসোসিয়েশন প্রকল্পটির অগ্রগতি তুলে ধরে। নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার সম্ভাব্য সময়ও একটি গ্রাফের মাধ্যমে দেখানো হয়। এতে দেখা যায়, গত
বছর স্বাভাবিকভাবে প্রতি মাসে গড়ে এক শতাংশের বেশি কাজ হয়নি। এই গতিতে কাজ চলতে থাকলে প্রকল্পটি সম্পন্ন হতে আরও ছয় থেকে সাত বছর লাগবে। নির্মাণকাজ কোনোভাবেই বর্তমান চুক্তির নির্ধারিত সময়ে শেষ করার অবস্থায় নেই।’
ব্যবস্থাপনা পরামর্শক আরও জানায়, ২০১৭-১৮ শুষ্ক মৌসুমে নদীশাসন কাজের যে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল, তা থেকে মাত্রাতিরিক্তভাবে পিছিয়ে পড়েছে ঠিকাদার সিনোহাইড্রো করপোরেশন। এমনকি কোম্পানিটির পক্ষ থেকে এটি সংশোধনের কোনো উদ্যোগও পরিলক্ষিত হচ্ছে না। এক্ষেত্রে সিনোহাইড্রো করপোরেশনের শীর্ষ কর্মকর্তাদের চীন থেকে ডেকে আনতে পারে সেতু কর্তৃপক্ষ। বর্তমানে এ অংশের জন্য অতি জরুরি অ্যাকশন প্ল্যান নেওয়া দরকার। পাশাপাশি নদীশাসনে বিকল্প কৌশল প্রণয়ন করা যেতে পারে।
যদিও এর আগে মূল সেতু ও নদীশাসনে বর্ধিত সময় চেয়েছিল দুই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। এক্ষেত্রে মূল সেতু নির্মাণে ২৩ মাস অতিরিক্ত সময় দাবি করে চায়না মেজর ব্রিজ। আর নদীশাসনের জন্য অতিরিক্ত ১৮ মাস সময় চেয়েছিল সিনোহাইড্রো করপোরেশন। তবে যুক্তিসংগত কারণ ব্যাখ্যা করতে না পারায় দুটি আবেদনই গ্রহণ করেনি সেতু কর্তৃপক্ষ। তবে কবে নাগাদ পদ্মা সেতুর নির্মাণকাজ শেষ হবে তা অনেকটাই অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।
এ বিষয়ে গত ২ অক্টোবর প্রশ্ন করা হলে ওবায়দুল কাদের বলেন, পদ্মা সেতু প্রকল্পে ২৪ ঘণ্টা কাজ চলছে। কবে শেষ হবে তার দিনক্ষণ এখন বলা যবে না। অক্টোবরের শেষ দিকে প্রকল্পের সর্বশেষ পরিস্থিতি বলা যাবে।
জানতে চাইলে পদ্মা সেতু প্রকল্পের প্যালেন অব এক্সপার্টের সভাপতি অধ্যাপক জামিলুর রেজা চৌধুরী শেয়ার বিজকে বলেন, পদ্মার মতো এমন খরস্রোতা ও আনপ্রেডিকটেবল একটি নদীতে চার বছরে সেতু নির্মাণ করার টাইম লাইন একটু ঝুঁকিপূর্ণ। তবুও দ্রুত সেতুটির কাজ শেষ করতে মূলত একটি টাইম ফ্রেম নির্ধারণ করা হয়েছিল। তবে কবে নাগাদ নির্মাণকাজ শেষ করা হবে, দ্রুতই তা বোঝা যাবে।
উল্লেখ্য, রোববার পদ্মা সেতু ছাড়াও এটি সংলগ্ন ঢাকা-মাওয়া-ভাঙ্গা চার লেনের আংশিক উদ্বোধন করা হবে। এ প্রকল্পের অগ্রগতি ৭০ শতাংশ। এছাড়া পদ্মা সেতুতে রেল সংযোগের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন এবং মাওয়া প্রান্তে এক হাজার ৩০০ মিটার নদী রক্ষা কাজের উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী।