পরিকল্পিত শহরে চাইলেই গাড়ির মালিক হওয়া যায় না

মিজানুর রহমান শেলী: ‘সর্ব গায়ে ব্যথা, ওষুধ লাগাবো কোথা’ এই প্রবাদটির কার্যকারিতা অসার হয়ে যায় যখন পরিস্থিতি শোচনীয়রূপে পৌঁছে যায়। কেঁচো তখন খোঁড়াই লাগে। যদি কেউ বলেন ‘গোড়ায় গলদ’ রয়েছে, তবে গোড়াকে ক্ষুব্ধ হওয়া মানায় না। আবার হেসে তামাশা করা সাজে না। সার-ফাস দিয়ে তাকে ঠিক পরিচর্যা যেমন করতে হয়, তেমনি আগাছা উপড়াতে কোনো সমীহ কিংবা আপস বেমানান হয়ে ওঠে। অথচ চাষি যদি গাছের গোড়ার ঘাস উপড়ে না ফেলেন, তবে বুঝতে হবে তার হালে গরু আছে।
দেশের পরিবহন খাতের বিশৃঙ্খলা কোনোভাবেই মিটমাট করা যাচ্ছে না। গাড়ির মালিক কে হবেন? তার দায়িত্ব কী? কে হবেন চালক? তার শিক্ষা-প্রশিক্ষণ ও দায়িত্ব কী? সরকারের ভূমিকা কী ও কত বড়? এসব বিষয়-আশয় নিয়ে দেন-দরবার, আন্দোলন-সংগ্রাম চলছে অবিরাম। কেননা, বিশৃঙ্খলার চিত্র ভয়ানক। যাত্রী কল্যাণ সমিতির প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত বছর ২০১৭ সালে চার হাজার ৯৭৯টি দুর্ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে নিহত হয়েছেন সাত হাজার ৩৯৭ জন এবং আহত হয়েছেন ১৬ হাজার ১৯৩ জন। তার আগের বছর চার হাজার ৩১২টি দুর্ঘটনায় ছয় হাজার ৫৫ জন নিহত হন এবং ১৫ হাজার ৯১৪ জন আহত হন। তাতে দেখা যায় দেশে দুর্ঘটনার হার কমছে না, বরং বেড়ে চলেছে। ২০১৬ সালের তুলনায় ২০১৭ সালে ১৫ দশমিক পাঁচ শতাংশ দুর্ঘটনা বৃদ্ধি পায়। এর মধ্যে নিহতের হার ২২ দশমিক দুই এবং আহতের হার এক দশমিক আট শতাংশ বেড়েছে। বোঝা যায়, কেবল দুর্ঘটনার হারই বেড়ে চলেছে তা নয়, বরং দুর্ঘটনার ‘নৃশংসতা’ও বেড়ে চলেছে। কেননা আহত হওয়ার চেয়ে নিহত হওয়ার হার বেড়েছে ১২ দশমিক ৩৪ গুণ। এখন প্রশ্ন ওঠে, এসবের সমাধান কী? আসলে সংকটটা কোথায়?
দুর্ঘটনা ঘটলে প্রথমেই উত্তেজিত জনতা চালককে ধরার চেষ্টা করে এবং বেদম পিটুনি দেয়। কখনও কখনও চালকের মৃত্যু ঘটে। অথচ চরম অপরাধীরও আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ থাকে ন্যায়বিচারে। এতে সবচেয়ে বড় সুবিধা ভোগ করে ওই সমাজ। কেননা, আসামির জবানবন্দির ভেতরেই লুকিয়ে থাকে সংকটের রহস্য। কিন্তু বিচার ব্যবস্থা বা কর্তাব্যক্তিরা যদি সেই সাপ বের করতে কেঁচোর গর্ত খোঁড়ার সাহস না করেন তবে জনগণ উপায়ান্তর না পেয়ে চালককেই পিটিয়ে হত্যা করবে! আর তখন একটি ন্যয়বিচারবিহীন সমাজ ভারসাম্য হারাবে। বিশৃঙ্খল হয়ে উঠবে। দেশে এই সাপ বা গলদের গোড়াকে যে নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে না, সেটা ওপেন সিক্রেট ব্যাপার।
এই ঢাকা শহরে যে কেউ গাড়ির মালিক হতে পারেন। এই সুযোগ কোনো না কোনোভাবে দেশের যে কোনো চরিত্র ও পেশার মানুষ গ্রহণ করছে। কালো টাকা আর লুটেরা চরিত্রের ব্যবসায়ী সমাজ থেকে অসাধু রাজনীতিক সবাই এই বাণিজ্যের অগাধ জলে নামে-বেনামে সিংহাসন গেড়ে আছেন। কারও যদি একটি গাড়ি কেনার টাকা হাতে আসে যে কোনো উপায়ে, তবে সে গাড়ি কিনে পথে নামিয়ে দিতে পারেন। দুর্নীতির সহজ পথে মিলে যায় রাস্তায় চলার অনুমোদন। এ বিষয়ে দুদক ও পত্রপত্রিকার প্রতিবেদনে যথেষ্ট তথ্য-প্রমাণ রয়েছে।
অথচ বিশ্বের সেরা ১০টি পরিবহন সেবা শহরের দিকে যদি আমরা তাকাই তবে ভিন্ন চিত্র দেখতে পাব। ২০১৭ সালের সিএনএনের প্রতিবেদন অনুযায়ী এই তালিকায় রয়েছে যথাক্রমে হংকং, সিউল, সিঙ্গাপুর, লন্ডন, প্যারিস, মাদ্রিদ, নিউইয়র্ক, টকিও ও গংঝু। আবার সাসটেইনেবল সিটি’স মবিলিটি ইনডেক্স, ২০১৭-এর প্রতিবেদনেও পূর্ব এশিয়ার দেশ হংকংয়ের নাম প্রথমেই উঠে এসেছে। এখানে প্রতিদিন ১২ দশমিক ছয় মিলিয়ন যাত্রী ভ্রমণ করে। অথচ এটা একটি জনবহুল এলাকা। এখানে তিন ধরনের বাস সার্ভিস চালু রয়েছে: ফ্র্যাঞ্চাইজড, নন-ফ্র্যাঞ্চাইজড ও পাবলিক লাইট বাস। ফ্র্যাঞ্চাইজড বাস সেবায় মাত্র পাঁচটি বাস কোম্পানি যাত্রী সেবা দিয়ে চলেছে। এসব কোম্পানির পাঁচ হাজার ৮০০টি বাস ৭০০টি রুটে চলে। এখানে কোনো সরকারি গাড়ি নেই। যাহোক এই পাঁচটি কোম্পানির বাস সেবাকে সহযোগিতা করার জন্য মাঠে নামানো হয় নন-ফ্র্যাঞ্চাইজড বাস সেবা। নন-ফ্র্যাঞ্চাইজডের বাসগুলো কেবল ব্যস্ত সময়ে সড়কে নামানো হয়। তবে এগুলো অলাভজনক বাস সেবা দেয়। তার মানে এই নয় যে, এ বাসগুলো হঠাৎ প্রয়োজনে যে কোনোভাবে জোগাড় করে এনে মাঠে নামানো হয়। বরং নন-ফ্র্যাঞ্চাইজড বাস হিসেবে হংকং সরকারের কাছে আট হাজার ১১১টি বাসের নিবন্ধন রয়েছে। এ বাসগুলো কেবল পর্যটন, হোটেল, স্কুল, পেশাজীবী ও আবাসন সেবা দেয়। তৃতীয় বাস সেবা খাতে রয়েছে পাবলিক লাইট বাস। এই সেবাটিকে সহযোগী বাস সেবা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। গাড়িগুলো ছোট। মাত্র ১৬ জন চলতে পারে। অর্থাৎ এই বৃহৎ পরিকল্পনার মধ্যে ফ্র্যাঞ্চাইজড খাতের পাঁচটি বাস কোম্পানি হংকংয়ের তাক লাগানো পরিবহন বাস সেবার ভিত্তিকাঠামো। এর বাইরে আর কেউ যখন তখন বাস রাস্তায় নামাতে পারে না। যদি কেউ বাস সেবাই বিনিয়োগ করতে চান তবে বাস কিনে সরকারের কাছে নিবন্ধন করে রাখতে পারেন। সেটা নন-ফ্র্যাঞ্চাইজড বা পাবলিক লাইট খাতে ব্যবহার হয়।
এদিকে দক্ষিণ কোরিয়ার রাজধানী সিউলে মাত্র চার ধরনের বাস চলতে পারে। ট্রাংক বাস (নীল), ব্রাঞ্চ বাস (সবুজ), র‌্যাপিড বাস (লাল), সার্কুলেশন বাস (হলুদ)। বাসগুলো শহরের মধ্যে ও শহরতলিতে চলাচল করে। বেশিরভাগ বেসরকারি, কিছু সরকারি। তবে যে কেউ বাস নামিয়ে গায়ে বিশেষ বিশেষ রং করেই চালাতে পারেন না। তার জন্য তাকে সরকারের কাছ থেকে নিবন্ধন নিয়ে বিশেষ কিছু শর্ত মেনে নির্দিষ্ট বিভাগে অন্তর্ভুক্ত হতে হয়।
লন্ডনে প্রতিটি বাসের নির্দিষ্ট রুট থাকে। পাঁচ বছরের চুক্তিতে এই বাসগুলো চলতে পারে, তবে পারফরম্যান্স ভালো হলে আরও দুই বছর বাড়িয়ে নিতে পারে। তবে এই শহরেও যে কেউ বাস নামাতে পারেন না। মাত্র ১২টি বাস কোম্পানি এখানে বাস চালাতে পারে। অ্যাবেলিও লন্ডন, অ্যারিভা লন্ডন, সিটি প্লাস, গো-অ্যাহেড লন্ডন, লন্ডন সোভার্ন, মেট্রোলাইন, কোয়ালিটি লাইন, স্টেজকোচ লন্ডন, সুলিভিয়ান বাসেস, টাওয়ার ট্রানজিট ও উনো। এসব কোম্পানি সরকার ও জনতার কাছে বিশেষ আস্থা ও জবাবদিহির পর্যায়ে আবদ্ধ।
সেখানে ঢাকা শহরে যে কোনো দিনে যে কোনো পুুঁজিপতি ইচ্ছে করলেই কয়েকটি বাসের সমাগম ঘটিয়ে বিআরটিএ’র কোনো অসাধু কর্মকর্তার মাধ্যমে ঘুষ দিয়ে রুট পারমিট নিয়ে একটি বাস সেবা কোম্পানি খুলে বসছে। বিআরটিএ’র নিয়ম অনুযায়ী তাদের গাড়ির নিবন্ধন পেতে ফিটনেস সনদ স্বচ্ছভাবে পরীক্ষা করা হচ্ছে না। অধিক মুনাফা পাওয়ার আশায় স্বল্প বেতনে অদক্ষ চালককে নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে। চালকের অনুমতিপত্র (লাইসেন্স) পাওয়ার বিষয়টিও একই ধারায় চলছে। এবার এ গাড়িগুলোর একটি নির্দিষ্ট রুটে চলার অনুমতি ও জবাবদিহি থাকা সত্ত্বেও বাসের প্রাথমিক খরচ তুলে আনার জন্য বা ‘উপরি’ বা অতিরিক্ত লাভের আশায় দূরপাল্লায় বাসগুলোকে ভাড়ায় খাটানো হচ্ছে। সেক্ষেত্রে কোন গাড়ি কোন রাস্তায় চলবে, তার কোনো নিয়ন্ত্রণ থাকছে না। রুট বিশেষে গাড়ি ও চালকের ফিটনেসের চাহিদা উন্নত দেশগুলোতে বিভিন্ন হয়ে থাকে। সেই বিষয়টি এখানে এড়িয়ে চলা হচ্ছে।
তাছাড়া এ গাড়িগুলোকে কোনো কন্ডাক্টরের কাছে ঠিকা দেওয়া হচ্ছে। দিন শেষে একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা মালিককে দিতেই হবে। তখন কন্ডাক্টর নগরীর জ্যাম কিংবা গাড়ির ফিটনেস উতরিয়ে লাভের অঙ্ক কষতে মরিয়া হয়ে ওঠে। তার জন্য যাত্রীদের কাছ থেকে যেমন অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করে তেমনই অন্য বাসের সঙ্গে একটি নোংরা প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়। ফলে ওভারটেকিংয়ের মতো বিপজ্জনক ঝুঁকি নিতে দ্বিধা করে না। দেখা যায়, একটি গাড়ির সঙ্গে আরেকটি গাড়ির পাশাপাশি ঘর্ষণ বা পেছন থেকে ও সামনে থেকে ধাক্কার ঘটনা অহরহ ঘটছে। মামলা হলে ঘুষ দিয়ে ছাড়পত্র পেয়ে যাচ্ছে অথবা রুট পারমিট বাতিল হলে ভিন্ন নামে সড়কে আসছে।
এই প্রতিযোগিতার মূলে রয়েছে বাস সেবায় কোনো স্থায়ী ও নির্দিষ্ট বাস কোম্পানি না থাকা। থাকলে তারা একই কোম্পানির বাসের মধ্যে ঝুঁকিপূর্ণ প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হবে না। যেভাবে উন্নত দেশে গুটিকয়েক প্রতিষ্ঠিত ও আস্থাভাজন কোম্পানির আওতায় বাস সার্ভিস পরিচালনা করা হয়।
আমাদের কর্তাব্যক্তিরা এই সেবায় মালিকানা বা কোম্পানি ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজাতে পারেন। তবে এখানেই সব সংকট সমাধা হয়ে যাবে না। সেবাটি যখন পণ্যে পরিণত হয়েছে তখনই দুর্নীতি আর রাজনৈতিক লেজুড়বৃত্তি সর্বাঙ্গীণভাবে আঁকড়ে ধরেছে। ফলে শুদ্ধতার চর্চার বিকল্প নেই। দায়িত্ব ও কর্তব্য তো বটেই, উপরন্তু মানবিক দায়বোধের জায়গা থেকেই সরকারকে এখনই আশু সমাধানের পদক্ষেপ নিতে হবে। নইলে অরাজকতা আর বিশৃঙ্খলা চারদিকে ছেয়ে যাবে, সাধারণ মানুষের জানমালের কোনো নিরাপত্তা থাকবে না। কর্তাব্যক্তিদের আত্মীয়স্বজনেরও জীবন বিপন্ন হতে পারেÑন্যূনপক্ষে এই ধারণার জায়গা থেকেই পরিবহন সেবা খাতের এই দুর্বৃত্তায়ন বন্ধ করা উচিত।

গবেষক, শেয়ার বিজ