পরিবেশ রক্ষা করে শিল্পায়নই কাম্য

দখলে-দূষণে দিন দিন বিপন্ন হয়ে পড়ছে আমাদের পরিবেশ। এতে অনেক কিছুই দেশের প্রকৃতি থেকে হারিয়ে গেছে। আমাদের মানচিত্র থেকে ইতোমধ্যে কিছু নদীর নিশানাও মুছে গেছে। হারানোর পথে আরও কয়েকটি। এ বিরূপ পরিবেশ-পরিস্থিতির দায় আমাদেরই বেশি। পরিবেশ রক্ষার পদক্ষেপও তাই আমাদের নিতে হবে আগে। এর মধ্যে সরকারের একটি সিদ্ধান্ত আশাব্যঞ্জক বলতে হবে। গাজীপুর ও নরসিংদীতে শিল্পাঞ্চলের বাইরে নতুন কোনো শিল্প স্থাপন না করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এর ফলে ওই এলাকার নদী ও পরিবেশ অপরিকল্পিত শিল্পায়নের গ্রাস থেকে রক্ষা পাবে বলেই বিশ্বাস।
গত শুক্রবার শেয়ার বিজে ‘গাজীপুর ও নরসিংদীতে নতুন শিল্প স্থাপন নয়’ শিরোনামে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গাজীপুর ও নরসিংদী শহরে ইকোনমিক জোন ছাড়া কোথাও কোনো শিল্প স্থাপন করা যাবে না বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছে নদী দূষণ ও নাব্য বৃদ্ধিসংক্রান্ত টাস্কফোর্স। এছাড়া সভায় সাভারের চামড়াশিল্প পার্কের মাধ্যমে ধলেশ্বরী নদী দূষণ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। সভায় এ বিষয়ে অবশ্য কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি। এর মাধ্যমে গাজীপুর ও নরসিংদীতে নদী রক্ষায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হবে বলে আমরা মনে করি। রাজধানীর হাজারীবাগে অপরিকল্পিত ট্যানারি শিল্পের কারণে বুড়িগঙ্গা দূষণের কথা কারও অজানা নয়। এ কারখানাগুলো সাভারে স্থানান্তরের পর সেখানে ধলেশ্বরী নদীও দূষণের কবলে পড়েছে। এটা কাম্য নয়। অবিলম্বে নদীটি রক্ষার পাশাপাশি সঠিকভাবে ট্যানারির বর্জ্য ব্যবস্থাপনার উদ্যোগ নিতে হবে।
আমাদের অর্থনীতির আকার বাড়ছে। এতে বড় অবদানই শিল্পের। তবে মনে রাখা দরকার, এদেশে ১৬ কোটির অধিক জনসংখ্যার তুলনায় সম্পদ সীমিত। আবাসনের ব্যবস্থা করতে গিয়েও কমছে কৃষিজমি। শিল্প স্থাপনের কারণেও ভূমির পরিমাণ কমছে। নদী দখল করে শিল্প নির্মাণ নিয়মিত ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর অবসান হওয়া জরুরি। শিল্পকে পরিকল্পনা ও নির্দিষ্ট এলাকার মধ্যে সীমিত রাখতে হবে। শিল্প স্থাপনে যতটা সম্ভব কম ভূমি ব্যবহারেও যতœবান হওয়া জরুরি। অল্প জমিতে বহুতল কারখানা ভবন নির্মাণের মতো বিষয়ও বিবেচনা করতে হবে। নদী দখলকারীদের বিরুদ্ধেও আইনানুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে। এক্ষেত্রে আইনের স্বল্পতা রয়েছে বলে কিন্তু জানা যায় না।
দেশের সব অঞ্চলেই শিল্পের বিস্তার ঘটছে। এ কারণে শুধু মহানগর বা এর আশপাশে এ ধরনের উদ্যোগ নেওয়ার যৌক্তিকতা ফুরিয়েছে। এখন জাতীয় পর্যায়েই শিল্প স্থাপন ও পরিবেশ রক্ষায় সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা নেওয়া প্রয়োজন। পরিবেশ, বিশেষত বন ও নদী রক্ষায় এর সংস্পর্শ থেকে শিল্পকে আলাদা রাখতে হবে। জলবায়ু তহবিলের অর্থের সদ্ব্যবহারও জরুরি। এছাড়া শিল্প-কারখানাগুলো শুধু জায়গামতো নিলেই হবে না; এগুলোর জন্য গ্যাস, বিদ্যুতের মতো সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে। সঠিকভাবে ব্যবস্থাপনা করা প্রয়োজন বর্জ্য। রাজধানী থেকে শিল্প স্থানান্তরের যে পরিকল্পনা রয়েছে, তার বাস্তবায়নও ত্বরান্বিত করতে হবে। এতে নগরীর ওপর চাপ কমবে মানুষের।
শিল্পায়নের এ যুগে শিল্পকে অবহেলার সুযোগ নেই, তেমনি পরিবেশ রক্ষাও জরুরি। এ অবস্থায় শিল্পকে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনার আওতায় এগিয়ে নিতে হবে। পরিবেশ রক্ষায়ও ছাড়ের কোনো সুযোগ নেই। মনে রাখা চাই, শিল্প স্থানান্তর সম্ভব; কিন্তু নদীর মতো পরিবেশের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ হারিয়ে গেলে তা আর ফিরে পাওয়া যাবে না। এজন্য শুধু ভালো উদ্যোগ নিলে হবে না, তার যথাযথ বাস্তবায়নও করতে হবে।