পাটের বিনিময়ে জ্বালানি তেল ভাবনার বাস্তবায়ন হোক

পাটের সুদিন বুঝি ফিরছে। একসময় পাটকে ‘সোনালি আঁশ’ বলা হতো। দেশের রফতানি আয়ের সিংহভাগ ছিল পাটের দখলে। রফতানি পণ্য তালিকায় পাটের অবস্থান ছিলে শীর্ষে। কিন্তু পলিথিন উদ্ভবের পর এর ভাগ্যে নেমে আসে দুর্দিন। এ অবস্থা বদলাতে সরকারিভাবে উদ্যোগ নিয়েও তেমন সুফল মিলছিল না। পলিথিন নিয়ন্ত্রণ করেও পাটের ব্যবহার বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বারবার। কিছুটা সুফল পেলেও তা স্থায়ী রূপ দেওয়া যাচ্ছিল না। রফতানি পণ্য হিসেবে পাট কোনোপভাবেই হারানো স্থান পুনর্দখল করতে পারছিল না। এদিকে বাংলাদেশ থেকে পাট আমদানিতে আগ্রহ প্রকাশ করেছে ইরান। এর বিনিময়ে জ্বালানি তেল রফতানি করতে চায় দেশটি। বৃহস্পতিবার গণভবনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে সাক্ষাতে ইরানের বিদায়ী রাষ্ট্রদূত আব্বাস ভেইজি দেহনাভি এ কথা জানান। বৈঠকের পর প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব আলোচনার বিষয়বস্তু জানান সাংবাদিকদের। এ বিষয়ে গতকাল শেয়ার বিজসহ বিভিন্ন গণমাধ্যম সংবাদ প্রকাশ করেছে।
প্রেস সচিব জানিয়েছেন, ইরানের রাষ্ট্রদূত পণ্য বিনিময় বাণিজ্যে গুরুত্বারোপ করেছেন। তিনি বলেন, ‘ইরান পাট নিতে চায়। তার বিনিময়ে অপরিশোধিত তেল দিতে চায়।’ একসময় বাংলাদেশের পাটের সুনাম ছিল বিশ্বজোড়া। তাতে ছেদ ঘটলেও পাটের সুদিন ফেরানোর চেষ্টায় রয়েছে সরকার। অন্যদিকে ইরান বিশ্বের সপ্তম বৃহত্তম জ্বালানি তেল রফতানিকারক। অপরিশোধিত তেলের বাজারের চার দশমিক আট শতাংশ তার দখলে। যুক্তরাষ্ট্রের নানা নিষেধাজ্ঞায় থাকা ইরানের রাষ্ট্রদূত দেহনাভি দু’দেশে অর্থনৈতিক সহযোগিতা বাড়ানোর কথাও বলেন।
কৃষি খাতে বাংলাদেশ অভূতপূর্ব সাফল্য অর্জন করেছে। এর অধিকাংশই অর্জিত হয়েছে খাদ্যশস্য উৎপাদনে। ফলে দেশ খাদ্য উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়েছে। এদিকে পাটের জিনতত্ত্ব আবিষ্কারেও সোনালি আঁশের সুদিনে ফেরার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। ওই আবিষ্কারের কারণে নতুন জাত উদ্ভাবনের দুয়ার খুলে গেছে। দেশের পাশাপাশি বিশ্ববাজারে পাটের ব্যবহার বাড়ছে এখন। এ অবস্থায় পলিথিনের বিকল্প হিসেবে পাট দিয়ে ‘সোনালি ব্যাগ’ প্রকল্পের কাজও শুরু হয়েছে। দেশে বেশ কয়েকটি পণ্যের মোড়কে পাটের ব্যাগ ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা হয় এর আগে। এ ছাড়াও পাট থেকে পানীয় উৎপাদন, কম্পোজিট টেক্সটাইল ও জুট গার্মেন্ট স্থাপন করা হচ্ছে। তৈরি হয়েছে পাটের চা, পাটের পলিব্যাগ, পাট ও ফাইবার গ্লাসের তৈরি করোগেটেড শিট, পাটের ব্যাগ, তাঁতের শাড়ি। সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগের ফলেই দেশে পাটের এসব ব্যবহার বাড়ছে। সোনালি আঁশের হারানো ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনতে কাজ এগিয়ে চলেছে।
ইতোমধ্যে পাটের বেশকিছু জাত উদ্ভবের পর এ বিষয়ে আরও গবেষণা চলছে। এ সুযোগ কাজে লাগিয়ে পাট রফতানি বাড়ানোর উদ্যোগ নিতে হবে। রফতানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্যমতে, ২০১০ সাল থেকে পাটজাত পণ্য রফতানি করছে সরকার। এরই ধারাবাহিকতায় ২০১৮-১৯ অর্থবছরের জুলাই ও আগস্টে পাট রফতানি করে আয় হয় ১৩ কোটি ১১ লাখ ডলার। এদিকে জ্বালানি তেলের পুরোটাই বাংলাদেশকে আমদানি করতে হয়। এজন্য প্রতিবছর বিপুল ভর্তুকি দিতে হয় সরকারকে। ইরানের মতো জ্বালানি তেল রফতানিকারক দেশের ওই আগ্রহ জাতীয় অর্থনীতিতে এর ইতিবাচক প্রভাবের ইঙ্গিত বহন করে। পাট নিয়ে সরকারের নানা উদ্যোগ জ্বালানি তেলের সঙ্গে সম্পর্কিত হলে দেশের কৃষকের সুদিন কিছুটা হলেও ফিরবে। পাট রফতানির বিনিময়ে জ্বালানি তেল আমদানির বিষয়ে শুল্ক ও শুল্কবহির্ভুত সব বাধাও দ্রুত সরিয়ে ফেলতে হবে। বিদ্যমান প্রতিবন্ধকতা চিহ্নিত করে ইরানি রাষ্ট্রদূতের আগ্রহকে বাস্তব রূপ দানে সরকারকে তৎপর হতে হবে। তাহলে পাটের সঙ্গে কৃষকের সুদিন ফিরিয়ে আনার পাশাপাশি জ্বালানি তেল আমদানিতে ভর্তুকিও কমিয়ে আনা সম্ভব হবে।